গ্রিক মন্দিরের মতো দেখতে বাড়িটি আজ প্রায় পরিচিতিহীন
ঠিকানা খুঁজছিলাম একটা। নতুন শহরে একটি পুরোনো ঠিকানা খুঁজে পেতে চাইছিলাম। ৫৫ বি অভেদানন্দ রোড। হেদুয়ার কাছেই, বিশাল একটা বাড়ি। এইটুকু তথ্য ছাড়া হাতে কিছুই ছিল না। যাওয়ার আগে জানতামও না, বাড়িটি আছে কিনা। আর প্রত্নতত্ত্বের অধিকারও তো আমার নেই। তবে অভেদানন্দ রোডে পৌঁছে মনে হল খুঁজে পেয়েছি। কাশীপ্রসাদ ঘোষের বিখ্যাত বসতবাড়ি। কে এই কাশীপ্রসাদ ঘোষ? সে অবশ্য একটা গপ্প।
“আঁখির মিলনে প্রাণ কেবল যাতনা
মনের অনল তাতে শীতল হয় না।
হেরিলে বিধুবদন, বাড়ে আর আকিঞ্চন
প্রবোধ মানে না মন, পুরে না বাসনা।”
টপ্পাধর্মী একটি গান। এমন প্রায় শ-তিনেক গান লিখেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ।। সেখানে আদিরসাত্মক পরকীয়া প্রেমের প্রাধান্য ছিল। আর, বাংলা গানের পাশাপাশি ছিল ইংরেজি কাব্যচর্চা। ছিল পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব। এছাড়া অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট, সুপ্রিম কোর্টের গ্র্যান্ড জুরি, মিউনিসিপ্যালিটির জাসটিস অব পিসের দায়িত্বও সামলাতে হত তাঁকে। এতগুলো ভূমিকা তো কম নয়। অনায়াসে তাঁকে মধুসূদন দত্ত বা হরিশ্চন্দ্রদের পূর্বসুরী বলা যায়। অথচ কলকাতার স্মৃতি খুঁড়লেও বোধহয় কাশীপ্রসাদ ঘোষের নাম মেলে না। নিদেনপক্ষে একটা রাস্তার নাম? কলকাতা নিয়ে বইপত্তরও তো কম নেই। সেখানেও বড়ো ক্ষীণ উপস্থিতি তাঁর। কিন্তু উনিশ শতকের কলকাতার ইতিহাস থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া, ইতিহাসের প্রতি অবিচার তো বটেই।
কাশীপ্রসাদ ঘোষ জন্মেছিলেন ১৮০৯ সালের ৫ অগাস্ট। রামনারায়ণ বসু সর্বাধিকারী ছিলেন তাঁর মাতামহ। তাঁর খিদিরপুরের বাড়িতেই জন্ম থেকে কৈশোর অতিবাহিত হয়েছিল কাশীপ্রসাদের। এখানে বলে রাখি, সেই বাড়িতেই যশোর থেকে এসে কৈশোরবেলা কাটিয়েছিলেন মধুসূদন দত্তও। কাশীপ্রসাদ অবশ্য ততদিনে চলে এসেছেন হেদুয়ায়। হিন্দু কলেজের প্রথম যুগের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৮২১ সালে তিনি ভর্তি হন। সে সময় নাকি তাঁর অক্ষরজ্ঞানও ছিল না। অথচ কিছু বছরের মধ্যেই তাঁর মেধা হিন্দু কলেজের বিখ্যাত শিক্ষক ডি এল রিচার্ডসন থেকে শুরু করে ডেভিড হেয়ার, অধ্যাপক উইলসনদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
খিদিরপুরে কাশীপ্রসাদ এবং মধুসূদনের বাড়ির সাম্প্রতিক হাল
যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭, মিলের History of British India-এর সমালোচনা লিখেছিলেন পরীক্ষার খাতায়। তাঁর অংশবিশেষ নাকি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮২৮-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি গেজেটে। পরে সেটি মুদ্রিত হয় এশিয়াটিক জার্নালেও। একজন সতেরো বছরের ছেলের কলমের জোর ছিল এমনই! ততদিনে ডিরোজিও যুক্ত হয়ে গেছেন হিন্দু কলেজের সঙ্গে। কবি হিসেবেও কাশীপ্রসাদের নাম চিরকাল উচ্চারিত হয়েছে ডিরোজিওর পাশাপাশি। মধুসূদনের আগেই ইংরেজিতে কাব্যচর্চার পথ প্রশস্ত করছেন তিনি।
সাহেবি কেতাদুরস্ত মানুষ ছিলেন কাশীপ্রসাদ। ইংরেজি ভাষায় চোস্ত তো বটেই। কলেজ পাশ করার পরে মেতে থাকলেন সাহিত্য রচনায়। The Shair and other poems, The Hindu Festivals, Memory of Indian Dynastics, On Bengalee Poetry, On Bengalee works and writers– এসব তারই দৃষ্টান্ত।
