
কলকাতার বিখ্যাত মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রথম ছাত্রী
My soul is full of longing
for the secret of the sea,
and the heart of the great ocean
sends a thrilling pulse through me.”
– হেনরি ওয়ার্ডসওয়ার্থ লংফেলো
১৯৯৫ সালের কথা। কলকাতার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এমইআরআই) কর্তৃপক্ষ পড়ল মহা-সমস্যায়। অন্যান্য পড়ুয়াদের সঙ্গে বিই কোর্সের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এক মেয়ে। নাম সোনালী বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাতলার এই খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে প্রথমবার এরকম ঘটল। কিন্তু মেয়েদের জন্য কোনো হোস্টেল সেখানে ছিল না। সোনালী থাকেন বহু দূরে, হোস্টেলের ব্যবস্থা না থাকলে তাঁর পক্ষে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়। সত্যি বলতে, এমইআরআই -র গোটা ক্যাম্পাস জুড়েই কেবল ছেলেদের আধিপত্য। কর্মীদের মধ্যেও কোনো মহিলা নেই। তা বলে কি এই মেধাবী ছাত্রীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে? সিদ্ধান্ত নিতে ডাকা হয় জরুরি বৈঠক। অবশেষে শিক্ষকদের জন্য রাখা একটি ফাঁকা কোয়ার্টার দেওয়া হল সোনালীকে।
সোনালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল এলাহাবাদে। তাঁকে ছোটোবেলা থেকেই সমুদ্র হাতছানি দিত। কাকা এক বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করতেন। যখনই বাড়ি ফিরতেন, ছোট্ট সোনালীকে শোনাতেন উত্তাল সমুদ্রের রোমাঞ্চকর গল্প। সরল কিশোরীর মনে জেগে উঠত নাবিক হওয়ার অদম্য ইচ্ছে। ভাবতেন, কবে বড়ো হয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেবেন। যতদূর দেখা যায়, থাকবে শুধু জল আর জল, মাথার ওপর খোলা আকাশ, কত রকমের জলজ প্রাণী। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা আচ্ছন্ন করে থাকত সবসময়।
ধৈর্য ধরে তিনি প্রস্তুতি নিতে থাকেন সমুদ্রযাত্রার লক্ষ্যে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। তাতে স্বপ্ন সফল করার পথ আরো সুগম হয়। কিন্তু যখন এমইআরআই-তে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, বেঁকে বসল পরিবার। আত্মীয়-স্বজনেরা মনে করতেন, সোনালী এগিয়ে চলেছেন আত্মহত্যার দিকে। এমনকি তাঁর বাবাও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। কিন্তু সোনালী এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। কঠোর পরিশ্রম করে এমইআরআই-র প্রবেশিকা পরীক্ষায় জয় হাসিল করলেন। পা রাখলেন এমন প্রতিষ্ঠানে, যেখানে কোনো মেয়ে আগে কখনও পড়াশোনা করার সুযোগ পায়নি।
ভর্তি হওয়ার পর শুরুর দিনগুলো সোনালীর কাছে সহজ ছিল না। যেহেতু প্রথম এবং একমাত্র ছাত্রী, তাই প্রতিবন্ধকতা আসত মাঝেমাঝেই। সহপাঠীরা দূরে দূরে থাকতেন। ৪ বছরের বিই কোর্সে ভালো ফল করার জন্য মনপ্রাণ লাগিয়ে দেন সোনালী। প্রত্যেক সেমেস্টারে প্রথম স্থান লাভ করতেন। ধীরে ধীরে জিতে নেন সবার মন। সহপাঠীরা ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৯৯৯ সালে তিনি বিই সম্পূর্ণ করলেন। এরপর ৬ মাস প্রি-সি ট্রেনিং নিতে হয়। কিন্তু দুর্দান্ত ফলাফল সত্ত্বেও কোনো জাহাজ সংস্থা একজন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিতে রাজি ছিল না। তবু লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন সোনালী। শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেল বিক্রেতা সংস্থা মোবিল শিপিং কোম্পানিতে জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান।
৬ মাসের এই প্রশিক্ষণ ছিল খুব কঠোর। সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে বাড়ির জন্য মন আকুল হয়ে ওঠে। সহজে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। তবে সব কষ্ট সহ্য করতে রাজি ছিলেন সোনালী। শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং, ফিজি এবং আরও নানা দেশের বন্দরে তখন যেতে হয়েছিল। তারপর কলকাতায় ফিরে এমইআরআই-এর সার্টিফিকেশন পরীক্ষায় বসেন। উত্তীর্ণ হয়ে লাভ করেন যে কোনও আন্তর্জাতিক জাহাজে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেওয়ার ছাড়পত্র।
সোনালী ইতিহাস গড়লেন ২০০১ সালের ২৬ আগস্ট তারিখে। ভারতের প্রথম মহিলা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেদিন মোবিল শিপিং কোম্পানির ভেসেলে মেশিন রুমের দায়িত্ব নেন। তাঁর এই সাফল্য ভারতের সমুদ্র অভিযানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। সোনালী বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠলেন দেশের অগণিত কিশোরী-তরুণীর প্রেরণা, যারা নীল সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

