উট্রাম সাহেবের মূর্তির অক্ষম অনুকরণ নাকি এটি
মূর্তি নিয়ে সেদিনও কম হইচই, বিতর্ক হয়নি কলকাতায়। সেদিন বলতে অর্ধশতাব্দী আগে। মূর্তিটা অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছিল না। আর হইচই, বিতর্কটাও কিন্তু মূর্তি ভাঙার পর হয়নি, হয়েছিল মূর্তি স্থাপনের পর। কথা হচ্ছে, শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের বিখ্যাত অশ্বারূঢ় মূর্তিটি নিয়ে। দেখতে দেখতে পঞ্চাশটি বছর বয়স হয়ে গেল এই মূর্তির।
বিতর্ক কেন? নেতাজির মূর্তি বসানো নিয়ে আপত্তি ছিল নাকি কারো? নাহ, এমন অবান্তর ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়াই অনুচিত। বিতর্কের কারণ ছিল মূর্তিটি অপছন্দ হওয়া। নেতাজি-মূর্তির আকৃতি ও কাঠামো নিয়ে বেশ অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল অনেকের মনে। আর মূর্তির আকৃতি এমনতর হওয়ার মূলে ছিল অন্য একটি মূর্তি। নেতাজির মূর্তি নয়, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল স্যার জেমস উট্রামের ঘোড়ায় চড়া মূর্তি। সেই মূর্তির অনুকরণেই গড়া হয়েছিল শ্যামবাজার মোড়ের বহু-আলোচ্য এই মূর্তিটি। তৎকালীন সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী অবশ্য ‘অক্ষম অনুকরণ’।
কলকাতায় নেতাজির প্রথম পূর্ণাবয়ব মূর্তিটি বসেছিল রাজভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। ১৯৬৫ সালে। আর, কলকাতা পৌরসংস্থার পক্ষ থেকে পনেরো ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতাবিশিষ্ট নেতাজির এই ব্রোঞ্জের মূর্তিটি স্থাপিত হল তার চার বছর পরে। কলকাতায় নেতাজির দ্বিতীয় পূর্ণাবয়ব মূর্তি এটিই। এবং হয়তো সবচাইতে আলোচিত এবং বিখ্যাত মূর্তিও। শ্যামবাজার মোড় আর এই মূর্তি অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠবে এরপর থেকে। ঘোড়ার ওপর সওয়ার নেতাজি। ডানদিকে ঘুরে তাঁর মুখ-সহ শরীরের অর্ধেক। হাতে ঘোড়ার রাশ। ঘোড়াও যেন গতিতে আছে। দেখলেই চোখ টানে। কিন্তু নানা কারণেই মূর্তির গড়ন তৎকালীন কলকাতাবাসীকে খুশি করতে পারেনি। কিন্তু, অসন্তোষের পাশাপাশি এই মূর্তিকে ঘিরে মানুষের উত্তেজনাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
শ্যামবাজারে নেতাজি-মূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। তখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র ত্রিগুণা সেন। অথচ মূর্তি তৈরি হতে লেগে গেল আরো এগারোটি বছর। মূর্তি গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হল মারাঠি ভাস্কর নাগেশ যবলকরকে। এরপর, নেতাজির ৭৩তম জন্মদিনে উদ্বোধন হল মূর্তির। সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও লিখিত ভাষণ পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। মূর্তি উদ্বোধনে নাকি লক্ষেরও বেশি মানুষের ভিড় হয়েছিল।
মূর্তি বসানোর আগে সমস্যা তৈরি হয়েছিল মাটির নিচে জলের পাইপলাইন নিয়ে। তার ওপরে মূর্তির চাপ পড়লে তো সর্বনাশ। এদিকে মোড়ের মাঝখান ছাড়া মূর্তি বসানোর জায়গাও নেই। রাস্তা খুঁড়ে পাইপলাইন সরানোও বিপুল হ্যাপা। অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক হল, পাইপলাইনের দু’পাশে দুটো কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করে তার ওপরে বিম দেওয়া হবে। এবং সেই বিমের ওপরেই বসানো হবে নেতাজি মূর্তি। এভাবেই ১৬ ফুট উঁচু বেদীর ওপর ঘোড়সওয়ার নেতাজির মূর্তি বসল। মুম্বইতেই তৈরি হল মূর্তি। তারপর তিনভাগে নিয়ে আসা হল কলকাতায়। নাগেশ যাবলকর নিজে এসে তত্ত্বাবধান করলেন মূর্তি স্থাপনের। সবমিলিয়ে খরচ পড়েছিল তৎকালীন দিনেও লক্ষাধিক টাকা।
