নদীর ধারে এই গ্রামে গিয়ে মনে হল আজই যেন আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস
এই গৃহবন্দি জীবনে আমরা প্রত্যেকেই যে যার মতো করে নতুন আলো খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেউ আড়ালে, কেউ সোচ্চারে। এই প্রথম বাক্যটা লিখতে লিখতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ১১ বছর আগে, ২০০৯ সালে আয়লা বিধ্বস্ত সুন্দরবনের দয়াপুর গ্রামে যাওয়ার দিনগুলোর কথা। সেই দিনটাও ছিল রোববার। বঙ্গদর্শন তখন সদ্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে গুটিগুটি পায়ে। পাঠক ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছেন, বাংলার ইতিবাচক ঠিকানার হালহকিকত, এমনকি আপনার বাড়িতে পৌঁছে গিয়ে সেই উদ্ভাসিত আলোটি খুঁজে আনার প্রচেষ্টা রাখি আমরা।
আমাদের আশ্রয় সেইসব মানুষগুলি, যাঁরা অন্ধকারের মধ্যে থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে জানেন। কেউ ভাঙা বাড়ি সারিয়ে তোলেন, কেউ সাধ্যমতো শিক্ষার প্রসার ঘটান, আবার বন্ধুর যত্ন নেন আরেক বন্ধু — এটাই তো বাংলা।
অসীমা ভাণ্ডারীর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির একাংশ
এখন আমরা আর পোর্টালবন্দি হয়ে থাকতে চাই না। বেরিয়ে পড়তে চাই বাংলার এদিক ওদিক। মানুষের কাছে পৌঁছে জেনে নিতে চাই তাঁর প্রয়োজনটুকু। আমফান ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বাংলার নানা জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভুবনেশ্বরী গ্রাম তার মধ্যে অন্যতম। বেশ কয়েকদিন কেটে গেলেও কুলতলির এই গ্রামে এখনও ধ্বংসলীলার চিহ্ন স্পষ্ট। বহু মানুষ ঘরছাড়া, খাবারের জোগানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সূর্য ডোবার পর অন্ধকারই একমাত্র ভবিতব্য। এই সংকটকালে গ্রামের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন অসীমা ভাণ্ডারী।
অসীমার পাঠশালা ও বাড়ি
এই খবরটি প্রথম নজরে আনে আমাদের আরও একটি পোর্টাল (www.getbengal.com)। সেই মতো এটি প্রকাশিতও হয়। তারপরেই বঙ্গদর্শনের সম্পাদকীয় বিভাগ (সুমন সাধু এবং শ্রেয়ণ রায়) ঠিক করে এমন খবর এই পোর্টালেও যাওয়া উচিত। এই দুই পোর্টালে অসীমা ভাণ্ডারীর খবরটি সম্পূর্ণ তথ্যসহ প্রকাশিত হবার পর তা বহু পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। দেশ-বিদেশ থেকে পাঠকরা আমাদের জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, কীভাবে এই অসাধারণ উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো যায়। সেই মতো আমাদের মূল কোম্পানি পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস-এর তৎপরতায় এবং সরকারি সহায়তায় আমরা ভুবনেশ্বরী গ্রামের অসীমা ভাণ্ডারীর সন্ধান পাই।
রোববার, ২১ জুন, সহকর্মী অরিজিৎ সেনকে নিয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কুলতলি ব্লকের ভুবনেশ্বরী গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।
কলকাতা থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ। জলের ধারে গোটা গ্রাম। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের পেশা চাষবাস। কিন্তু আমফান ঘূর্ণিঝড়ের পর চাষের সমস্ত জমিতে নোনা জল ঢুকে পড়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তাঁরা। ফলে এই বছর কোনো চাষই করা যাবে না। চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে সরাসরি পৌঁছালাম অসীমা ভাণ্ডারীর অর্থাৎ কাকিমার পাঠশালায়।
ছাত্র-ছাত্রীরা বসে রয়েছে ঘরের এক কোণে