বইগুলোর নাম থেকেই স্পষ্ট, নিছক সাহিত্য নয় বাংলার সাহিত্যর একটা নথীভুক্তিকরণও ঘটছে তাঁর হাতে। নিধুবাবু, ভারতচন্দ্রের আলোচনা রয়েছে তাঁর লেখায়। জায়গা পেয়েছে বিদ্যাসুন্দরের অনুবাদ। বাংলার বিভিন্ন লৌকিক উৎসবকেও আমরা খুঁজে পাই তাঁর বইতে। চেষ্টা করেছেন ভারতবর্ষের ইতিহাস খুঁজে দেখতেও। গোয়ালিয়র, ইন্দোর, লক্ষ্ণৌ-এর রাজাদের কথা লিখছেন। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজের একটা বড়ো ছবি মিলে যেতে পারে কাসীপ্রসাদের হাত ধরেই। তাতে দৃষ্টিভঙ্গিগত অমিল যদি থাকেও, তবু উনিশ শতকে দাঁড়িয়ে ইতিহাস রচনার এই বিশাল কাজের জন্য তার গুরুত্ব কমে না।
তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি কৃতিত্ব ১৮৪৫-৪৬ সাল নাগাদ The Hindu Intelligencer নামে সাপ্তাহিক প্রকাশ। এখানেই হাতেখড়ি হরিশচন্দ্র মুখার্জির। ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’-এ শিবনাথ শাস্ত্রী বলছেন, “হরিশ একদিকে যেমন পড়িতেন, অপরদিকে তৎকালে প্রচলিত ইংরাজী সাময়িকপত্রে মধ্যে মধ্যে লিখিতেন। ষে সময়ে হিন্দু কালেজের পূর্ব্বতন ছাত্র কাশীপ্রসাদ ঘোষ Hindu Intelligencer নামে এক ইংরাজী কাগজ সম্পাদন করিতেন, তাহাতে হরিশের লিখিত প্রবন্ধাদি সর্ব্বদা বাহির হইত। এই লেখার জন্য শিক্ষিত দলে তিনি সুপরিচিত হইয়া পড়িলেন।”
১৮৪০ সালে রিচার্ডসন ইংরেজি সাহিত্যের একটি সংকলন Selections from the British Poets প্রকাশ করেন। মেকলে সাহেবের অনুরোধে এ-কাজ তিনি করেছিলেন। সেখানে চসার, টেনিসন থেকে শুরু করে ডিরোজিওর পাশাপাশি ছিল ‘নেটিভ’ কাশীপ্রসাদ ঘোষের লেখাও। মধুসূদন এই বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন তো বটেই। গৌরদাস বসাককে লেখা একটি চিঠিতে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, এই বইয়ের ভূমিকা না-লেখার জন্যে।
গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন, এই বই নাকি মধুসূদনকে আরো বেশি করে ইংরেজি সাহিত্য রচনায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। কাশীপ্রসাদের লেখা Boatmen’s song to Ganga নাকি ইংরেজদেরও তাক লাগিয়ে দিত। অবশ্য মধুসূদনের কাব্য উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পায়নি কাশীপ্রসাদের পত্রিকায়। কিন্তু, তাঁকে এড়াতে পারেননি মধুসূদন।
কাশীপ্রসাদ পরবর্তীকালে বাড়ি করেন হেদুয়ায়। ৫৫বি অভেদানন্দ রোডে। মিনি গ্রিক টেম্পলের মতো নাকি ছিল তার নকশা। জমি থেকে অসংখ্য সিঁড়ি পার হয়ে অন্দরে প্রবেশ করতে হত। সে বাড়িতে সস্ত্রীক লর্ড বেন্টিঙ্ক, অকল্যান্ড, এলগিন, মেটকাফের আনাগোনা ছিল। আর ছিল দেবেন্দ্রনাথ, গিরিশ ঘোষ, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথেরও যাতায়াত। কাশীপ্রসাদ ঘোষকে ভোলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেই বাড়িটিও চলে গেছে বিস্মৃতির অতলে। একে পরিহাস বললেও কম বলা হয় আরকি!
তবে হেদুয়াতে গিয়ে এই ৫৫বি ঠিকানাটা লেখা দেখলাম একটা স্টেশনারি দোকানের নেমপ্লেটে। পাশাপাশি আরো বেশ কিছু খাবার দোকান। আর যে বাড়ির আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা, তার বর্তমান নাম সেবক হল। অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া হয়। দেখতে মিনি গ্রিক টেম্পলের মতো বৈকি। শুনলাম, এটাই সেই বাড়ি। হলটি দেখলাম মেরামত হচ্ছে। আর পিছনদিকে বাড়িটির বিশাল অংশ ভাঙাচোরা। ‘হল’ হয়ে অন্তত টিকে আছে বাড়িটি। যদিও, কাশীপ্রসাদের স্মৃতি প্রায় ভুলতেই বসেছেন স্থানীয়রা।
এই অসুখ তো বাঙালির চিরকালের।
তথ্যসূত্রঃ আশার ছলনে ভুলি, গোলাম মুরশিদ; বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি, দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়; রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী।