২০১৫ সালে অ্যাসিড হামলার শিকার হতে হয় মনীষাকে
কলকাতার কিছু দূরে জয়নগরের একটি গ্রামে বাড়ি মনীষা পৈলানের। ২০১৫ সালে অ্যাসিড হামলার শিকার হতে হয় তাঁকে। কলকাতা আসেন কিছু বন্ধু-বান্ধবের কথায়। তারপর নিজের মতো বাঁচতে শুরু করেন, পেশা শুরু করেন। মনীষার ফেসবুক প্রোফাইলের বায়ো-তে লেখা আছে, “পুড়ছি আমরা সবাই। কারো মুখে দাগ তো কারো অন্তরে। তাও নিজেকে ভালোবেসে দেখো দাগের চেয়ে জীবন সুন্দর।” হার না মানা মনীষা, সাহসী-ডানপিটে মনীষা আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসে বঙ্গদর্শনে। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন বঙ্গদর্শনের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সুমন সাধু।
সদ্য একটা অপারেশন থেকে ফিরলেন। এখন কেমন আছেন?
এখন ভালো আছি। তাছাড়া শারীরিক কাঁটাছেঁড়া থাকলেও সেটা সেরে যায়, কিন্তু মানসিক যন্ত্রণাটা দীর্ঘকালীন।
যতদূর জানি আপনি কলকাতার মেয়ে নন। কলকাতায় কীভাবে এলেন?
আমার বাড়ি জয়নগর। কলকাতা থেকে খুব একটা দূর নয়। অ্যাক্সিডেন্টের পর কিছু বন্ধুবান্ধব সাহায্য করে। তারা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, আমি যদি কলকাতায় একবার যেতে পারি তাহলে অনেক মানুষকে আমার কথা জানাতে পারব। বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব। তখন একটি সংগঠন আমাকে কলকাতা নিয়ে যায় এবং তাঁদের কাছেই রাখে। বছর দেড়েক হল যাদবপুরে একটা সরকারি আবাসনে থাকতাম। এখন অপারেশন হওয়ার জন্য সবকিছু ছেড়ে বাড়ি চলে এসেছি।
বাড়িতে কে কে আছেন?
আমাদের যৌথ পরিবার। সবাই আছেন। মা, বাবা, কাকা, কাকিমা, ঠাকুমা, আমরা তিন ভাই-বোন।
প্রতিবাদী মনীষা
আপনার জার্নিটা নিয়ে কিছু বলুন। সেখানে আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, পাড়া সবাই কীভাবে মিশে আছেন?
আমার মুখে অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনাটা ঘটে ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর। তারপর আমার পৃথিবীটাই বদলে গেছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবাই চিন্তিত ছিল আমি বাঁচব কিনা। আমার সঙ্গে থেকে বাড়ির প্রত্যেকে লড়াইটা করেছে। বিশেষ করে মা। যেখানে ডাক্তার দুশ্চিন্তা করছে, সেখানে আমার মা আশাবাদী ছিল যে বেঁচে ফিরবোই।
আরও পড়ুন: ভারতের প্রথম মহিলা মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের গল্প
অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার আগের মনীষা এবং পরের মনীষার মধ্যে কতখানি পার্থক্য?
অনেক পার্থক্য। আমি ছোটো থেকেই খুব সাহসী আর ডানপিটে। স্রোতে না মিশে উল্টো পথে হাঁটা আমার অভ্যাস। কিন্তু আমি তো গ্রামের মেয়ে, তাই কিছু কথা চেপে রাখতে হবে- এরকম একটা চিন্তাভাবনা কাজ করে। অনেকদিনই তো চুপ থেকে এলাম, কিন্তু এখন কেন চুপ থাকব। আমি যা হারাবার হারিয়ে ফেলেছি। তাই আগের আমিটার সঙ্গে পরের আমিটার পার্থক্য অনেকটাই।
তদন্ত হয়েছে ঠিকঠাক?
আমার মুখে যখন অ্যাসিড ছোঁড়া হয়, একমাত্র সেলিমকে দেখতে পেয়েছিলাম। আর কাউকে চিনতে পারিনি। রাত আটটা নাগাদ বাড়ি ফেরার পথে ঘটনাটা ঘটে। সেলিমের সঙ্গে আরও একটি ছেলে ছিল যে সাতদিনের মধ্যে ধরা পড়ে। তাকে জেরা করার পর প্রমাণিত হয় সেলিমের নাম। কিন্তু পাড়ার প্রত্যেকে বলছে সেলিম এটা কিছুতেই করতে পারে না। সেলিম ফোনটা মুম্বাইয়ে রেখে এসেছিল। যখনই আমি ফোন করছি ওখান থেকে কেউ একটা ফোন ধরে বলছে বাথরুমে গেছে বা খেতে বসেছে ইত্যাদি।

সেই ছেলেগুলি এখন কী করছে?
আমার বাড়ির পাশে যে ছেলেটি যুক্ত ছিল, সে প্রায় এক-দেড় মাস পর ধরা পড়েছে। সেলিম দুইবছর পর ধরা পড়ে। একমাসের মধ্যে ছাড়াও পেয়ে যায়। শুনেছি, সে নাকি আবার এখন বিয়ে করেছে, সংসার করছে। তাদের পরিস্থিতি এখন ভালোই। আমার যা হবার হয়েছে। ওরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই ঘটনাটার সঙ্গে জড়িত কতজন?
সাতজন।
অ্যাসিড আক্রান্ত মেয়েদের জন্য প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে?
আইন কিন্তু রয়েছে। প্রকাশ্যে অ্যাসিড বিক্রি করা যাবে না এবং অ্যাসিড ছুঁড়লে যথাযোগ্য শাস্তি হবে। এমনকি যাবজ্জীবন জেল অবধি আছে। পরবর্তীকালে আমি প্রচুর অ্যাসিড আক্রান্ত মেয়েদের কাছে গিয়ে ওদের কথা শুনেছি। প্রত্যেকটা কেস কোর্টেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেউ জাস্টিস পাচ্ছে না। ঠিকমতো শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না কাউকেই। প্রচুর মেয়ে এর ফলে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। এই সবটার মধ্যেই প্রচুর গণ্ডগোল রয়েছে আসলে। এরফলে কিন্তু অ্যাসিড আক্রান্তের সংখ্যাটা বাড়ছে।
কিং খানের সঙ্গে মনীষা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ছেলেরা নয়, মেয়েরাই এই হামলার শিকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা- এটাই তো পরতে পরতে জানান দেয়। আপনার কী মনে হয়?
আমার তো এক একসময় মনে হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র যে ছেলেদের মধ্যেই পুরুষতন্ত্র আছে এমনটা নয়, প্রচুর মেয়েদের মধ্যেও আছে। প্রচুর মেয়েও কিন্তু এই নোংরা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এই তো কিছুদিন আগে এক ননদ তার বৌদির গায়ে অ্যাসিড ছুঁড়েছে। এখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ বাদ যাচ্ছেন না। প্রত্যেককেই স্বীকার হতে হচ্ছে। খোলা বাজারে অ্যাসিড বিক্রি, সাজা না পাওয়া, আইনের গাফিলতি এগুলো এমন একটা জায়গায় চলে গেছে, যা দেখলে বোঝা যায় মানুষের বিকৃতি কোন জায়গায় পৌঁছেছে।
এই ধরনের অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে সামাজিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
দিল্লিতে লক্ষ্মী আগরওয়াল অনেকদিন ধরেই একটা মুভমেন্ট করছেন। তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করেই ‘ছপক’ ছবিটা তৈরি হল। যে চরিত্রে দীপিকা পাড়ুকন অভিনয় করছেন। এটা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। মানুষকে প্রভাবিত করবে বলেই আমার মনে হয়। আমি নিজেও সিনেমা দেখে কিছু না কিছু শিখি। আর যেকোনো মাধ্যমেই লড়াই করা যায়। সেটা লেখা, ছবি আঁকা, গান গাওয়া, অভিনয় করা যাই হোক না কেন। আমরাও কলকাতায় একটা মুভমেন্ট করছি। কিন্তু সেটা এখনও ছড়িয়ে দিতে পারিনি। কারণ যেকোনো কাজ করার জন্যই প্রচুর সোর্স আর অর্থের দরকার। আমরা এখানে প্রত্যেকেই ছাত্র, তাই নিজেদের মতো আন্দোলন করার চেষ্টা করছি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যতদিন বাঁচব আক্রান্তদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবোই। সেটা যেমনভাবেই হোক না কেন।
এখনও সারা ভারতে এরকম হাজার হাজার মেয়েকে অ্যাসিড হামলার শিকার হতে হয়। তাঁদের উদ্দেশে আপনি কী বলবেন?
কিছু বলার নেই আসলে, যার হয় সে-ই বোঝে এ যে কী অসহ্য যন্ত্রণা। যখনই খবর কানে আসে আমার লোম খাঁড়া হয়ে যায়, মনে হয় ওই মেয়েটার এখন কী হচ্ছে। আমি একটা কথায় খুব বিশ্বাস করি, চামড়া পুড়ে গেলেও জীবনের সুখ, চাওয়া-পাওয়া, প্রেম এগুলো কিন্তু পুড়ে যায় না। তোমার মুখ পুড়ে গেলেও তোমার মধ্যে কিছু না কিছু সত্ত্বা রয়েছে, যা প্রকাশ করে তুমি বাঁচতে পারো। আমার পরিবার সবসময় সঙ্গে ছিল। পরিবারের পাশে থাকাটা খুব জরুরি। আমি যে একজন ভিক্টিম, সবসময় সেটা ভাবলে চলবে না। আর এখন প্রচুর এনজিও চলে এসেছে। প্রত্যেকেই পাশে থাকছে। ডাক্তাররা খুব সাহায্য করছেন, আমাদের পাশে থাকছেন। হার মানলে চলবে না। থেমে গেলে চলবে না।