কলকাতা থেকে ঢাকা : কাঁটাতারের ভেদাভেদ ফিকে হয়ে যায় নববর্ষের উদযাপনে

বঙ্গজীবনে নববর্ষ : কলকাতা ও ঢাকায়

বাংলা নববর্ষ একান্তই বাঙালির, বাংলাভাষী মানুষের নিজস্ব অনুষ্ঠান। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশভাগ দুই ভূখন্ডকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বিভাজিত করে দিলেও বাঙালির আবেগ, বাঙালির সংস্কৃতিকে পৃথক করতে পারেনি। তাই বাংলা বছরের শুরুতে এপার-ওপার দুই পারের বাঙালিরাই আনন্দে মেতে ওঠেন নতুন বছরকে বরণ করে নিতে। দুই বাংলার দুই রাজধানী কলকাতা (Kolkata) এবং ঢাকা (Dhaka) এদিন সেজে ওঠে অন্য রূপে, যে রূপ বছরের অন্য দিনগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

বাংলাদেশে বর্ষবরণ এখন রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাজধানি ঢাকার রাজপথে মানুষের ঢল নামে। যেমনটা হয় আমাদের এখানে দুর্গাপুজোর সময়।

কলেজস্ট্রিট বইপাড়ার বর্ষবরণ

শুরু করা যাক কলকাতার বর্ষবরণ দিয়ে। এদিন কালীঘাট (Kalighat), দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar) সহ বিভিন্ন মন্দিরে সারা বছরের মঙ্গল কামনায় অনেকে পুজো দেন। সোনা গয়নার দোকান, জামা-কাপড়ের দোকান সহ বিভিন্ন দোকানে বাঙালি ব্যবসায়ীরা হালখাতা করেন। আগত ক্রেতা ও নিমন্ত্রতদের নতুন বছরের ক্যালেন্ডার ও মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়িত করা হয় দোকানে দোকানে। কলেজস্ট্রিট (College Street) বই পাড়ারও এদিন অন্য রূপ, আলাদা মেজাজ। বছরের অন্যান্য দিনের মতো কেনা-বেচার তাড়াহুড়ো নেই। তার বদলে দেখা যায় ছোট বড় সব বই বিক্রেতা ও প্রকাশকরা সাধ্যমতো আয়োজন করেন লেখক-পাঠককে আপ্যায়িত করতে। অনেক প্রকাশক নতুন বই প্রকাশ করেন এই শুভদিনে। যদিও সেটা আগেকার তুলনায় অনেক কম। কারণ এখন বেশরিভাগ বই প্রকাশিত হয় ইংরেজি বছরের শুরুতে কলকাতা বইমেলায়। কোনো কোনো বড় প্রকাশকের অফিসে লেখক-পাঠক সমাবেশে আড্ডা জমে ওঠে রীতিমতো। সঙ্গে চলে হালকা খাদ্য-পানীয়। অনেক পাঠক এইদিন কলেজস্ট্রিটে আসেন তাঁদের প্রিয় লেখককে কাছ থেকে দেখে চক্ষু সার্থক করতে। অনেকে আসেন জনপ্রিয় লেখকদের সই (Autograph) সংগ্রহ করতে। কলেজস্ট্রিট বইপাড়ার অংশটুকু বাদ দিলে বাকি চিত্রটা মোটামুটি একই থাকে শহরের অন্যান্য জায়গায়। কলকাতার অনুষ্ঠানের কথা বেশিরভাগ পাঠকেরই জানা। তাই কলকাতাকে ছুঁয়ে এবার চলে যাই ঢাকায় বর্ষবরণের কথায়।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক সংজ্ঞা অনুযায়ী ভারত (India) ও বাংলাদেশ (Bangladesh) দুটি আলাদা রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সময় ভিত্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে তিরিশ মিনিট এগিয়ে। তেমনিভাবেই আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ওপার বাংলার পয়লা বৈশাখও (Poila Boishakh) আমাদের থেকে একদিন এগিয়ে। তাই এপার বাংলায় যেদিন চৈত্র সংক্রান্তি, ওপার বাংলায় সেদিন নববর্ষ (Nababarsho)। বাংলাদেশে বর্ষবরণ এখন রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাজধানি ঢাকার রাজপথে মানুষের ঢল নামে। যেমনটা হয় আমাদের এখানে দুর্গাপুজোর (Durga Pujo) সময়। কয়েক বছর আগে (১৪২৫ বঙ্গাব্দে) সেখানকার বর্ষবরণ দেখার ইচ্ছে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম ঢাকায়। পয়লা বৈশাখের দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঢাকার নানা জায়গায় নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন। এর মধ্যে থেকে বিশেষ বিশেষ কয়েকটি স্থানের অনুষ্ঠানের সুখস্মৃতি ভাগ করে নিলাম পাঠকের সঙ্গে।

