প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে বিয়েবাড়ি : ব্যান্ডপার্টিদের ছাড়া সমস্ত আয়োজনই যেন অসম্পূর্ণ

প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে কলকাতার ব্যান্ডপার্টিদের দোকান ঘুরে দেখল ‘বঙ্গদর্শন’

“আমাদের নিয়ে লিখবেন!” প্রথমটায় খানিক অবাক হলেন কলেজস্ট্রিট লাগোয়া মেহবুব ব্যান্ডের কর্ণধার রাজা তাহাব। ৮০ বছর বয়সী এই প্রবীণ ব্যক্তি রোজ সকালে নিয়ম করে দোকানে আসেন, অপেক্ষা করেন যদি বায়না আসে কোনো! আজও তেমনটাই হচ্ছিল, তাই আমায় দোকানে আসতে দেখে ভেবেছিলেন বুঝি নতুন অর্ডার। তারপর কথা শুনে বুঝলেন এবারেও ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল না। কিন্তু পরক্ষণেই বললেন, “লিখুন দেখি বড়ো করে, যাতে মানুষের আবার আমাদের কথা মনে পড়ে! আমরা কেমন আছি সেই খোঁজ তো আর কেউ নেয় না! আপনি যে খোঁজ নিতে এসেছেন এই বা কম কি!”

কলেজ স্ট্রিটের মোড় থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ ক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার বামদিকে সারি সারি অসংখ্য দোকান। প্রতিটা দোকানের চেহারা মূলত একই রকম। ছোট্ট ঘরের চারিদিকে সাজানো ড্রাম, স্যাক্সোফোন, ঝুনঝুনি, ট্রাম্পেট। তার সঙ্গে রয়েছে বাদকদের পোশাক, টুপি। মহাত্মা গান্ধি রোড ফুটপাথ ঘেঁষে একের পর এক এরকমই মেহবুব, মিলন, বেঙ্গল, ভারত ইত্যাদি সব ব্যান্ডপার্টির দল। পাশাপাশি একই ব্যবসা নাকি প্রতিযোগিতা বাড়ায়, অথচ এখানে সে বালাই ছিল না কোনোদিনই। একটা সময় ছিল মহাত্মা গান্ধি রোডের এই সবকটা দোকানেই উপচে পড়া ভিড় থাকতো। পথচারীরা সকলেই পাশ কাটিয়ে হেঁটে যেত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রাস্তায় শোনা যেত ব্যান্ড পার্টির বাজনার শব্দ। মাঝে মাঝে বেজে উঠত হিন্দি গানের সুর। সঙ্গে ড্রামের দ্রিমদ্রিম, করতালের ঝমঝম আর ট্রাম্পেটের পোঁ পোঁ আওয়াজ। গমগম করত পুরো রাস্তা। প্রতিটা দোকানের সামনে একই ছবি। মাথায় রং বেরঙের টুপি। গায়ে ঝলমলে রাজকীয় পোশাক। বাদ্যযন্ত্র সার দিয়ে সাজানো রাস্তার পাশে। খরিদ্দার এলেই তাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাজনা বাজিয়ে শোনাতেন বাদকেরা। তারপর বাজনা পছন্দ হলেই বায়না পাকা।

মেহবুব ব্যান্ডের রাজা তাহাবের সঙ্গে কথায় কথায়

মেহবুব ব্যান্ডের রাজা তাহাবের সঙ্গে কথায় কথায় জানলাম তাদের এই ব্যবসা নাকি প্রায় একশো বছরের। প্রায় তিন পুরুষ ধরে এই ব্যান্ড পার্টির ওপর ভরসা করেই ওঁদের সংসার চলছে। কলম ধরার বয়সেই হাতে ড্রাম স্টিক ধরেছিলেন তিনি। রাজা তাহাব নিজেই জানালেন, “আমার দলের সব বাজিয়েরা তো আমার সন্তানের মতো, মাসের শেষে ওদের কালো মুখটা দেখলে আমারই মন খারাপ হয়। তাই বাধ্য হয়ে সবাই এখন অন্য অন্য কাজ করে। কেউ ঠেলা চালায়, কেউ ফল বিক্রি করে। সংসার তো আর থেমে থাকবে না!”

এম.জি রোডের রাস্তায়

তাঁর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গেই উঠে এল কলকাতার সেকেলে ছবিও। রাজকীয় সেই সময়ের কথা উঠতেই লক্ষ করলাম তিনি চোখ মুছছেন। আমাদের দেশে তখনও পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। বিহার এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে কলকাতায় ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন কিছু যুবক। উদ্দেশ্যে ছিল এই শহরে বাজনা বাজিয়ে রোজগার করবে। বাঙালি তো চিরকালই হুজুগে, তাই এই শহরে বাজনদারদের জনপ্রিয় হতে বেশি সময় লাগেনি। ফলে নিমেষেই একের পর এক দোকান তৈরি হতে থাকে মহাত্মা গান্ধি রোডের ধারে। এরপর দেশ স্বাধীন হল, পেশার কদরও বাড়ল। বিহার বা উত্তরপ্রদেশ থেকে ব্যান্ডের বাজনাদাররা এখানে এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করলেন। ওঁদের দেখাদেখিতে বাঙালিরাও এই পেশায় আসতে শুরু করলেন। বাবা-কাকাকে দেখে নতুন প্রজন্মও এক সময়ে হাতে তুলে নিল ট্রাম্পেট, ক্ল্যারিনেট, স্যাক্সোফোন, সানাই, ড্রাম কিংবা ঝুনঝুনি। চলতে লাগল ভরপুর তালিম। তাই ওই সময়টা যেন ছিল এ শহরে ব্যান্ডপার্টির স্বর্ণযুগ।

