
ব্রিটেন কি এবছর নেতাজি সম্পর্কিত ‘অতি স্পর্শকাতর’ কিছু ফাইল প্রকাশ্যে আনবে?
নেতাজির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী ২০২২-এ। তবে তা পালন শুরু হয়ে গেল ২০২১-এর ২৩ জানুয়ারি থেকেই। এটাই বোধহয় সময় নেতাজিকে নিয়ে কিছু পুরোনো বিতর্ককে সামনে তুলে আনার। দেশপ্রেমিকদের সেনাবাহিনী তৈরি করে, ইংরেজের সঙ্গে লড়াই করে, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ইংরেজদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। যাকে বলে যুদ্ধের জন্য স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত সঙ্গী সংগ্রহ করা। কিন্তু এইভাবে নেতাজির সঙ্গে জাপানের সম্পর্ককে নিয়ে সেই সময়ে কুৎসিত মন্তব্য করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। নেতাজিকে বলেছিল তোজোর কুকুর। কার্টুনও ছাপা হয়েছিল দলীয় পত্রিকায় নেতাজিকে নিয়ে। সেদিনের সেই কমিউনিস্ট পার্টি আজ দু’টি দল। সিপিআই এবং সিপিএম। সিপিএম ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে, একদিন যে দলকে তারা এক নম্বর শত্রু বলত, স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে সেই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন লড়েছিল। ২০১৯-এর লোকসভায়, এবং আসন্ন বিধানসভায়ও সেই তথাকথিত শত্রুর সঙ্গে জোট অব্যাহত আছে। এই প্রসঙ্গে আবার আসব, তার আগে ফিরে আসি নেতাজির কথায়। ব্রিটেন কি ২০২১ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কিত ‘অতি স্পর্শকাতর’ কিছু ফাইল প্রকাশ্যে আনবে? যাদবপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক বিশিষ্ট নেতাজি গবেষক পূরবী রায় জানিয়েছেন, ব্রিটেনের প্রাক্তন চ্যান্সেলর ব্যারন আলেকজান্ডার আরভিন এই ঘোষণা করেছিলেন চ্যান্সেলর থাকাকালীন (১৯৯৭-২০০৩)। বিচারপতি মনোজ মুখার্জি কমিশনের দেখার জন্য যে ৭০০ ফাইল দিল্লি থেকে পাঠানো হয়েছিল কলকাতায়, সেখানেই এই সংক্রান্ত ফাইলটি চোখে পড়ে পূরবী রায়ের। সেই সব ফাইলের ফটোকপি করতে দেওয়া হয়নি, শুধু গবেষণার স্বার্থে দেখে টুকতে দেওয়া হয়েছিল। পুরোনো নোটবই খুলে পূরবী রায় এই তথ্য জানিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়টি নিয়ে এখন থেকেই ব্রিটেনের সঙ্গে কথা শুরু করা উচিত।
নেতাজি নিয়ে দুটো খুব স্পষ্ট শিবির আছে। এক পক্ষ বিশ্বাস করেন, তাইহোকুতে ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়। অন্যপক্ষের মত, ওই বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। ১৯৫৬ সালে শাহনওয়াজ কমিটির পর খোশলা কমিশনেও বলা হয়েছিল তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়। আর ওই খোশলা কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে ইন্দিরা গান্ধি সরকারের এতটাই অস্বস্তি ছিল যে সেই রিপোর্ট সংসদের দুই কক্ষে পাস করানো হয় জরুরি অবস্থা চলাকালীন কার্যত বিনা আলোচনায়।
কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এখনও বেশ কিছু নেতাজি সংক্রান্ত ফাইল আছে, যেগুলো ডিক্লাসিফাই করা হয়নি
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান বিষয়ে সত্য খুঁজতে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময়, ১৯৯৯-এর ১৪ মে গঠিত হল বিচারপতি মনোজ মুখার্জি কমিশন। ২০০৫ সালে রিপোর্ট জমা পড়ল। ২০০৬ সালের ১৭ মে সংসদে পেশ হল সেই রিপোর্ট। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়নি। সংসদে আলোচনার পর রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করল ইউপিএ সরকার। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জাস্টিস মনোজ মুখার্জিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কমিশনের রিপোর্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কিছু বলবেন কি না? তিনি তখন বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন ওই রিপোর্টকে যেন মান্যতা দেওয়া হয়। যদিও তা এখনও হয়নি।