প্রথমেই বলতে হয় রমনার বিখ্যাত বটমূলে ‘ছায়ানট‘-এর অনুষ্ঠানের কথা। ১৩৭৪ সনের (ইংরাজি ১৯৬৭সাল) পয়লা বৈশাখের ভোরে সেখানে প্রথমবার সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছিল বাংলা নববর্ষ। তারপর থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিবছরই সেখানে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশে জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পেয়েছে। ‘ছায়ানট‘-এর ইতিহাসটা সংক্ষেপে বলে নেওয়া যাক। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হওয়ার আগে এই ভূখন্ডটি পূর্ব-পাকিস্তান পরিচয়ে সামরিক শাসনের অধীন ছিল। তখন উর্দুকে সেখানকার রাষ্ট্রভাষা হিসাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় পাকিস্তান (Pakistan) সরকারের তরফে। এমনকী ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্ম-শতবর্ষ পালনের উদ্যোগকেও নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা হয়। সেসময়ে কিছু বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে (যাঁদের প্রায় বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী) ‘ছায়ানট‘ নামে এই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনটি জন্মলাভ করে। এঁরা বর্ষবরণ ছাড়াও পঁচিশে বৈশাখ,  বাইশে শ্রাবণ, বসন্তোৎসব, শারদোৎসব প্রভৃতি পালন করেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহু মানুষ এইসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ‘ছায়ানট‘ এক এক বছর এক একটি থিম বেছে নেয়। আমি যে বছর (১৪২৫) গিয়েছিলাম সে বছরের থিম ছিল “বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান“। সকাল সোয়া ছটায় বাঁশিতে ভোরের রাগালাপ দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের প্রভাতী অনুষ্ঠান। একক গান, সমবেত গান, কবিতাপাঠ প্রভৃতি পরিবেশন করেন প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পী। এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটির লাইভ সম্প্রচার করে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন।

ভোজনরসিক বাঙালিকে হাতছানি দেয় বড়ো বড়ো হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফুডকোর্টের পান্তা-ইলিশ, চিতল মাছের কোপ্তা, গজাল মাছের শুঁটকি প্রভৃতি জিভে জল আনা নানান খাদ্যসম্ভার।

২০০১ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে জঙ্গি হানায় প্রাণ গিয়েছিল ১০ জন নিরপরাধ মানুষের। তারপর থেকে হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু হয়েছে সরকারি তরফে। সারা শহরে নজরদারি চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (RAB)। রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান ও চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা চলাকালীন আকাশপথে হেলিকপ্টারের নজরদারিও দেখা গেল। অনুষ্ঠান স্থলে কেউ কোনো অপরাধমূলক কাজকর্ম করলে RAB এর ভ্রাম্যমান আদালতে (মোবাইল কোর্ট) তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থাও থাকে। নিরাপত্তার খাতিরে উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান বিকাল পাঁচটার মধ্যে শেষ করে নগরবাসীকে ঘরে ফিরে যাওয়ার সরকারি নির্দেশ জারি থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা‘ আর একটি বড় ইভেন্ট। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই এবং শান্তির জয় ও অশুভ শক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ এই শোভাযাত্রার প্রবর্তন করে ১৯৮৯ সালে। প্রথমদিকে এর নাম ছিল ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা‘। ১৯৯৬ সাল থেকে নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ (Mongol Shovajatra)। ২০১৬ সাল থেকে এই শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর ইনট্যানজিয়েবল কালচারাল হেরিটেজের মর্যাদা লাভ করেছে। বিশাল আকারের রং-বেরংয়ের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর নকল অবয়ব তৈরি করে এই শোভাযাত্রা বেরোয়। সেবছরের শোভাযাত্রার থিম ছিল “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি“। শতাধিক শিল্পকর্ম নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করেন চারুকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সহ বহু মানুষ। বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ায় অংশগ্রহণকারীরা হাতে ধরা লম্বা লাঠির ডগায় বেঁধে মুখোশ প্রদর্শন করেন। সঙ্গে থাকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকের বাদ্যি। ফুলের গয়না ও রং-বেরংয়ের শাড়িতে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন বয়সের মহিলা ও পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত পুরুষেরা ঢাকের বাদ্যির তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করতে করতে চলেন। এছাড়া মুখে ও হাতে রং দিয়ে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা 

এছাড়া ছোট-বড় আরো নানান অনুঠানের আয়োজন চোখে পড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তন, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে রাজধানীর পাচঁটি মঞ্চে আয়োজন করা বর্ষবরণের রকমারি অনুষ্ঠান। মিরপুর, উত্তরার রবীন্দ্র সরণি বটতলায়, পুরাতন ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে, শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এবং একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় পরিবেশিত হয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাডেমির রবীন্দ্রচত্বরে সকালে শুরু হয় নববর্ষ বক্তৃতা ও পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া এদিন একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় দশ দিন ব্যাপী ‘বইয়ের আড়ং‘ (বই বাজার) ও বৈশাখী মেলা। এর বাইরে আরও আছে। সবগুলির উল্লেখ সম্ভব নয়। এইভাবে বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় উৎসব-নগরীতে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও কর্পোরেট সংস্থা তাঁদের পণ্য ও পরিষেবার বিজ্ঞাপন সম্বলিত সুদৃশ্য হাতপাখা বিতরণ করে শহর জুড়ে। ভোজনরসিক বাঙালিকে হাতছানি দেয় বড়ো বড়ো হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফুডকোর্টের পান্তা-ইলিশ, চিতল মাছের কোপ্তা, গজাল মাছের শুঁটকি প্রভৃতি জিভে জল আনা নানান খাদ্যসম্ভার।

যেসব অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিলাম তার সবগুলো চাক্ষুষ করা একদিনে কারো পক্ষে সম্ভব নয় একথা বলাই বাহুল্য। তাই আমার না দেখা কিছু অনুষ্ঠানের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে পরদিন ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র মারফত। দুই বাংলার একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই পোশাক তবু আমরা একে অপরের কাছে বিদেশি। কাছে যেতে গেলে পাসপোর্ট-ভিসার বেড়াজাল পেরোতে হয়! মনে পড়ে যায় ভূপেন হাজারিকার সেই জনপ্রিয় গান — “একই আকাশ একই বাতাস / এক হৃদয়ে একই তো শ্বাস / দোয়েল কোয়েল পাখির ঠোঁটে একই  মূর্ছনা। ….”

 

 

Developed by DXDasia