চৈত্র সেল হলো বাঙালি হুজুগের ভাঁটিখানা
বড়বাজারের রাস্তায় বাসটা কিছুতেই এগোচ্ছে না, রাগের মাথায় বাধ্য হয়েই নেমে পড়ে হাঁটা শুরু করতে হল। প্যাচপ্যাচে গরম, সারাদিনের কাজের ব্যস্ততা, তার মধ্যে এই অসহ্য যানজট – বিরক্তি না লেগে উপায় নেই। কিন্তু তাতে কি বা এসে যায়, ক্যালেন্ডার বলছে আর বেশি সময় নেই। নববর্ষ একেবারে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। এইবেলা তড়িঘড়ি বাজারটা সেরে না নিলেই নয়!
মাস পয়লা পড়ে গিয়েছে। বেতন হয়ে গিয়েছে অফিসের বাবুদের। আর মাইনে পকেটে আসতেই চৈত্র সেলের বাজার আরও জমজমাট।
বাংলা ক্যালেন্ডারের চৈত্র মাস সত্যিই বর্ণময়। একদিকে গাজন, চড়ক ইত্যাদি উৎসবের বাদ্যি, অন্যদিকে বাতাসে নতুন বছর আসার গন্ধ। ‘চৈত্র’ মাস এসে পড়েছে মানেই বাজার জুড়ে এখন শুধুই ‘সেল’। চৈত্র সেল হলো বাঙালি হুজুগের ভাঁটিখানা। অমুক ডিসকাউন্ট, তমুক ফ্রি’র চক্করে যে একটা তামাম জাতি কীভাবে বেসামাল হয়ে পড়তে পারে তা মালুম করতে হলে শহর কিংবা শহরতলির বাজারহাটে এ সময়ে সন্ধ্যেবেলা একটু ঢুঁ মারলেই চলবে।
ফুটপাত উপচে লোকের ঢল রাস্তায়, ট্রাফিক পুলিশ যেন বারোয়ারি পুজোর ভলেন্টিয়ারের মতো যানজট সামাল দিতে নাজেহাল। একে চৈত্রের প্যাচপ্যাচে গরম তার ওপর ভিড়ের ঠেলাঠেলি, গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো আবার নাক-মুখ চেপে রয়েছে নয়া অলঙ্কার ‘মাস্ক’ -সব মিলিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। যদিও বাঙালির তাতে বিন্দুমাত্র কিছুই যায় আসে না। ‘ছাড়’ শব্দটা দেখলেই তারা ভাবে এইবেলা বুঝি লাভের মুখ দেখে ফেলা সহজ হবে। আর অমনি ঝাঁপিয়ে পড়ে সারা বছরের যত ঝরতি-পড়তি জিনিসও চৈত্র-সেলের আছিলায় ব্যাগ বোঝাই করে নিতে পারলেই হল!

করোনার ভয় মোটামুটি ভুলতে বসেছে বাঙালি। তার ওপর মাস পয়লা পড়ে গিয়েছে। বেতন হয়ে গিয়েছে অফিসের বাবুদের। আর মাইনে পকেটে আসতেই চৈত্র সেলের বাজার আরও জমজমাট। গড়িয়াহাট বাজারে এক বিক্রেতা স্বপন সমাদ্দারের কথায়, “করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় আর নেই তাই রোজই ভালো ভিড় হচ্ছে বাজারে। পয়লা বৈশাখের আগে আর একটাই মাত্র শনি-রবি আছে, তাই ওই দুইদিন বেশি বিক্রি হবেই।”
শেষ কয়েকদিনের বাজার এখন সরগরম। গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজার হাঁকডাক শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধু শহর নয়, জেলা মফঃস্বলেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে পয়লা বৈশাখ তো রয়েইছে। সঙ্গে শুরু রমজান মাস। ইদের কেনাকাটাও এই সময়ই শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে। তাই সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিনের বাজার যে খুচরো ব্যাবসায়িদের মুখে হাসি ফোটাবে একথা বলতেই হচ্ছে। শহরতলির দোকানি বাবলু মণ্ডল জানান, “অনেকেই এই সময় কম দামে পুজোর কেনাকাটাও সেরে রাখছেন। তাই নতুন ডিজাইনের পোশাকের চাহিদা বাজারে এখন খুবই বেশি।”