নেতাজিকে নিয়ে পুরোনো বিতর্ক-প্রসঙ্গ আরেক বার ফেরা যাক। সুভাষ বসু যখন চিঠি লিখতেন সহকর্মীদের উদ্দেশে, প্রায়ই সেই সব চিঠিতে তিনি কমিউনিস্টদের মতোই সম্বোধন করতেন ‘কমরেড’ বলে। কিন্তু কমিউনিস্টরা তাঁকে বিশ্বাস করেনি। বিশ্বাসঘাতক বলেছে। পরে অবশ্য কমিউনিস্টরা কেউ কেউ তাঁদের ভুল বুঝতে পারেন। সিপিআই নেতা রণেন সেন তাঁর বই ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিবৃত্ত’-য় লিখেছেন, ‘১৯৭৩-৭৪ সালে ডঃ গঙ্গাধর অধিকারী ফোন করে আমাকে অজয় ভবনে ডেকে পাঠান। যাওয়ামাত্র তিনি উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলেন, “আমি জীবনে দুটি পাপ কাজ করেছি। একটি ‘পাকিস্তান ও জাতীয় ঐক্য’ বই লিখে। বইতে আমি জিন্না ও মহাত্মাজিকে এক পংক্তিতে ফেলেছি…..দ্বিতীয় মহাপাপ, পিবি-র অন্যতম সভ্য হিসেবে নেতাজির অবমাননা করেছি”। প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ অবশ্য তিনি পাননি, এরপরই সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
নেতাজি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার খুঁজতে ভুল করেননি। সেই ইতিহাস আজ সবার জানা। কিন্তু সিপিএম একই ভুল করে গিয়েছে স্বাধীনতার পরেও বার বার। গান্ধিহত্যা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ না দেওয়ার কারণে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের রাজনীতিতে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার পর। গান্ধির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে সাভারকর যখন যুবকদের আহবান জানান ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য, তার ফল যে স্বাধীনতার পর ভুগতে হবে সে তো জানা কথাই। হিন্দুত্ববাদীদের এই কোণঠাসা অবস্থা থেকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যেমন অবদান আছে জয়প্রকাশ নারায়ণের তেমনি অবদান আছে সিপিএমের। ইন্দিরার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে হিন্দুত্ববাদীদের দেশের রাজনীতির মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে তারা অনুঘটকের কাজ করেছিল। তাদের সেদিনের সেই স্ট্র্যাটেজি যে ভুল ছিল আজ তা জলের মতো পরিষ্কার। সাধারণ মানুষের মধ্যে হিন্দুত্বাদীদের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিল তাদের সেই স্ট্র্যাটেজি। একই কাজ তারা করেছিল রাজীব গান্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে ভি পি সিং-এর নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে সরকার গঠনে। বামেদের সমর্থনে এই দুটি অকংগ্রেসি সরকারের সময়ই রথযাত্রা, রামমন্দির আন্দোলন সর্বোচ্চ গতি পায়। ঠিক একই ভাবে হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে ২০০৮ সালে বামপন্থীরা ৬১ জন সাংসদ নিয়ে অনাস্থা এনে মনমোহন সরকারকে ফেলতে গিয়েছিলেন। সেটাও ছিল এক আত্মঘাতী স্ট্র্যাটেজি। সরকার ফেলতে পারেননি, কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থনে ২৫৬টি ভোট তাঁরা পেয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু সেদিন কোনও পক্ষকেই সমর্থন না করে ভোটদানে বিরত ছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রায় হারিয়ে যাওয়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে দেশের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে যেমন দায়ী কংগ্রেসের শাসনের দুর্নীতি এবং বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তেমনই এই ফিরে আসায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে বামপন্থীদের ভুল স্ট্র্যাটেজি। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে জ্যোতি বসুর সভার কথা কেউ কোনওদিনই ভুলবে না। জ্যোতি বসু শেষের দিকে সম্ভবত এই ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন বলেই ২০০৮ সালে গোপনে হিন্দুত্বাদীদের সাহায্য নিয়ে মনমোহন সিং-এর সরকার ফেলায় তাঁর আপত্তি ছিল। যদিও তখন দলে তাঁর কথা শোনার মতো লোক-জন বিশেষ কেউ ছিল না। এটা ঠিক সিপিএমকে হারাতে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। কিন্তু মমতাকে দিয়ে বিজেপি তাদের কোনও কর্মসূচি অনুমোদন করাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য-রাজনীতির মূলস্রোতে বিজেপি আসতেও পারেনি। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপি ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য-রাজনীতির মূলস্রোতে জায়গা করে নেয়, সিপিএমের ভোটারদের ভোটে পুষ্ট হয়েই।
