ভারতপ্রেমী এক পাদ্রি সাহেবের গির্জা

জেমস লঙের এই গির্জায় এসে মুগ্ধ হয়েছিলেন রামকৃষ্ণদেবও

জেমস লং সাহেবকে মনে আছে? সেই যে আশ্চর্য পাদ্রি, সাহেব হয়েও যিনি সাহেবদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। এদেশের গরিব-গুর্বো মানুষদের কথা ভেবেছিলেন, বাংলাভাষা নিয়ে চর্চা, বই লেখা– সব করেছিলেন ভালোবেসে। তাতে অবশ্য জরিমানার উপহারও ছিল। ছিল হাজতবাসও। দায় ছিল না তাঁর কোনো এসিসব করার। তবু করেছিলেন। আর তাই, এই লং সাহেবকে ঘিরে একসময় রীতিমতো জনমত তৈরি হয়েছিল। তাঁর হাজতবাসের বিরোধিতায় কত স্বাক্ষর সংগ্রহ হয়েছিল। এ হল সে যুগের কথা, যখন শ’য়ে শ’য়ে পাদ্রি কলকাতায় এলে মাতাল লম্পট এমনকি জুয়ারিও হয়ে যেত। 

সে যাই হোক, লং সাহেবের কিসসাও এখন লোকে প্রায় ভুলেই গেছে। একটি রাস্তার নামে যদিও আজও লংসাহেব বেঁচে। কিন্তু ব্যক্তিকে ঘিরে থাকা স্মৃতিটি মৃতপায়। 

শুধু রাস্তা নয়, একটি গির্জাতে আজও রয়ে গেছে লং সাহেবের নাম। গির্জাটির অবস্থানটি বড়ো চমৎকার জায়গায়, আমহার্স্ট স্ট্রিটে। এম.জি রোড ছেড়ে আমহার্স্টস্ট্রিট ধরে সোজা খানিক গেলেই  বাঁহাতে পড়বে সাদা দেওয়ালের এই চার্চ। মাড়োয়ারি হাসপাতালের বিপরীতেই। হোলি ট্রিনিটি চার্চ। দরজার ওপর গ্রিলে খোদাই করা নাম। শ্বেতশুভ্র এই গির্জাটির জাঁক নেই তেমন। কিন্তু, এক কোমল আভিজাত্য আছে তার গোটা শরীরে।   

যেদিন গির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, চোখে পড়ল চার্চের চূড়ার ঠিক নিচে একটি বিশাল ঘণ্টা। আর তার ওপর দিয়ে নীল আকাশ। তবে, প্রার্থনাকক্ষের দুয়ার বন্ধ। শুধু সেদিন বলে নয়। এর আগে যতবার সেই রাস্তায় হানা দিয়েছি, গির্জার দরজা বন্ধই চোখে পড়েছে। চার্চটি নির্মাণ করেছিলেন ভেনবল আর্চ ডিকন কোরি। তিনি ছিলেন মাদ্রাজের বিশপ। ১৮০৬ সালে ভারতে আসেন তিনি। 

এই আমহার্স্ট স্ট্রিটের নাম তখন মির্জাপুর। নবাবি চিহ্নসকল তখনও রয়ে গেছে। অঞ্চলটি ছিল নিবিড় জঙ্গলে ঠাসা। আর ওই অঞ্চলেই নাকি ছিল একটি ট্যানারি। যার দরুণ দুর্গন্ধে ভরে উঠত চারদিক। ১৮২০ সালে কোনো এক সৃষ্টিছাড়া উলটো বুদ্ধিতে চার্চ মিশনারি সোসাইটির সেক্রেটারি মিস্টার প্র্যাাট ২০, ৪০০ টাকায় কিনে নেন ট্যানারি সংলগ্ন সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চল। জঙ্গল কাটা হয় তার জন্যে খানিক। ১৮২৩ সালে সেখানে একটি রাস্তা তৈরি হয়। অনুমান, সেটাই বর্তমানের এই ‘স্ট্রিট’। 

আজকের দিনে  আমহার্স্ট স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে ঘন বনের কথা ভাবাই যায় না। সে যাই হোক। ১৮২৬ সালে আর্চডিকন কোরি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন চার্চটির। প্রার্থনাগৃহ নির্মাণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন রেভারেন্ড ডিয়ার। এই চার্চটি গোটা কলকাতার একমাত্র চার্চ, যেখানে সমস্ত প্রার্থনা, গ্রন্থপাঠ– সবই হয় বাংলায়। চ্যাপেলের মতো দেখতে এই চার্চটিকে আগে বলা হত– সিএমএস চ্যাপেল। তারপর নাম বদলে হয়ে যায়– কোরি চার্চ। তখন রাস্তাটির নামও ছিল কোরির নামে। পরে এই চার্চটির সঙ্গে জুড়ে যান জেমস লং সাহেব। সুদীর্ঘকাল এই চার্চে ছিলেন তিনি। কাছেই সেন্ট পলস কলেজ। সেখানেও জুড়ে ছিলেন জেমস লং। এই চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতেই জেমসের লঙের বিরুদ্ধে মামলা উঠেছিল হাইকোর্টে। দীনবন্ধুর ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদের কারণে। মিস্টার ম্যানুয়েল ছিলেন সে নাটকের প্রকাশক। তাকেই খাড়া করা হয় প্রথমে কাঠগড়ায়। তারপর এই অনুবাদের সমস্ত দায়ভার গ্রহণ করেন জেমস লং। সাজা হয় ১০০০ টাকা জরিমানা। নাহলে কারাবাস। সেই ১০০০ টাকা দিয়ে তাঁকে কারামুক্ত করেছিলেন স্বয়ং কালীপ্রসন্ন সিংহ। রটেছিল, অনুবাদকের নাম নাকি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। জেমস লং কিন্তু কোনোদিনই প্রকাশ করেননি অনুবাদকের নাম। তাই মধুসূদন নাটকটি আদৌ অনুবাদ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা চিরকালই থেকে যাবে। 

তবে, এইসব ধোঁয়াশা আবছা ইতিহাসের মাঝে আমাদের পাওনা এই গির্জাটি। সেই টালমাটাল পরিস্থিতিকে আজও যেন জাগিয়ে রাখতে পারে যে। সেদিনের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সে দেবে না। তবু যেন সব জানে সে।

এই গির্জাতেই একবার এসেছিলেন রামকৃষ্ণদেব। সঙ্গী ছিলেন মথুরা মোহন বিশ্বাস। গির্জাটির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রামকৃষ্ণদেব– এমনটাই শোনা যায়। এসবই পুরোনো-কুড়োনো কথা। তবু গির্জাটি এখনো আছে- এইসব ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। এটাই যা বাঁচোয়া।

Post Tags
Developed by DXDasia