May 28, 2020 | 6:54 PM

ঝড় আমাদের ফিরিয়ে দিল অন্ধকারের রং, ঝিঁঝি পোকার ডাক

কলেজ স্ট্রিটে থই থই বইয়ে অফুরান চোখের জল। হাউহাউ কান্না। সাদার্ন এভেনিউ জুড়ে রাস্তার দু’পাশে সারি সারি মৃত শব। গাছেদের। শহর জুড়ে কত গাছ ছিল গুনিনি এতদিন। এখন গাছের টুকরো টুকরো লাশ দেখছি। কত পাখি বাসাহীন হল? আমরা ধরে রাখতে পারিনি। আমরা ধরে রাখতে পারি না। মুঠোভরা জলের মতই গলে যায় শুধু। প্রকৃতির দান, প্রকৃতিই ফিরিয়ে নেয়।

তবুও ঝড় হয়ত দু’দণ্ডের জন্য ফিরিয়ে দিয়েও যায় কিছু। যে আলোর পিপাসায় আমরা ঝলসে নিচ্ছিলাম চোখ, এক ফুঁয়ে কেউ যেন নিভিয়ে দিল। বোঝা গেল, সব কথা ফুরিয়ে যায়নি এখনও। সমস্ত অবসর বার্ধক্যেই আসে না। যার কেউ ছিল না, তার কাছে ফিরে এলো জমাট অন্ধকার। অন্ধকারেও যে এত রং, বহুদিন যেন ভুলতে বসেছিলাম আমরা।

এ যেন বহুদিন পর শহরে ফিরল রাত। বহুদিন পর দোকানির কাছে গিয়ে আকুতি, দাদা মোমবাতি আছে? মোমবাতি! বাঙালি শুনেছিলাম প্রতিবাদেই নাকি এখন শুধুমাত্র মোমবাতি জ্বালে, মিছিলে হাঁটে! সেই গরিবের ধন, মোমবাতি। বহুদিন পর বিরতিহীন ছুটি…. মুখোমুখি বসিবার। বহুদিন পর কল্লোলিনী কলকাতার কলের খোঁজে রাস্তায় নেমে আসা। বাঙালির সেই অতি চেনা কলতলার ঝগড়া। এতদিন তো জানতামই না, ‘টাইম’ কলের জল কখন আসে, কখন যায়। বহুদিন পর ফ্ল্যাটের একতলার জানালার নিচে ঝিঁঝিঁর ডাক। এ কি মায়া!!

‘নিকুচি করেছে করোনা!’ বলে দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে থাকা পাড়া যেন জেগে উঠেছে। গৃহবাসী কলকাতা লোডশেডিং-এর কল্যাণে অলিগলির মোড়ে, ব্যালকনি থেকে ব্যালকনি। বন্ধু, কী খবর বল, কতদিন দেখা হয় নি! গুলতানি, হৈহল্লা, গাছ কাটার লোক খোঁজা, ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের গাড়ির পেছনে দৌড় লাগানো – যেন বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এল। হোমরাচোমরা কর্পোরেট বস মুখার্জিবাবুরও যে খালি গায়ে লুঙ্গি থাকতে পারে, রুকমিনি বলে দত্ত বাড়ির পাড়া কাঁপানো ঝিনচ্যাক মেয়েটার ডাকনাম যে পুঁটি, এসব জানকারি ঝড় না এলে পাওয়া যেত! বাড়ি বাড়ি রিকশায় খাওয়ার জল বয়ে নিয়ে আসা দুবলাপাতলা ছেলেটাকেও পাঁচতলার রায়চৌধুরী গিন্নি কি পরম মমতায় ‘তোদের ঘরটা ঠিকঠাক আছে তো সোনা?’ বলে খবর নেন, এসব কি ভাবতে পেরেছি কখনও? ঝড়ে সব কেমন যেন ওলটপালট করে দিয়ে গেল।

‘ফিরব’ বললেই ফেরা যায় নাকি! তবুও যেন কলকাতা ফিরে এসেছিল বাংলায়। ফিরেছিল চার পাঁচ আগের দশকে। ফিরে এসেছিল হাতপাখার ঘাম, রোয়াকের খেউড় কিংবা আকাশবাণী কলকাতার সান্ধ্য খবরে। তিরিতিরি বয়ে চলা অলস জীবনে ঠাঁই ছিল না চিলচিৎকারে মেতে ওঠা নাটুকে টিভি বোদ্ধাদের। এবার ধীরে ধীরে আমাদেরও ফেরার পালা। শহর কলকাতায় উঠে দাঁড়াচ্ছে বাস স্ট্যান্ড লাগোয়া ইলেকট্রিক পোল, গোবিন্দর হেলে পড়া বিড়ির দোকান, মিত্রকুঠির হাড় কঙ্কাল বের হয়ে আসা সাবেকি ফটক। ওদিকে উঠে দাঁড়াচ্ছে সুন্দরবন, উঠে দাঁড়াচ্ছে পানের বরজ, টালির চাল। হয়তো এভাবেই নোনাজল সরে গিয়ে জেগে উঠবে আলপথ, বীজতলাতে ছড়িয়ে পড়বে গুঁড়ো গুঁড়ো রোদ্দুর। জেগে উঠছে, কারণ, জাগতেই হবে। উঠে দাঁড়াচ্ছে, কারণ, উঠে দাঁড়াতে হয়। ফিরে যেতে হয়। ঠিক যেভাবে ফিরে আসার বিশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়াবে সময়। উঠে দাঁড়াবে নতুন কোনও কবিতা। কিংবা মেঘ ছেঁড়া আহির ভৈরোঁ।

(ছবিঋণ – এনডিআরএফ)

Developed by DXDasia