কোথায় কোথায় আছে নেতাজি সংক্রান্ত ফাইল? পূরবী রায়ের মতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এখনও বেশ কিছু ফাইল আছে যেগুলো ডিক্লাসিফাই করা হয়নি।
জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য ঐতিহাসিক প্রতুলচন্দ্র গুপ্তকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আইএনএ-র ইতিহাস কয়েক খণ্ডে লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই ইতিহাস তিনি যথাসময়ে লিখে ভারত সরকারের কাছে জমাও দেন। তারপর সেই পাণ্ডুলিপির যে কী হল, তা আর জানা যায় না। প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত তাঁর আত্মজীবনী ‘দিনগুলি মোর’-এ লিখেছেন, সংসদে বহুবার এই নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে। তিনি কার্যত এড়িয়ে গিয়েছেন। সেই পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে জানতে আরটিআই করা হয়েছে, সেও অনেক বছর হল। জবাব মেলেনি।
বিমান দুর্ঘটনায় যদি সুভাষের মৃত্যু না হয় তাহলে নেতাজির মৃত্যু কীভাবে হল?
পূরবী রায় জানিয়েছেন আরও দু’টি জায়গায় বড়ো সংখ্যায় নেতাজি-ফাইল আছে। যেগুলো ভারত সরকার কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার মাধ্যমে আনানোর ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়াত ব্রিটিশ লেবার পার্টি এমপি নেতাজি-ভক্ত লর্ড পিটার আর্চারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল নেতাজি সংক্রান্ত বহু ফাইল। তার প্রতিলিপি ভারতে আনার ব্যবস্থা করা উচিত। প্রাক্তন ব্রিটিশ গোয়েন্দা হিউ টয়-এর ব্যক্তগত সংগ্রহেও ছিল আলমারি বোঝাই নেতাজি সংক্রান্ত ফাইল। কী করে তাঁর সংগ্রহে এই বিপুল সংখ্যক নেতাজি-ফাইল গেল সেটাও একটা প্রশ্ন! লন্ডনে গিয়ে হিউ টয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন পূরবী রায়। হিউ টয় তাঁকে ফাইলগুলি দেখিয়েছেন, কিন্তু পড়তে দেননি। নেতাজি নিয়ে এই ব্রিটিশ গোয়েন্দার বই ‘সুভাষচন্দ্র বোস দ্য স্প্রিঙ্গিং টাইগার’-এর যে ‘কপি’ আমরা হাতে পাই, সেখানে তিনি কিন্তু লিখেছেন সুভাষের মৃত্যু হয়েছিল তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায়। কিন্তু পূরবী রায়ের দাবি, এই বইয়ের প্রথম সংস্করণে হিউ টয় লিখেছিলেন, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষের মৃত্যু হয়নি, কিন্তু সেই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার সব কপি রহস্যজনক ভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। পরবর্তী সংস্করণে বলা হয়, বিমান দুর্ঘটনাতেই সুভাষের মৃত্যু হয়েছিল। হিউ টয় প্রয়াত। তাঁর সংগ্রহের ফাইল কী করে দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে ভারত সরকারের সক্রিয় হওয়া উচিত বলে মনে করেন পূরবী রায়।
সুভাষ বসুকে হিন্দুত্ববাদীরা আইকন বানানোর চেষ্টা করছেন। সুভাষের ভারতে কোনও হিন্দু-মুসলমান ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন ছিল ঐক্যবদ্ধ ভারত। স্বপ্ন সফল হয়নি, কিন্তু সেই আদর্শর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের আদর্শের কোনও-ই মিল নেই। কমিউনিস্টরা যে সুভাষের অবমাননা করেছিল, তা নিয়ে জ্যোতি বসু ১৯৭০-এ একটি প্রকাশ্য সভায় ভুল স্বীকার করে বলেছিলেন, সুভাষের মতো দেশপ্রেমিক সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির মূল্যায়ন ভুল ছিল। তবে এই নিয়ে সিপিএমের পলিটব্যুরো বা কেন্দ্রীয় কমিটির কোনও বিবৃতি আছে বলে জানা নেই। নেতাজি-১২৫-এ সিপিএমের সামনে সুযোগ এসেছে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার।
যুদ্ধবন্দি আইএনএ সেনাদের কী হল?