মূর্তি-স্থাপনের আগে এবং পরে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়
এবং সেই মূর্তি দেখে অনেকেরই পছন্দ হল না। মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরেরদিনই ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় একটি লেখার শিরোনাম হল ‘বীরকে নিয়ে ব্যঙ্গ’। সেখানে বলা হল, ‘এ কেমন নেতাজী মূর্তি পৌরসভার? এ ওদের বীরের প্রতি ব্যঙ্গ।’ এই মূর্তিতে নাকি শৌর্যবীর্যময় নেতাজির আসল মূর্তিকে অপমান করা হয়েছে। এই শোরগোল, প্রতিবাদের মধ্যেই কলকাতাবাসী জানতে পারলেন, এই মূর্তি ময়দানের জেমস উট্রামের মূর্তির আদলে গড়া। নেতাজি মূর্তি গড়ার জন্য ১৬ জন কাউন্সিলরের একটি বিশেষ কমিটি তৈরি হয়েছিল। তাঁরা নাকি নানা অ্যাংগেল থেকে ঘোড়াসমেত উট্রামের মূর্তির ছবি তুলে মুম্বইতে গিয়ে দিয়ে এসেছিলেন ভাস্কর নাগেশ যবলকরকে। সেই ছবি দেখেই মূর্তি গড়লেন নাগেশ। জন হেনরি ফলির গড়া সেই মূর্তিতেও উট্রাম ডানদিকে ঘুরে বসেছেন ঘোড়ার পিঠে চেপে। ডানহাতটি ঘোড়ার পিঠে রেখে ভারসাম্য রেখেছেন। সেই হাতে একটি ধারালো তরবারিও রয়েছে। মুখটা অবশ্য সামান্য পিছনে ঘোরানো, যেন চলন্ত ঘোড়া থেকেই পিছনে তাকাচ্ছেন সশস্ত্র উট্রাম। আদ্যন্ত কালো মূর্তিটি থেকে ব্রিটিশসুলভ আভিজাত্য যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
উট্রামের সেই মূর্তি এবং নেতাজির মূর্তি
এই মূর্তি দেখে লোভ হওয়াই স্বাভাবিক। প্রায় একই আকারের ঘোড়ার পিঠে উট্রামের বদলে নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে কল্পনা করেছিলেন মূর্তির পরিকল্পনাকারীরা। নাগেশ যবলকর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু দুটি মূর্তির তুলনা করলে বলতেই হয়, সেই চেষ্টায় তিনি পুরোটা সফল হননি। ঘোড়া কিংবা নেতাজি সুভাষ—কোনোটারই গড়ন উট্রামের মূর্তিকে টেক্কা দেওয়ার মতো হয়নি। যেহেতু উট্রামের মূর্তি আগেই দেখে ফেলেছিলেন শহরবাসী, ফলে এই পার্থক্যটা চোখে ধরাও পড়ল বড়ো বেশি করে।
এই অপছন্দ-প্রতিবাদ সত্ত্বেও নেতাজির এই মূর্তি ক্রমে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠল। বিধান সরণী, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড, বিটি রোডের দিকে বয়ে যাওয়া বিধান সরণীর রেশ, আরজি কর রোড কিংবা ভূপেন বসু এভিনিউ—যেদিক দিয়েই আসা যাক, এই মূর্তিতে চোখ আটকাবেই। স্কুলবয়সে দেদার চর্চার বিষয় হয়ে উঠবে নেতাজির মুখ কোনদিকে কেন ঘোরানো, তাই নিয়ে। এবং, বিভ্রমের মতো বারবার অনেকে কল্পনা করবে এই মূর্তিতেও নেতাজি আঙুল তুলে দিক নির্দেশ করছেন। যেমনটা আমরা দেখেছি নেতাজির অনেক প্রচলিত আঁকা ছবিতে। যেন আঙুল উঁচিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন ‘দিল্লি চলো’। কিন্তু, আদতে তো সুভাষচন্দ্রের ডানহাত ঘোড়ার পিঠেই রাখা এই মূর্তিতে। তাহলে কি আমরাই বারবার চাই নেতাজি দিকনির্দেশ করুন? তৎকালীন শহরবাসীও কি সেটাই চেয়েছিলেন এই মূর্তি থেকে?
সেই চাওয়া-পাওয়া-না পাওয়া-অভিমান আর মুগ্ধতার জাল কাটিয়ে কাটিয়েই সময় ছুট লাগায়। কিন্তু শ্যামবাজারের মোড়ে নেতাজির মূর্তি ছুটেও ছোটে না। পঞ্চাশটি বছর! কম নয়। চলন্ত ঘোড়ায় স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে নেতাজি। শহরের অন্যতম আইকন। যত খুঁতই থাক, এই মূর্তিরও যে নিজস্ব একটা আভিজাত্য আছে তা অস্বীকার করা যাবে না কিছুতেই।
ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী
https://creativecommons.org/licenses/by-sa/4.0/deed.en
https://creativecommons.org/licenses/by/3.0/deed.en