তালপাতার পাখার নকশায় ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার লোকগাথা

সেই ঐতিহ্য কি মনে রেখেছে বাঙালি?

“সাপ লুডো, চিত্রহার, লোডশেডিং, শুকতারা, পাঁচসিকে, দুঃখদের গল্প বল, বন্ধু চল”। যাদের ছোটবেলাটা শুকতারা পড়ে কেটেছে তাদের কাছে লোডশেডিং শৈশবের একটা মস্ত বড়ো স্মৃতি। আবার এই লোডশেডিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা রকমের নষ্টালজিয়া। বিজলী বাতিটি নেভার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো পরিবার জুড়ে ছাদে কিংবা উঠোনে ভিড়। শুরু হলো ভূতের গল্পের আড্ডা, সঙ্গে একটি হ্যারিকেন আর একটি তালপাতার হাতপাখা। 

এইসব নকশায় ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার লোকগাঁথা, জ্যামিতিক নকশা, গান এবং বিখ্যাত প্রবাদ-প্রবচন। ঠান্ডা হাওয়া দেওয়ার পাশাপাশি এগুলি দৃষ্টিনন্দন এবং রুচিশীল।

“শীতের কাঁথা, বর্ষার ছাতা আর গরমের পাখা”, এ ছিল বাঙালির চিরকেলে সম্বল। সেই গ্রিক রোমান সভ্যতার যুগ থেকে চলে আসছে এই হাত পাখার ব্যবহার। একটু পুরোনো দিনে বেড়ে ওঠা প্রায় সকলেই ঠাকুমার পাখার বাতাস খেতে খেতে তার ঝুলি ভরা গল্পের আনন্দ নিয়েছে। তবে সময়ের সাথে হাত পাখার বিবর্তনও হয়েছে অনেকখানি। একেবারে প্রথম দিকে পাখা গুলিতে কোনো প্রকার ভাঁজ ছিল। পরের দিকে কিছু ইউরোপীয় বণিক চিন, জাপান থেকে ফোল্ডিং বা ভাঁজওয়ালা পাখার ব্যবহার শেখেন এবং সেখান থেকে তা আমাদানি করেন। পরের দিকে ওই আঠেরো শতকের প্রথম দিকে ইউরোপে পাখা তৈরি শুরু হয়৷ তখন এই পাখার চাহিদা দুষ্প্রাপ্যই ছিল না, ছিল দূরমুল্যও। পাখার ওপর তখন নানা রকম নকশার সঙ্গে মণি মানিক্য অবধি বসানো হত। পাখায় নকশার মাধ্যমে তুলে ধরা হত তখনকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনকে। তাছাড়া চিন দেশ থেকেও ব্যাপকহারে সুন্দর কারুকার্য করা পাখার আমদানি তো আগে থেকে ছিল প্রচুর। লন্ডনের গ্রিনিচের বিখ্যাত মিউজিয়ামে রয়েছে এই হাত পাখার প্রচুর নিদর্শন। 

প্রযুক্তির হাওয়া লেগেছে সব ক্ষেত্রেই, হোক সে শিল্প-সংস্কৃতি, যোগাযোগ কিংবা নিত্যদিনকার কাজ-কর্ম; প্রযুক্তি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আমাদের। ফলশ্রুতিতে আজ বিলুপ্তির পথে বহু ঐতিহ্যবাহী শিল্প। তার মধ্যেই একটি হলো হাতপাখা। 


চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই এখন মাথার ওপর বনবন করে ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। আর একটু সময় এগোলেই দরজা জানলা বন্ধ করে এসির সুইচ টিপে স্বস্তির খোঁজ মিলছে ঘরে ঘরে। অথচ কিছুদিন আগে অবধিও আইঢাই গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে তালপাতার পাখার কোনও বিকল্প ছিল না। ছোটোরা ছড়া কাটত ‘তালের পাখা প্রাণের সখা, গরমকালে হয় যে দেখা’। গরমের দুপুরে বাড়ির দাওয়ায় মেয়েলি আড্ডা থেকে বাগানের আমমাচায় বয়স্কদের মজলিস কিংবা স্কুলের মাস্টারমশায়ের হাতে কিছু দিন আগেও তালপাখার বিচরণ ছিল অবাধ।

সাধারণত এই হাতপাখা তৈরি হয় দু-তিন খেপে। তালগাছের পাতা কেটে, জলে ডুবিয়ে জাঁক দিয়ে সেই পাতা সোজা করা হতো। তারপর সেই পাতা সাইজ করে কেটে, ভালো করে বেঁধে, রং করে বাজারে ছাড়া হতো। নিপুন শিল্পকলায় এগুলো তৈরি করতেন শিল্পীরা। ছোটো বড়ো বিভিন্ন মেলায় জমিয়ে কেনাবেচা চলত হাতপাখার। নিছক সাধারণ হলেও এর হাওয়া অতুলনীয়। 


সৌন্দর্যের কথা মাথায় রেখে এসবের পাশাপাশি তৈরী হয় বাহারী নকশী পাখা। এসব পাখার বিশেষত্ব হচ্ছে, রঙিন কাপড়ের ঝালর এবং সুতো দিয়ে বোনা হয় নানা ধরনের নকশা। এইসব নকশায় ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার লোকগাঁথা, জ্যামিতিক নকশা, গান এবং বিখ্যাত প্রবাদ-প্রবচন। ঠান্ডা হাওয়া দেওয়ার পাশাপাশি এগুলি দৃষ্টিনন্দন এবং রুচিশীল। আজকাল তালপাতার পাখার বদলে শৌখিন প্লাস্টিকের হাতপাখা দেখতে পাওয়া যায়, তবে তার হাওয়া তালপাতার পাখার কাছে একেবারেই মলিন।

যন্ত্র সভ্যতার ধাক্কায় প্রতিদিনই কমছে গাছপালার সংখ্যা। হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ। রবিঠাকুরের সেই ছড়ার তালগাছের আকাশে উঁকি মারার সময় ফুরিয়েছে। ইনভার্টারের যুগে তালপাতার পাখাও এখন অস্তিত্বের সংকটে। একসময়ে গরম পড়লেই যেখানে তালপাতার পাখার চাহিদা তুঙ্গে উঠত, আজ সেই চাহিদা কমেছে। পুজো কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান ব্যতীত একদিন হয়তো উচ্চবিত্ত পরিবারের ড্রইংরুমের দেওয়ালে কিংবা শোকেসে ক্রিস্টালের দামী শো-পিসের সঙ্গেই কেবল জায়গা মিলবে তালপাতার পাখা। আবার বলা যায় না, আগামী প্রজন্মকে তালপাতার পাখা চাক্ষুষ করতে হয়তো জাদুঘরে ছুটতেও হতে পারে।  

তথ্যসূত্র – 
১। “আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে গ্রিক-রোমানদের যুগে হাতপাখা প্রথম প্রচলন হয়…”, দেয়া দাস 
২। “তালপাতার পাখা হারিয়ে যেতে বসেছে”, dailyinqilab.com
৩। উইকিপিডিয়া

Developed by DXDasia