কলেজস্ট্রিটের ‘মহল’ হোটেল ছিল এক সময়ের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং, থাকতেন শরদিন্দু, জীবনানন্দ

মহল-এর ঠিকানা – ৬/৩ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০৯, ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলের ঠিক পিছনের গলিতে

এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন এবং বৃহত্তম বইপাড়াটি রয়েছে কলকাতার কলেজস্ট্রিটে। এই কলেজস্ট্রিট জানে প্রথম সবকিছু। একদিকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, আরেকদিকে কফি হাউস। আপনি যদি রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে ঢুঁ মারেন, দেখতে পাবেন উঁকি দিচ্ছে ‘মহল’। দূরদূরান্ত থেকে বইপাড়ায় নিজেদের ব্যবসার তাগিদে আসেন বহু মানুষ। অন্যদিকে ভিড় করেন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের জন্যই কলেজস্ট্রিট আপনাকে জানান দেবে যে, সরু একফালি একটা গলির ভিতর আটপৌরে ‘মহল’ আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। সারাদিন কাজ-শেষে শরীরে ক্লান্তি নামলে চলে যান মহলে। সেখানে বাহারি স্বাদের খাবার রসনাতৃপ্তি ঘটাবেই।

কলেজস্ট্রিট মানেই স্মৃতির সরণি। টুকরো টুকরো স্মৃতির কোলাজে সেজে ওঠে তিলোত্তমার এই প্রাণকেন্দ্র। ক্লাস, আড্ডা, বই দেখা, বই কেনা সেরে ভর দুপুরবেলা ঠিক যখন খিদেয় পেট চুঁ-চুঁ করবে, ‘মহল’ যেখানে আছে আর চিন্তা কী! এই রেস্তোরাঁর সঙ্গে জুড়ে আছে কিংবদন্তি বাঙালিদের নাম। যেমন রয়েছেন স্বয়ং ব্যোমকেশ বক্সি, তেমনি আছেন জীবনানন্দ দাশও। অবাক হচ্ছেন?

ইতিহাস বলছে, আজ যেখানে ‘মহল’ রেস্তোরাঁ রয়েছে, সেখানেই ছিল বিখ্যাত ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’। এই বাড়ির দেওয়ালে আজও জ্বলজ্বল করছে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং-এর বোর্ড। একসময় এই বাড়িতেই থাকতেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বাড়িতে বসেই তিনি সমস্ত সমস্যার সমাধান করেছেন ব্যোমকেশ বক্সির মাধ্যমে। কারণ ব্যোমকেশের অনেক লেখাই লেখা হয়েছে এই বাড়িতে। এছাড়াও এখানে দীর্ঘদিন ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। সৃষ্টি করে গেছেন একের পর এক কবিতা। কী মায়াময় ছিল সেইসব দিন। আজও তাই মহলের দেওয়ালে শুনতে পাওয়া যায় শিল্পীর কলম খসখসের শব্দ। এই কেউ আপনাকে ডেকে নেবে সাহিত্যের পাতায়।

ভরদুপুরে ভাত ছাড়া বাঙালির ঠিক জমে না। কলেজস্ট্রিট চত্বরে ভাতের হোটেল বলতে সবার আগে যে নামটা আসে, সে মহল। মহল তার যাত্রা শুরু করলেও, এর গল্প আসলে আরও পুরোনো। কারণ মহলের এই জায়গাটা ছিল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং-এর রান্নাঘর। বর্তমান কর্ণধার সন্দীপ দত্তের ঠাকুরদা ১৯১৭ সালে তৈরি করেছিলেন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং। এখন এই দোকানের নাম ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। ওপার বাংলা থেকে আসা প্রচুর মানুষ যখন এপারের কলকাতায় আসেন, মহলে একবার ঢুঁ মারবেনই। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে অবধি খোলা থাকে এই দোকান, তারপর কিছু সময়ের বিরতি নিয়ে আবার রাত ৮টা থেকে ৯-৩০টা অবধি খোলা হয়। রুটি এবং ভাত দুই-ই থাকে। মহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ঠিকানা হল – ৬/৩ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০৯। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলের ঠিক পিছনের গলিতে। এদিকে মহাত্মা গান্ধি রোড দিয়ে এলে চিত্তরঞ্জন কলেজের ঠিক বিপরীতে রয়েছে মহল। মহলে এসে আপনি চেখে দেখতে পারেন সাধারণ নিরামিষ খাবার থেকে রুই কালিয়া, কাতলা কালিয়া, তেলাপিয়া, চারাপোনা, কাটাপোনা, পার্সে, পাবদা, ইলিশ ভাপা, চিকেন কারি, মটন কারি। প্রত্যেকটি পদই ভীষণভাবে পকেট ফ্রেন্ডলি।

পুরোনো কলকাতার মোহ এখনও নেশার মতো ঘিরে রাখে একদল বাঙালিকে। সেইসব ইতিহাসের পাশে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকতে কার না ভালো লাগে বলুন! খাবার স্বাদ আর গন্ধের মেলবন্ধন আপনাকে মহলে নিয়ে আসবে। মহল খুলবে। মহলে ঝাঁট পড়বে। পুরোনো কলকাতার বুকে এই ঐতিহ্যবাহী অন্তর‘মহল’ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

Developed by DXDasia