দুটি স্কুল ও একটি অনাথ আশ্রমে এখন ৫৪০ জন ছাত্রছাত্রী, ৫ জন কর্মী ও ২৬ জন শিক্ষক
এক যে ছিল রাজা। তাঁর ছিল এক রানি। অনেক বছর আগে রাজা ছিলেন গরিব। অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি। তাই পরবর্তীতে প্রজাদের শিক্ষা-খাদ্যের ব্যবস্থা নিয়েছেন। গল্প ভাবছেন? হোঁচট খাচ্ছেন? না, ইনি কোনো রাজা নন। আমার আপনার মতোই সাধারণ ছাপোষা মানুষ। ইনিও স্বপ্ন দ্যাখেন নতুন দেশ গড়ার। যেখানে অনাহার থাকবে না, দুঃখ থাকবে না। কল্পিত সেই দেশকেই একদিন বাস্তবে পরিণত করলেন৷ সুন্দরবনের কাছে ঠাকুরচক গ্রাম। লোনা জমি। বহু ফসলি চাষ প্রায় অসম্ভব। কোনওরকমে একটা ফসলের চাষ করা যায়। তাতেই জীবন জীবিকা। তাঁদেরই একজন ৭২ বছর বয়সী গাজি জালালুদ্দিন। চারদিকে জঙ্গল, খাল — জালালুদ্দিন সাহেব এসবে হোঁচট খান না। সমস্ত রাস্তা তাঁর মুখস্থ।
এলাকার প্রবীণ ট্যাক্সিচালক তিনি। এটাই তাঁর পেশা। নামটা আরেকবার খেয়াল করুন। গাজি জালালুদ্দিন। একটু চেনা চেনা ঠেকছে নিশ্চয়ই! সংবাদপত্র আর টেলিভিশনের সুবাদে অনেকেই এ নাম শুনে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁর মুখ মনে রেখেছেন কজনই বা! উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরচক গ্রামে দুটি স্কুল চালান একা হাতে। তার মধ্যে একটি স্কুল ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত। আরেকটি ফাইভ থেকে ক্লাস টেন। পাশাপাশি রয়েছে একটি অনাথ আশ্রম। ভরণপোষণ জোগান কমপক্ষে ৫০০ ছাত্র-ছাত্রীর। জালালুদ্দিন সাহেবই একমাত্র ভরসা। উনিই বাবা, উনিই মা। আবার উনিই বন্ধু, যাঁকে আবদার করলে লজেন্স পাওয়া যায়।
স্বপ্নের স্কুলবাড়ির ফটোগ্রাফি হাতে গাজি সাহেব
দুটি স্কুল মিলিয়ে মোট ২৬ জন শিক্ষক রয়েছেন। কেউই কিন্তু বিনে পয়সায় পড়ান না। গাজি জালালুদ্দিন প্রতি মাসে মাইনে দিয়ে তাঁদের নিয়োগ করেছেন। এই বাচ্চা ছেলে-মেয়েগুলোই আগামীর ভবিষ্যৎ। অনেকটা চারাগাছের মতো। একদিন বটবৃক্ষে পরিণত হবে। তবেই জালালুদ্দিন সাহেবের নিশ্চিন্তি। কতই না আবদার তাদের। লজেন্স দাও, রং-পেন্সিল দাও, বেলুন দাও, মাথায় হাত বুলিয়ে দাও — জালালুদ্দিন সবেতেই রাজি। শুধু একটাই আর্জি— “তোরা মন দিয়ে পড়াশোনাটা চালিয়ে যাবি তো? পড়াশোনা করলে তবেই সম্মান পাবি কিন্তু।”
দেখুন ভিডিও
একফালি বাড়ি। একটাই ঘর। সেখানে গাজি সাহেব আর তাঁর স্ত্রী তসলিমা বিবি। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে একবার ফোন করি গাজি সাহেবকে। এখন কেমন আছেন তিনি? গ্রামের নেটওয়ার্ক দুর্বল। ফোন বারবার কেটে যায়। উনিই ফোন করলেন কিছুক্ষণ পর।
কৌন বনেগা ক্রোড়পতি ট্রফি হাতে গাজি সাহেব
— কেমন আছেন জালালুদ্দিন সাহেব?
