চাপান-উতোর-খেউড় আর গায়ক-দোহার-গোঁড়াদের বিচিত্র ইতিহাস
‘সহরে ঢি ঢি হয়ে গ্যাছে, আজ রাত্তিরে অমুক জায়গায় বারোইয়ারি পূজোয় হাফ আকড়াই হবে। কি ইয়ারগোচের স্কুল বয়, কি বাহাত্তুরে ইনভেলিড, সকলেই হাফ আখড়াই শুনতে পাগল! বাজার গরমহয়ে উঠলো। ধোপারা বিলক্ষণ রোজগার কত্তে লাগলো! কোঁচান ধুতি, ধোপদস্ত কামিজ ও ডুরে শান্তিপুরে উড়ুনীর এক রাত্তিরের ভাড়া আট আনা চড়ে উঠলো!’
(হুতোম প্যাঁচার নক্শা, মূল বানান অপরিবর্তিত)
উনিশ শতকের কলকাতা। কোনো এক বারোয়ারি পুজোয় হাফ আখড়াই হবে শুনে লোকে-লোকারণ্য। যাকে বলে, গণ হিস্টিরিয়ার জন্ম হয়েছে। লোকে ধুতি, কামিজ, শান্তিপুরি উড়ুনি ভাড়া করছে শুধু ভদ্দরলোক সেজে গান শুনতে যাবে বলে। আর হুতোম নিজের অতুলনীয় ভঙ্গীতে চুটয়ে বর্ণনা দিয়েছেন সেই উন্মাদনার।
গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং রাত্তির দুটো বাজল। ধোপাপাড়ার দল আর চকের দলের মধ্যে গানের লড়াই। দুই দলই ভরপুর নেশায় ভোঁ হয়ে টলতে টলতে আসরে নামল। দেড় ঘণ্টা ধরে ঢোল, বেহালা, বাঁশি (হুতোম লিখেছেন ‘ফুলুট’), মোচঙ্গ ও সেতারে ঐকতান বাজল। তারপর একটা ঠাকুরণ বিষয়ক গান এবং খানিক বিরতি। সেইসময়ে চুরুট, তামাক ও চরসের ধোঁয়ায় টেকা দায়। ধোপাপুকুরের দল (ধোপাপাড়ার দল) বিরহের গান ধরল, তার ‘উতোর’ দিল চকবাজারের দল। তারপর, কাঁচা খেউড়। এই খেউড় দিয়েই হার-জিত ঠিক হবে। মারামারিও হতে পারে। সে যাহোক, খেউড় চলল। দুই দলেরই গোঁড়া সমর্থক আছে বেশকিছু। তারা চেঁচামেচি জুড়ল। শেষে তালেগোলে জিতে গেল চকবাজারের দল। তারপর, ঢোল বেঁধে, নিশান কাঁধে তারা গাইতে গাইতে ঘরে ফিরল। তাদের তখন উদভ্রান্ত অবস্থা। কারো মোজা আছে, জুতো নেই, কেউ বা খালি পায়ে। এইভাবে বেলা দশটা নাগাদ আসর সাঙ্গ হল।
হুজ্জুতে ব্যাপার বটে! সেই কলকাতায় টিভি সিরিয়াল ছিল না, নেটফ্লিক্স ছিল না, মোড়ে মোড়ে সিনেমা হল ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল যাত্রা, হাফ আখড়াই নিয়ে মাদকতা। থিয়েটার ব্যাপারটা তখনও সর্বসাধারণের তরে সহজলোভ্য হয়নি। কলকাতাও একদিকে বিলিতি ধাঁচা আর অন্যদিকে গ্রাম টান—দুইদিক ব্যালেন্স করেই বড়ো হচ্ছে। সেই শহরে হাফ আখড়াই মানে এক সীমাহীন হইচই, আমোদ।