ভুবনেশ্বরী গ্রামের গৃহবধূ অসীমার ছোটোবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের দারিদ্র। অভাবের কারণে চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে না পারলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই স্বপ্ন। আমফান সাইক্লোনের পর তিনিই হয়ে উঠলেন গ্রামের কচিকাঁচাদের আশা-ভরসা। গ্রাম ঢোকার প্রায় দুই-আড়াই কিলোমিটার আগেই থামানো হল আমাদের গাড়ি। এরপরের পথ মোটর বাইকে। অসীমা ভাণ্ডারীর বাড়ি পৌঁছালাম সকাল ১০ঃ২৫ নাগাদ। সূর্যগ্রহণের সময় হয়ে এসেছে। অঝোরে বৃষ্টি শুরু হল। পাঠশালায় গিয়ে দেখলাম যে ছাঁউনির নিচে তিনি পড়ান, তা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে তাই ওই একফালি বাড়িই ভরসা। কিন্তু ছাদ ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি নামলে ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল৷ একটু পাশে সরে বসা গেল আবার। কিছুক্ষণ পর সেখানেও জল পড়ছে। আবার একটু দূরে সরে গিয়ে বসা। এইভাবে ছোট্ট একখান ঘর হয়ে উঠছে শিক্ষার আবাস। কচিকাঁচাদের স্বপ্ন।
কাকিমার পাঠশালার কিছু স্বপ্নপূরণের দৃশ্য
শিক্ষার প্রসার হওয়া প্রয়োজন — এই যে মানসিকতা তিনি ধারণ করেছেন, আমার মনে হয়েছিল এই উদ্যোগের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। বিকেলের আলো নামলে যে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকার। হ্যারিকেনের আলো জ্বালতেও তো তেল লাগে, সেই টাকাই বা কোত্থেকে আসবে! কিন্তু অসীমা কিছুতেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেবেন না গ্রামের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত গ্রামের একমাত্র স্কুল রবীন্দ্র শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। কবে খুলবে স্কুল, তা কেউ জানে না। তাই সকাল-সন্ধে দু’বেলা অসীমার মাটির বাড়িতেই ক্লাস হয়। দিনে থাকে সূর্যের আলো, আর সন্ধেবেলা মিটমিটে হ্যারিকেনই ভরসা। অসীমার পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ছেলেও। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে।
অসীমা ভাণ্ডারী এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা
অসীমা ভাণ্ডারীর এই বিপুল কর্মকাণ্ডকে নিজের চোখে দেখার বড়ো সাধ হয়েছিল আমার। যেদিন ওই গ্রামে পৌঁছাই, সেদিন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে যোগ দিবস, পিতৃ দিবস এবং সংগীত দিবস। কিন্তু অসীমার কুঁড়েঘরে পৌঁছে আমার মনে হচ্ছিল সেই দিনটা যেন আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস। বাবা তো একরকম শিক্ষকই বটে, আবার যোগ-ব্যায়ামের দ্বারা আমরা শরীর ও মন ভালো রাখতে পারি, আর সংগীত আমাদের বাঁচিয়ে রাখার প্রেরণা দেয়। এই সবে মিলে অসীমা সেদিন আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষকের মতো। যাঁদের কথা বইয়ে পড়েছি, গুণীজনদের থেকে জেনেছি, সেদিন যেন তেমন একজন মানুষকেই চাক্ষুষ করলাম।
স্কুলব্যাগ হাতে কচিকাঁচারা
আমার চোখে দেখার অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে আজ ভাগ করে নিলাম। আমাদের পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস-এর পক্ষ থেকে (বঙ্গদর্শন এবং গেট বেঙ্গল) ভুবনেশ্বরী গ্রামকে ঘিরে কিছু পরিকল্পনা করেছি। সেই সঙ্গে অসীমা ভাণ্ডারী তাঁর এই উদ্যোগ বাচ্চাদের মধ্যে আরও সুষ্ঠভাবে যাতে চালিয়ে যেতে পারেন, তার জন্য আমরা শহর থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে আর কী কী করতে পারি, সেই সংক্রান্ত কিছু পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে৷ আশা করছি, আমাদের পাঠক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাদের পাশে থাকবেন। অসীমা ভাণ্ডারীর শিক্ষার আলো কীভাবে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারা যায় আসুন সবাই মিলে ভাবি এবং সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াই। কারণ, অসীমা ভাণ্ডারী কিন্তু প্রমাণ করলেন তথাকথিত উচ্চশিক্ষা না থাকলেও সম্পূর্ণ মনের জোরে আগামী প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপণ করা যায়।
ছবি ও ভিডিও: নিজস্ব।