— এই তো, চলে যাচ্ছে। স্কুল তো বন্ধ সেই লকডাউন থেকেই। দশ-বারোজন বাচ্চাদের আলাদা আলাদা করে পড়ানো চলছে বাড়িতেই। আবার কবে স্কুল খুলতে পারব জানি না।
— আপনাকে তো অনেকেই আর্থিক সাহায্য করেছেন বা করেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
— অমিতাভ বচ্চনের কৌন বনেগা ক্রোড়পতি অনুষ্ঠান আমাকে ৫০ লক্ষ টাকা দিয়েছিল। সেই টাকায় গ্রামের পাশেই একটা জমি কিনলাম। এখনও কাজ চলছে। এই বিল্ডিংয়ে আমি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল তৈরি করব। এটার বাজেট ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা। অনেক টাকার ধাক্কা তো৷ ধীরে ধীরে হচ্ছে।
কেবিসির মঞ্চে আমির খানের সঙ্গে
গাজি সাহেবের কথা শুনে জানতে পারলাম, প্রতি মাসে প্রায় ২ লক্ষ টাকা খরচ করেন অনাথ-গরিব ৫৪০ ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনা-খাওয়া এবং পাঁচজন স্কুলকর্মীর পেছনে। কিন্তু নিজেদের ওই একফালি জীর্ণ ঘর। ঘরে একটা তক্তাপোষ। দেওয়ালের একদিকে ঝুলছে মাছ ধরার জাল। একটা টেবিল, যার উপর টিভি।
জালালুদ্দিন সাহেব ফোনের ওপার থেকে নিজের গল্প শোনান— “আমার বিদ্যে ক্লাস টু পর্যন্ত। ফার্স্ট হয়েছিলাম। কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে আর পেরে উঠলাম না বলে পড়তে পারলাম না। সেই বয়সেই বাড়ি ছেড়ে কলকাতার ফুটপাথে আশ্রয় নিলাম। ভিক্ষা করতাম জানেন! প্রথম প্রথম খুব লজ্জা করত। কিন্তু পেট তো চালাতে হবে। একটু বয়স বাড়লে টানা রিক্সা চালানো শুরু করি এন্টালি মার্কেটের সামনে।”
জালালুদ্দিন নির্মিত স্কুল
খানিক থামলেন গাজি সাহেব। বললেন, দাঁড়ান, একটু জল খাই। জল খেয়ে আবার বলে চললেন জীবন কাহিনি। রিক্সা থেকে ট্যাক্সিতে উত্তরণ হল আরও কয়েক বছর পর। ট্যাক্সি ধোয়ামোছার কাজ করতে করতে সেটা চালানোও শিখলেন। পরে ট্যাক্সি চালিয়ে দিনের শেষে মালিকের পাওনা মিটিয়ে বাকি টাকা ঘরে আনতেন। এ তো প্রায়শই চোখে পড়ে এ দেশে। কিন্তু তিনি আর পাঁচজনের চেয়ে একটু আলাদা। ভীষণ জেদি আর একরোখা। দু-চোখ ভর্তি স্বপ্ন তখন থেকেই ধিকিধিকি জ্বলত। ভাবলেন একটা স্কুল বানাবেন। স্বপ্নের স্কুলবাড়ি। ট্যাক্সিতে ওঠা যাত্রীদের বলতেন তাঁর স্বপ্নের কথা। সাহায্য চাইতেন। কেউ হাসতেন। কেউ গালি দিতেন। কিন্তু দমে যাননি জেদি জালালুদ্দিন।
দুই দশক আগে নিজের বসত ভিটেও স্কুলের নামে লিখে দিয়েছেন। দুটো স্কুল এবং একটি অনাথ আশ্রম গড়ে তুলেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সরকারি কোনও সাহায্য নেন না। তবে স্কুলের সামনের রাস্তাটা বেশ খারাপ। বর্ষায় জল জমে থাকে অনেকদিন। ছাত্ররা স্কুলে আসতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে সেই রাস্তা ঠিক করে দেওয়া হলে তিনি উপকৃত হবেন।
স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা
এই যুদ্ধে জালালুদ্দিন একা নন, তাঁর শরিক স্ত্রী তসলিমা। এখনও নিয়ম করে সপ্তাহের চার-পাঁচদিন স্কুলে ঝাঁট দেন, বাথরুম পরিষ্কার করেন। চার সন্তানকে ভালো করে দুধ খাওয়াতে পারেননি। কিন্তু এত এত ছেলেমেয়েদের মুখের হাসি দেখতেন রোজ। তাঁর মতো মায়ের কাছে এই যথেষ্ট।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়। গাজি সাহেবের ট্যাক্সি চালানোর একটা বড়ো ইতিহাস আছে। গাড়ির নম্বরঃ WB04E4753। ট্যাক্সির পিছনে লেখা, “The earning by this taxi is used for the students of Sunderban Orphanage School. I urge traffic police not to register any case against this taxi. Regards, taxi driver Gazi Jalaluddin.”
গাজি সাহেব তৈরি করেছেন সুন্দরবন ড্রাইভিং সমিতি
সুন্দরবন শিক্ষায়তন মিশন, ইসমাইল ইসরায়েল ফ্রি প্রাইমারি স্কুল এবং সুন্দরবন অরফ্যানেজ মিশন-এর মালিক নিজে শুধু ট্যাক্সি চালান এমন না, অন্য ছেলেদেরও শেখান। শুধু কি লেখাপড়া শিখলে হবে? কাজ চাই তো। তাই গাজি সাহেব তৈরি করলেন সুন্দরবন ড্রাইভিং সমিতি। যেখানে অঞ্চলের বেকার যুবকদের বিনাপয়সায় গাড়ি চালানো শেখানো হয়। তাদের মধ্যেই কেউ কেউ অন্যদের গাড়ি চালানো শেখাবে এবং স্কুল ও অনাথাশ্রমের জন্য নিজের রোজগারের একটা অংশ ব্যয় করবে।
নামটা খেয়াল রাখুন। গাজি জালালুদ্দিন। তাঁর স্ত্রীর নাম তসলিমা বিবি। নামগুলো ভুলবেন না। ভুলে গেলে কিন্তু আমরা আমাদের সত্তাকে অস্বীকার করতে শুরু করব। আমরা জোরগলায় বলতে পারব না, এই বাংলাকে নিয়ে গর্ব করার অনেক অনেক জিনিস আছে। গাজি জালালুদ্দিন এবং তাঁর লড়াইকে স্যালুট জানাচ্ছি আমরা।