হাফ আখড়াই মানে নিশ্চয়ই ফুল আখড়াই বলেও কিছু আছে! ফুল আখড়াই আসলে ‘আখড়াই’ গান। পরিবর্তিত রূপটি হাফ আখড়াই নামে চালু হওয়ার পর সেও নাম বদলে ফুল আখড়াই হয়ে গেল। এই গানের জন্ম ঠিক কবে? হুতোম লিখছেন যখন ‘নবাবী আমল শীতকালের সূর্য্যের মত অস্ত গ্যালো। মেঘান্তের রৌদ্রের মত ইংরেজদের প্রতাপ বেড়ে উঠ্লো। বড় বড় বাঁশঝাড় সমূলে উচ্ছন্ন হলো। কঞ্চিতে বংশলোন জন্মাতে লাগলো। নবো মুনসী, ছিরে বেণে ও পুঁটে তেলি রাজা হলো। সেপাই পাহারা, আসা সোটা ও রাজা খেতাপ ইন্ডিয়া রবরের জুতো ও শান্তিপুরের ডুরে উড়ুনির মত রাস্তায়, পাদাড়ে ও ভাগাড়ে গড়াগড়ি যেতে লাগলো’ তেমনি ঘোর দুঃসময়ে নাকি আখড়াই, হাফ আখড়াই গান জন্ম নিল। কিন্তু, এই ইতিহাসে আখড়াই আর হাফ আখড়াই মিলে-মিশে একাকার। অথচ, এই দুইয়ের জন্ম একসঙ্গে নয়।
ঈশ্বর গুপ্ত লিখছেন, শান্তিপুরের ভদ্রসন্তানেরা আখড়াই গানের সৃষ্টি করেন কমপক্ষে ১৫০ বছর আগে। দেড়শো বছর মানে সতেরো শতকের শেষ। অন্যান্য পণ্ডিতদেরও মোদ্দায় এটাই মত। সতেরো শতকের শেষদিকে বৈষ্ণব আখড়ায় জন্ম বলেই নাম ‘আখড়াই’। প্রথমদিকে এই গান ছিল রাধা-কৃষ্ণ লীলাবিষয়ক। পরে ভবানী বিষয় যুক্ত হল। প্রাথমিকভাবে এর দুটি ‘তুক’—খেউড় আর প্রভাতী। সামান্য বাদ্যযন্ত্র, সুর টপ্পার অনুসারী। খেউড়ে গানের কথা ও বিষয়– দুইতেই আদিরস ভুরভুর করছে। পরে, অবশ্য গানের কথা খানিক রুচিসম্মত হয়। এই গানে চাপান-উতোর অর্থাৎ উত্তর-প্রত্যুত্তর ছিল না। ভালো গান যে দল গাইত, বিজয়ী হত তারাই। ঈশ্বর গুপ্ত নিজেও নাকি আখড়াই গান লিখতেন। “অপার মহিমা তব শুনি পুরাণে।/ যার চিন্তামণি-চিন্তা অন্তরে,/ তার কি চিন্তা মরণে?”—তারইএকটি দৃষ্টান্ত।
আখড়াই গানের বিপুল সংস্কার করেছিলেন রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুবাবু। শখের আখড়াও গড়েছিলেন তিনি। গান শেখাতেনও লোকজনকে। তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছিলেন মামা কুলুইচন্দ্র সেন। এরপর, নিধুবাবুর দেখানো পথে অনুপ্রাণিত হয়েই কলকাতার একাধিক সভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেয় শখের আখড়াই গানের দল। পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবার, শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষ, জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার, গরানহাটার কৃষ্ণমোহন বসাক—তাবড় তাবড় সব পরিবারের নাম সেই তালিকায়। রাজা নবকৃষ্ণ দেব, রাজা গোপীমোহন ঠাকুরের মতো মানুষরা ছিলেন এই গানের পৃষ্ঠপোষক।