আলাপচারিতায় শম্ভু চক্রবর্তী  

আলাপ হল একজন বাঙালি বাদকের সঙ্গে। আমাকে লক্ষ্য করে, নিজে থেকে ডেকেই কথা বললেন। “জানেন তো দিদি, সময়ের সঙ্গে সবকিছুই তো বদলে যায়। আজ ক্যাসেট বাজালেই বাজনা শোনা যায়, তাই মানুষ আর বেকার খরচা বাড়াতে চায় না!” ওঁর নাম জিজ্ঞেস করে জানলাম, শম্ভু চক্রবর্তী। বললেন প্রায় ২০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন তিনি। কলকাতার এই ব্যান্ডপার্টির মহলে ওঁর নামটা একটু অবাক করায় হয় তো, কিন্তু ওঁর অকপট উত্তরে তার সবটাই ফিকে হয়ে যায়। উনি বললেন, “বিশ্বাস করুন দিদি, এতো বছর এখানে আছি কোনোদিন বুঝতে পারিনি জাত-ধর্মের ভেদাভেদ কী! এতো অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়েছি আমি – নাসিম, ইকবাল সবাই একসঙ্গে থেকেছি। একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছি। বিপদের সময় তো এরাই সবাই পাশে ছিল!”

মিলন ব্যান্ডের সেলিমের কথায় জানলাম শেষ ভালো কাজ জুটেছিল সেই নভেম্বর মাসে, তাও হাতে গোনা একটাই। যে হাতে তিনি একসময় স্যাক্সোফোন ধরতেন, আজ পেটের তাগিদে সেই হাতেই হাতা-খুন্তি ধরতে হয়েছে তাঁকে। জানালেন, “কখনও ভাবিনি অন্য কাজ করতে হবে। করোনা সব শেষ করে দিল। এখন বিকল্প পেশা হিসেবে রান্নার কাজ করতে হয়। বাজনা বাজিয়ে পেট চালানো খুব মুশকিল হয়ে গিয়েছে”

বিয়েবাড়ির আমেজ জমাতে ব্যান্ড পার্টির জুড়ি মেলা ভার

একসময় জানুয়ারি মাস মানেই ছিল কলকাতার ব্যান্ড পার্টির রমরমা। একের পর এক বিয়ে বাড়ি কিংবা নানান উৎসব-মেলা। সবকিছুতেই ছিল ব্যান্ডের বাজনার চল। যদিও স্কুল-কলেজের মাঠে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস বা নেতাজি জয়ন্তীতে কুচকাওয়াজের শব্দের সঙ্গে ভেসে আসে ড্রামের শব্দ। কিংবা প্রতিমা বিসর্জনের সেই ভরপুর আমেজ, যা কিনা ব্যান্ডের শব্দেই জমজমাট। এক সময় তাঁদের ছাড়া কোনও আনন্দই সম্পূর্ণ হতো না কলকাতায়। শুধু এই শহরেই নয়, গোটা দেশ জুড়েই চাহিদা ছিল তাঁদের। পাটনা থেকে দিল্লি অথবা লখনৌ থেকে মুম্বাই, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডাক পড়ত তাঁদের। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে স্বাভাবিক ভাবেই ছেদ পড়েছে তাঁদের ব্যবসা। তবে ফিকে হয়ে যায়নি ব্যান্ডপার্টিদের সুর। আজও গ্রামবাংলা-সহ কলকাতার নানান জাতীয় দিবসে তাঁদের ছাড়া মূল মেজাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

‘বেঙ্গল ব্যান্ড’-এর মহম্মদ নাদিম এর কথায়, “একেই মন্দার বাজার তার ওপরে করোনা এসে যেন আমাদের ডুবিয়ে দিল। মানুষই বা আর কী করবে, ২০০ জনের তালিকায় আমাদের নাম বাদ তো দিতেই হবে!”

তবু আজও মহাত্মা গান্ধি রোডের রাস্তায় টিকে আছে লাল নীল পোশাকের সেই সুরের ফেরিওয়ালারা। বেঙ্গল ব্যান্ডের মহম্মদ আজারুদ্দিনের কথায় মিলল নতুন আশার খোঁজ, “এই তো দুদিন পর একটা বুকিং আছে। তাই জোরদার প্র্যাকটিস চলছে এখন”। হ্যাঁ, এই পাল্টানো সময়েও জ্বলজ্বল করছে ডায়েরির পাতার ওই দু-একটা বুকিং-এর তারিখ। যে তারিখগুলোই হয়তো নতুন স্বপ্নের মহল এনে দিতে পারবে আমাদের তিলোত্তমাকে, আমাদের বাংলাকে।

______

কভারের ছবি: Haarway (https://www.haarway.com)
ভিতরের ছবি ও প্রতিবেদন: কঙ্কনা মুখার্জী

Post Tags
Developed by DXDasia