করোনা (Coronavirus) আবহে ২০২০ থেকেই কেনাকাটায় মন ছিল না বাঙালির। ব্যবসা মন্দা থাকায় নতুন মাল তোলেননি দোকানদাররাও। গতবারের পুজোতে বাজারের হাল কিছুটা ফিরলেও পুরনো স্টক দিয়েই ক্রেতা টেনেছেন দোকানদাররা। কিন্তু এবার চৈত্র সেলে অনেক নতুন ডিজাইনের পোশাকই রয়েছে গড়িয়াহাট থেকে ধর্মতলা, নিউমার্কেট থেকে শ্যামবাজারের দোকানে। তার ওপর হুজুগে বাঙালির কাছে বাড়তি পাওনা ডিসকাউন্ট। কোনও দোকান দিচ্ছে কেনাকাটায় ছাড়, কোথাও আবার দু’টোর সঙ্গে একটা ফ্রি-র অফার রয়েছে। শপিংমলগুলোতও নানান নতুন অফারের ঝলক।

শুধু অফলাইন বাজারের কথা বলে গেলে অবশ্য বেজায় রাগ করতে পারেন আজকের আধুনিক বাঙালিরা। কাজের চাপে যারা বাজারে ঘোরার ফুরসৎ পাচ্ছেন না, তারা আবার মোবাইলের একটা ক্লিকেই পছন্দমতো কেনাকাটাটা সেরে নিচ্ছেন। তবে হ্যাঁ সেখানেও সেলের পারসেন্টেজ নজরে পড়ছে সবার আগে। নিত্যযাত্রী কাকলি মুখার্জী জানান, “রোজই অফিস থাকে, তাই এখন আর ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা হয় না। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে দেখেছি চৈত্র সেলে নিয়ম করে নতুন পোশাক কিনতেন মা, আমি এখন অনলাইনেই সেই প্রথা ধরে রাখার চেষ্টা করি।”

বুদ্ধিমান হিসেবিরা সারাবছরের কেনাকাটা, বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, জন্মদিনসহ হাজার রকমের অনুষ্ঠানের উপহার ঘরে মজুত করে তোলেন এই সময়েই। মোক্ষম সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়।
অতিমারীর প্রভাবে বহু মানুষের চাকরি চলে গিয়েছিল, অনেকের আবার মাইনে কমেছিল। ফলে পুজো বা নতুন বছরে নতুন জিনিস কেনাকাটা সাধারণ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের কাছে কিছুটা ছিল বিলাসিতা। তবে করোনার তৃতীয় ঢেউ কাটতেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কেনাকাটাতেও ঝোঁক বেড়েছে মানুষের। অনলাইন তো রয়েইছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষ ছুটছেন শপিং মল থেকে হকারপট্টি, সর্বত্রই। বড়বাজারের হোলসেলার গৌতম হালদারের কথায় “বাজারে এবার ডিমান্ড এসেছে নতুন পোশাকের। গত দু’বছর যে দোকানদার নতুন কোনও শার্ট তোলেননি, সেই দোকানদারই এবার চৈত্র সেলে দেড় হাজার পিস শার্ট তুলেছেন।”

পুজোর সময় জিনিসপত্রের দাম একেবারে ছ্যাঁকা খাওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। তাই বুদ্ধিমান হিসেবিরা সারাবছরের কেনাকাটা, বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, জন্মদিনসহ হাজার রকমের অনুষ্ঠানের উপহার ঘরে মজুত করে তোলেন এই সময়েই। মোক্ষম সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়। তাইতো পয়লা এপ্রিলে পা পড়তেই দোকানিদের হুংকার আর শপিং হপারদের ঢল নেমেছে গড়িয়াহাট, বড়বাজার, হাতিবাগান, শ্যামবাজারের মত বড়ো বড়ো মার্কেট চত্বরে। স্থানীয় বাজারগুলোও এইসময় রমরমিয়ে রাজ্যপাট চালাবে নববর্ষের দিন পর্যন্ত। দিনের বেলা গরম হাওয়া আর রোদের তাপে কেউ যে বাজার করতে আসবে না, তা ভালোমতোই জানেন পসারিরা। তাই সূর্যের আলো চোখরাঙানি কমাতেই যে যার নির্ধারিত জায়গায় আসন পেতে বসেন। রাত অবধি চলে যুগান্তরের বিকিকিনি। লোকে লোকারণ্য শহর, মফঃস্বল, গ্রাম গঞ্জের বাজারহাট ফিরে পায় ঈর্ষণীয় প্রাণ। একগাল হাসিতে গাল চওড়া হয় ক্রেতা-বিক্রেতা দুই তরফেরই। দিনের শেষে ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে ফিরতি পথে চলে টুকটাক ভুরিভোজ। মনে মনে একটাই প্রার্থনার রস দ্রবীভূত হয়। আসছে বছর আবার হবে।