এরপর, প্রায় আকস্মিকভাবেই জন্ম নিল হাফ আখড়াই। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে। সৃষ্টিকর্তা নিধুবাবুর শিষ্য মোহনচাঁদ বসু। আকস্মিক বলার কারণ, কোনো দীর্ঘকালীন সাধনা বা পরিকল্পনা এর পিছনে ছিল না। একবার মোহনচাঁদের গানের দল বাগবাজারের সঙ্গে কবিযুদ্ধ হয় জোড়াসাঁকোর সখের দাঁড়া কবিদের। সেই যুদ্ধে যদিও মোহনচাঁদ উপস্থিত ছিলেন না, তবুও বাগবাজারের জয় হল। আর সেই জয়ের দম্ভে বাগবাজারের একজন গর্ব করে প্রতিশ্রুতি দিলেন পরেরবার এক্কেবারে নতুন গান শোনাবেন। ব্যাস, এই প্রতিশ্রুতিই হল বিপদ। মোহনচাঁদ সব শুনে নতুন গান ভাবতে বসলেন। অনেক ভেবে ঠিক করলেন আখড়াই গানকে ভেঙে নতুন ধরনের গান হবে। আখড়াইয়ের মতো রাগরাগিণী নির্ভর হলেও তাতে ওস্তাদি জটিলতা থাকবে না। দাঁড়া কবির থেকে উন্নত হবে সেই গান অথচ কবিগানের মতো উত্তর-প্রত্যুত্তর থাকবে। দোহার থাকবে। এইভাবেই জন্ম নিল হাফ আখড়াই।
হাফ আখড়াইতেও খেউড় রইল, তার আগে ভবানী বিষয় এবং রাধাকৃষ্ণ প্রেমবিষয়ক গানও রইল। প্রতিটি ভাগের তিনটি করে বিভাগ—‘চিতেন’, ‘মহড়া’ ও ‘অন্তরা’। খেউড়ের আদিরস ও অশ্লীলতা (যদি অশ্লীলতা বলে মনে করেন তবেই) বজায় থাকল ষোলো আনা। ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা বাগবাজার আর জোড়াসাঁকোর সেই বিখ্যাত হাফ আখড়াই গানের লড়াইয়ের খবর ছেপেছিল। সেখানে বাগবাজার খেউড়ের মহড়ায় গাইল—
‘কেন ওরে প্রাণ, প্রাণরে হয়েছে এমন/ কি ভাবেতে ঢল ঢল, কি রসেতে টলটল, তায়, খল খল হাস কি আভাষ…’
‘উতোর’-এ জোড়াসাঁকোর দল গাইল—‘মাগ বলে আমায়, একি দায়, সুপাদ গোছালে।/ মস্তরাম বাবাজী হয়ে, আমার চাও কর্ত্তে বিয়ে, তোমার সোহাগিনী বোন্ ফেলে।।’
কেউ শুনে কানে আঙুল দেন, কেউ বা হেসে গড়াগড়ি যান। ধুয়ো ওঠে শ্রোতাদের মধ্যে থেকে। নেশার ঘোর ততক্ষণে ভালোই জমেছে। কেউ কেউ অতি উৎসাহে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করে দেন। রাত বাড়লে এইসব আমোদ আরো বাড়ে। কলকাতার রাতগুলো এভাবেই হাফ আখড়াই-তে বুঁদ হতে শুরু করে ক্রমশ। তার এমনই নেশা যে হাফের চক্করে ফুল আখড়াই ক্রমে লুপ্তই হয়ে যায়।
সেই কলকাতা আর নেই। দাঁড়া কবি, হাফ আখড়াই, টপ্পা, খেমটা, বাইজি-গানের রং-বাহারি দিনও আর নেই। সাহেব-শাসিত কলকাতা আরো ‘সভ্য’ হল। বদলে গেল তার জনরুচির চরিত্রও। তবু, সেইসব দিনের অশরীরী গন্ধরা আজো ভেসে বেড়ায় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। বাইরে বাবুদের গাড়ির ভিড়। ভিতরে ধোঁয়ার উৎকট গন্ধ। গায়ক গান ধরেছেন, দোহার সঙ্গ দিচ্ছে বেজায়। গোঁড়া শ্রোতাগণ আড়াআড়ি দুইভাগে বিভক্ত। উচ্চাঙ্গের রাগরাগিণী, লঘু খেউড় মিলে-মিশে সে এক ভজঘট অবস্থা।
কলকাতাকে চিনতে হলে এইসব ইতিহাসদেরও চিনতে হবে যে।