বিমান দুর্ঘটনায় যদি সুভাষের মৃত্যু না হয় তাহলে সুভাষের মৃত্যু কীভাবে হল? ১২৫ বছর তো কোনও মানুষ বেঁচে থাকতে পারেন না। এই ব্যাপারে একটা মত হল, যুদ্ধবন্দি হিসেবে রাশিয়ার কারাগারে সুভাষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৩-র ২৮ জানুয়ারি মস্কো রামকৃষ্ণ মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহারাজ স্বামী জ্যোতিরূপানন্দ (রথীন মহারাজ) অসমের করিমগঞ্জে একটি অনুষ্ঠানে এসে বলেছিলেন, (এই খবর একটি বাংলা সংবাদপত্র এবং ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত হয়েছিল) মস্কোতে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত জওহরলাল নেহরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত সাইবেরিয়ার ওমসক শহরের কারাগারে নেতাজিকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁকে একটি ছোটো ‘জানলা’ দিয়ে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। কথা বলতে পারেননি, প্রবল ঠান্ডায় উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল নেতাজিকে। প্রসঙ্গত ওমসক শহরেই (তখন জাপান অধিকৃত) ‘প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্ট অফ ফ্রি ইন্ডিয়া’-র দফতর খুলেছিলেন সুভাষ। রথীন মহারাজের সঙ্গে ছিলেন রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি-র এক উচ্চপদস্থ প্রাক্তন আধিকারিকের কন্য লিলিয়ানা মালাকোভা। তিনি ছিলেন মস্কো রামকৃষ্ণ মিশন শাখার সচিব। লিলিয়ানা অবশ্য বলেছিলেন, তিনি খোঁজ করে জেনেছেন সুভাষ নামে কাউকে ওই জেলে বন্দি করা হয়নি। তবে গোপনীয়তার জন্য সুভাষকে যদি অন্য নামে বন্দি করা হয়ে থাকে, তাহলে এই নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা কঠিন। কারণ বন্দিদের ফাইল যেখানে আছে, তাতে নামের পাশে কোনও ছবি নেই। নরেন্দ্র মোদি সরকার এক বছর ধরে সুভাষ বসুর ১২৫ বার্ষিকী পালন করবে। খুব ভাল কথা। কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেলেন নেতাজি, সেই উত্তর আন্তরিক ভাবে কেউ খুঁজছে বলে মনে হয় না।
একই সঙ্গে আরও একটা বিষয়ে মানুষ জানতে আগ্রহী। সেটা হল আইএনএ সেনাদের কী হল? আজ পর্যন্ত জানা যায় না আইএনএ সেনারা সংখ্যায় কত ছিলেন। ৩০ হাজার না ৪০ হাজার? নাকি তার চেয়েও বেশি! নেতাজি আইএনএ সেনাদের বলেছিলেন, আপনারা প্রথমে বিপ্লবী তার পরে সেনা। এই ভাবে এক প্রশিক্ষিত সেনাদলকে তিনি প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের সংগঠনে পরিণত করেছিলেন। বার্মা বা মিয়ানমারে যে সেনারা ধরা পড়েন, তাঁদের রাখা হয়েছিল সেন্ট্রাল কারাগার, ইনসেন কারাগার এবং ওল্ড সেক্রেটারিয়েটে। শোনা যায় ইঙ্গ-আমেরিকান সেনা তাঁদের উপর অত্যাচার চালিয়েছিল। ১৯৪৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি, এই সময়ে তিনটি জাহাজে কয়েক হাজার আইএনএ সেনাকে দেশে ফেরানো হয়। প্রকৃত সংখ্যা কেউ জানে না। সংখ্যাটা ২০-২৫ হাজারও হতে পারে। এই সেনাদের আনা হয় যুদ্ধবন্দি হিসেবে। তাঁদের পাঠানো হয় তামিলনাড়ু, ব্যারাকপুর এবং পাকিস্তানের কোনও একটি জায়গায়। তার পর তাঁদের কী হল? এই দেশপ্রেমিক সেনাদের ইতিহাসও ভারতবাসীর মোটেই জানা নেই। আজ বা কাল, এই ইতিহাসও নতুন করে খুঁজে বের করার দাবি কিন্তু উঠবে।

