শিলিগুড়িতে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি আজ ধূলিস্যাৎ

১৯২৫ সালের ১০ জুন পাহাড় থেকে শিলিগুড়িতে এসেছিলেন গান্ধীজি

মহাত্মা গান্ধী যে কাঠের বাড়িতে এসে রাত কাটিয়েছিলেন এখানে, সেই বাড়িটি আজ আর নেই। সেখানে উঠেছে দশ তলা বিল্ডিং। গান্ধীজির স্মৃতি বিজড়িত সেই হারিয়ে যাওয়া বাড়ির পাশেই ছিল প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী শিউমঙ্গল সিং-এর আরেকটি কাঠের বাড়ি। সে-বাড়িটিও প্রায় দেড়শো বছরের পুরানো। এক সময় সে কাঠের বাড়ি ছিল অনেকটা গোডাউনের মতো। শিলিগুড়ি আলুপট্টির শ্রমিকরা সেখানে থেকে কাজ করত। সে বাড়িটির কিছু সংস্কার করে আজ সেখানে বসবাস করছে প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী শিউমঙ্গল সিং-এর নাতি নন্দু সিং-এর পরিবার।

পুরানো শিলিগুড়ির অনেক স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছে শহর থেকে। আরও অনেক ঐতিহাসিক স্মৃতি হারাতে বসেছে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে স্মৃতি বিজড়িত শিলিগুড়ির অনেক ঘটনার মধ্যে একটি হল জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর শিলিগুড়ি আসা। মহাত্মা গান্ধী ১৯২৫ সালের ১০ জুন পাহাড় থেকে শিলিগুড়ি এসেছিলেন। আসলে গান্ধীজি দার্জিলিং এসেছিলেন অসুস্থ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে দেখতে। ১৯২৫ সালের ১৬ মে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দার্জিলিং আসেন। কদিন বাদেই তিনি সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় গান্ধীজি তাঁর ব্যক্তিগত সচিব মহাদেশ দেশাই ও এনি বেসান্তকে সঙ্গে নিয়ে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দার্জিলিং আসেন। দার্জিলিং থেকে ১০ জুন সড়কযোগে হিলকার্ট রোড ধরে গান্ধীজি শিলিগুড়ি আসেন তখনকার কংগ্রেস নেতা তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী শিউমঙ্গল সিং-এর কাঠের বাড়িতে। পরদিন শিলিগুড়ির তিলক ময়দানে(এখন কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম) গান্ধীজি এক সভায় ভাষণও দেন। ইংরেজ হটাতে একসঙ্গে লড়াইয়ের বার্তা তিনি দিয়েছিলেন কংগ্রেস কর্মীদের। কিন্তু শিলিগুড়ির সেইসব পুরানো স্মৃতির ছবি আজ কেউ দিতে পারে না। এমনকি যাদের বাড়িতে এক রাতের অতিথি ছিলেন গান্ধীজি, সেই শিউমঙ্গল সিং-এর নাতি নন্দু সিং তাঁর দাদুর ছবি ছাড়া আর কোনও ছবি দিতে পারছেন না। অথচ এই শিউমঙ্গলকে নিয়ে গান্ধীজির ব্যক্তিগত সচিব মহাদেব দেশাই তাঁর ‘ডে টু ডে উইথ গান্ধীজি’ বইতে লিখেছেন, ‘ইন শিলিগুড়ি উই কেম অ্যাক্রস এনাদার সলিটারি ফ্রেন্ড ওয়ার্কিং আওয়ে উইথ দ্য সেম ক্যুইট ফেইথ এন্ড ডগড জীল… হি হ্যাড প্রি এরেঞ্জড টু লাভলি মিটিংস ফর গান্ধিজি। দ্য ফ্রেমওয়ার্ক অফ দ্য হাউস হি অয়াজ বিল্ডিং অয়াজ রেডি বাই দেন এন্ড হি হেড ফিক্সড উডেন বোরডস ইন ইট ফর গান্ধিজিস হল্ট।’

ওই সময় শিলিগুড়ির কংগ্রেস পরিচালিত হত জলপাইগুড়ির কংগ্রেসের মাধ্যমে। শিউমঙ্গল সিং রাতের অন্ধকারে জলপাইগুড়ি যেতেন। ফিরে আসতেন ভোর হওয়ার আগে। তিনি জলপাইগুড়ি থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করার বিভিন্ন কর্মসূচির কাগজপত্র নিয়ে আসতেন। ১৯১৯ সালে ইংরেজের রাউলাট আইনের প্রতিবাদে গান্ধিজির ডাকে দেশ জুড়ে আন্দোলন হলে তার প্রভাব পড়েছিল শিলিগুড়িতেও। আর এখানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা শিউমঙ্গল সিং। ১৯১৯ সালের ৬ এপ্রিল প্রথম হরতাল হয়েছিল শিলিগুড়িতে। ১৯২০ সালে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চলার সময় সেই আন্দোলনের কথা শিলিগুড়ি মহকুমার গ্রামে গ্রামে প্রচার করতে যাওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছিলেন তিনিই।

বেশি লেখাপড়া না জানলেও শিউমঙ্গল সিং দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। ব্যবসার কাজে তিনি বিহার থেকে শিলিগুড়ি এসেছিলেন। ১৯৩১ সালে বরিশালের স্বাধীনতা সংগ্রামী সতিন সেন দার্জিলিং জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে শিলিগুড়িতে সভা করেন। তিনিই প্রথম শিলিগুড়িতে জাতীয় কংগ্রেসের শাখা খোলার প্রস্তাব দেন। এরপর শিউমঙ্গল সিং সেই উদ্যোগ নেন। তার আগে ১৯৩০ সালে শিলিগুড়িতে লবণ আইন অমান্য হলে সেখানেও বিরাট ভূমিকা পালন করেন এই শিউমঙ্গল সিংই। ১৯৩১ সালেই চট্টগ্রাম ও হিজলির নিরস্ত বন্দিদের ইংরেজ পুলিশ অত্যাচার করলে শিলিগুড়িতে শিউমঙ্গল সহ অন্য কংগ্রেস কর্মীর নেতৃত্বে হরতালের ডাক দেওয়া হয়। কংগ্রেস কর্মীরা সেই সময় মিছিল করে সভাও করেন। ১৯৩৪ সালের ১৬ নভেম্বর দার্জিলিং-এ বাংলার গভর্নর অ্যান্ডারসনকে হত্যার চেষ্টা হয়। কিন্তু সেই ঘটনার জেরে সন্দেহবশত ইংরেজ পুলিশ শিলিগুড়িতে কংগ্রেস নেতা শিউমঙ্গল সিং ও লক্ষ্মীনারায়ণের বাড়িতে তল্লাশি নেয়। তারপর ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও বিরাট ভূমিকা নেয় শিলিগুড়ি। ইংরেজ পুলিশ সেই সময় থানার সামনে গুলি চালায়। তাতে শহিদ হন কয়েকজন। শিলিগুড়ি থানার সামনে আজও সেই শহিদ বেদি স্মৃতি বহন করে চলেছে। সেই আন্দোলনে শিউমঙ্গল সিং-এর এক ভাইপো শহিদ হন।

আজ শিলিগুড়ি অনেক বড় হয়েছে। ব্যস্ত শহর যানজটে কাহিল। হিলকার্ট রোডের হাসমি চকের(পুরানো দিনের রোড স্টেশন মোড়) পাশে দশ তলা বিল্ডিং-এর সামনে দিয়ে সবাই চলাফেরা করেন। কিন্তু কজনের আর মনে আছে সেই বিল্ডিং একসময় প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী শিউমঙ্গল সিং-এর কাঠের দোতলা বাড়ি ছিল? তাঁর নাতি নন্দু সিং জানান, যদিও দাদুর নামে একটি স্কুল শহরে তৈরি হয়েছে, তাঁরা দুঃস্থ মেধাবীদের মধ্যে দাদুর নামে একটি কোচিং ক্লাস করতে চান। তাঁর দাদুর স্মরণে দশ তলা বিল্ডিং-এর সামনে কিছু স্মৃতি চিহ্ন করা যায় কিনা ভাবছেন। একটি মিউজিয়ামও যে হতে পারে সেকথাও ভাবছেন নন্দু সিং। শিলিগুড়িতে নতুন প্রজন্মও এসব স্মৃতির কিছুই জানে না বা কেউ জানলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয় – এ নিয়েও আক্ষেপ করেন তিনি।

Developed by DXDasia