স্বাধীনতাপূর্ব অখণ্ড ভারতে পথ চলা শুরু হয়েছিল পুরোনো ‘কলিকাতা’র এই ‘পাইস’ হোটেলের
চারদিকে শালপাতা। পাশেই রাখা মাটির ভাঁড়। নানান মশলা ব্যঞ্জনে ম-ম করছে মাছ, মাংস, ডিম। আর রসিক বাঙালির পাতে খাবার পড়তেই চেটেপুটে খাচ্ছেন। নামটি কেতাবি, কিন্তু বিজ্ঞাপনের কোনো জাঁকজমক নেই। এই পাইস হোটেলের নাম ছড়িয়েছে লোকমুখে। এই হোটেল এখনও ধরে রেখেছে তার আভিজাত্য, বনেদিয়ানা, এমনকি বাঙালিয়ানা। পাইস হোটেলের মানচিত্রে এই হোটেলের নাম থাকবে সবার উপরে। কারণ জানেন? আসলে এই হোটেলের নামটাই কাফি — ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’।
স্বাধীনতাপূর্ব অখণ্ড ভারতে পথ চলা শুরু হয়েছিল পুরোনো ‘কলিকাতা’র ‘পাইস’ হোটেলের। প্রথমে অবশ্য এর নাম ছিল ‘হিন্দু হোটেল’। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর হোটেলের নাম বদলে রাখা হল ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’। যেন ইতিহাসের সরণি বেয়ে হাঁটা এই দীর্ঘ যাত্রাপথ। দোকানের দেওয়ালে তাই এখনও ভারতের বীরযোদ্ধাদের রোমহষর্ক কাহিনি শুনতে পাওয়া যায় বৈকি!
জনপ্রিয় ও জনদরদি তৎকালীন ছাত্রনেতা সুভাষচন্দ্র বসু (পরে নেতাজি) ছিলেন এই হোটেলের অন্যতম খদ্দের৷ বহুবার এসে খেয়ে গিয়েছেন৷ শুধুই খাননি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মিটিংও সাড়তেন। এই হোটেলেই মধ্যাহ্নভোজন করেছেন ঋষি অরবিন্দ-সহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী৷ শুধু খাওয়া নয়, বিপ্লবের সময় হোটেলের ভিতর গা ঢাকাও দিয়েছেন তাঁরা৷ সেই কারণেই দেশাত্মবোধের ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন মানগোবিন্দ ও তাঁর ভাই প্রহ্লাদ পণ্ডা৷ দেশ স্বাধীনের পর হোটেলের নাম বদলে যায়। ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’৷ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া ভবানী দত্ত লেনের এই হোটেল এখনও ডুবে আছে আপাদমস্তক বাঙালিয়ানায়৷
শুরুর দিন থেকেই এঁরা নিজেদের খাবারের গুণগত মান বজায় রেখে চলেছেন। ১৯২৩ সাল থেকে চলে আসছে কলাপাতায় খাবার দেওয়ার রেওয়াজ। ওড়িশা থেকে আসা মানগোবিন্দ পণ্ডা এই হোটেলটি চালু করেন৷ খাদ্যরসিকরা এখানে জল খান মাটির ভাঁড়ে। আগে মাটিতে বসে কাঁসার থালাতেও খাবার ব্যবস্থা ছিল। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে এসেছে চেয়ার-টেবিল। কলেজ পাড়ার গুণীজনরা তাঁদের দুপুরের খাবারটি নিয়মিত এখানেই খেয়ে তৃপ্ত হন।
মেনুতে প্রতিদিন থাকে প্রায় ১২-১৩ রকমের মাছের পদ৷ থাকে রুই মাছের কালিয়া, চিতল মাছের কোর্মা, পাবদার ঝাল, চিংড়ি মালাইকারি, সরষে ইলিশ-সহ আরও অনেক মাছের পদ৷ থাকে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, পুঁই বিটুঁলির চচ্চড়ি, আলুভাজা, সেঁকা পাপড় এমনকি আমের চাটনি।

প্রয়াত মানগোবিন্দের তৃতীয় প্রজন্ম অরুনাংশু পণ্ডা এখন এই হোটেলের দায়িত্বে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বইপাড়া এলাকা বলেই প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। দামও সাধ্যের মধ্যে। কোভিডের সময় এই দোকান সাময়িক বন্ধ থাকলেও বর্তমানে খোলা রয়েছে।
স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল, আসলে বয়সের বাঁধ মানে না। তাই আট থেকে আশির দল এখনও রোজ ভিড় জমান এই হোটেলে। শুধুই কি খাওয়া? বিপ্লব, আন্দোলন আর দেশ স্বাধীনের সেইসব দিনগুলোর জমানায় আবারও ফিরে যেতে একবার ঢুঁ মারুন কলকাতার ঐতিহাসিক এই পাইস হোটেলে।
ছবি সৌজন্যেঃ স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলের ফেসবুক পেজ