দক্ষিণারঞ্জন আর এমিলিয়ের বিয়ের রটনা কাঁপিয়ে দিল হিন্দুসমাজকে
‘যা রটে তার কিছু তো বটে।’ আর, এই ‘কিছু’ থেকেই লেগে গেল দাবানল।
উনিশ শতকের তৃতীয় দশকের গোড়া। কলকাতা জুড়ে রীতিমতো হুলুস্থুলু পড়ে গেল। জগন্মোহন মুখার্জীর ছেলে দক্ষিণারঞ্জন নাকি খ্রিস্টান হতে চলেছে। আর, এহেন মতিভ্রমের মূলে আছে এক মেম। এমিলিয়া। দক্ষিণারঞ্জনের ঘরে বিবাহিত স্ত্রী রয়েছে। তারপরেও ওই মেমের প্রেমে এমনই হাবুডুবু দক্ষিণারঞ্জন যে পরিবার-ধর্ম-মান-সম্মান-স্ত্রী সবকিছু জলাঞ্জলি দিতেও সে প্রস্তুত।
দক্ষিণারঞ্জন হিন্দু কলেজের ছাত্র। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বের করেন ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা। এই পত্রিকার অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ইংরেজি। শিক্ষিত হিন্দু ছাত্রদের মধ্যে সেটা বিনা পয়সায় বিলিও করা হয়। কলকাতায় হিন্দুসমাজের মাথা, সজ্জন, গুণীজনেরা দিব্বি বোঝেন— ‘জ্ঞানান্বেষণ’ না ছাই, এই পত্রিকার আসল উদ্দেশ্য হিন্দুধর্মকে নিন্দে-মন্দ করা। দক্ষিণারঞ্জনের মতিগতি যে মোটেও সুবিধের নয়, তাও বুঝতে পারছিলেন সবাই। কিন্তু, ছোকরার তলে তলে যে এত—সেটা ভাবা যায়নি।
যাহোক, এই খবরকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণই খুঁজে পায়নি কলকাতার লোকজন। কারণ, একে দক্ষিণারঞ্জনের কাজকম্ম নিয়ে সন্দেহ ছিলই। তার ওপর ওই এমিলিয়া আবার ডিরোজিওর বোন। হিন্দু কলেজের ওই খ্রিস্টান মাস্টার মাথা খেয়েছে অনেক ছাত্ররই। কিন্তু, এবারে ব্যাটা সহ্যের সব সীমা পেরিয়ে গেছে। শেষে নিজের বোনকেই ভিড়িয়ে দিল একজন ধনী, বামুন-সন্তানের ঘাড়ে! ছি ছি ছি। নিন্দে আর থামতেই চায় না।
এই রটনার মূলে একজন দরিদ্র, আপাত নিরীহ বামুন। নাম—বৃন্দাবন ঘোষাল। ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজে’ শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁকে নিয়ে লিখেছেন—“ তখন সহরে বৃন্দাবন ঘোষাল নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছিল। সে ব্রাহ্মণের কাজকর্ম কিছু ছিল না। প্রাতে গঙ্গাস্নান করিয়া কোশাকুশি হস্তে ধনীদের বাড়ীতে বাড়ীতে ঘুরিত এবং এই সকল সংবাদ ঘরে ঘরে দিয়া আসিত। সে বলিয়া বেড়াইত যে ডিরোজিও ছেলেদিগকে বলেন, ঈশ্বর নাই, ধর্মাধর্ম নাই, পিতামাতাকে মান্য করা অবশ্য কর্তব্য নয়, ভাই-বোনে বিবাহ হওয়াতে দোষ নাই; দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সহিত ডিরোজিওর ভগিনীর বিবাহ হইবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্রমে সহরে একটা হুলুস্থুল পড়িয়া গেল।”
বৃন্দাবন ঘোষাল যে রসিক আর গুণী মানুষ ছিলেন সন্দেহ নেই। প্রায় একা গোটা সমাজকে খুঁচিয়ে তোলা কি কম বড়ো কথা! তাঁর স্বভাবোচিত লাগানি-ভাগানি যে কী পরিমাণে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন কলকাতায়, তা ডিরোজিওর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এক্ষেত্রে, ঠিক কী ঘটেছিল? বাবার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়েই মতবিরোধ তীব্র হচ্ছিল দক্ষিণারঞ্জনের। এই ঝামেলার একটা বড়ো উৎস ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা। দক্ষিণারঞ্জন উদার, মুক্ত মনের মানুষ। উনিশ শতকীয় ‘নবজাগরণের’ ছিঁটেফোঁটা আলো তাঁর ওপরও এসে পড়েছে। ডিরোজিওর প্রিয় ছাত্র তিনি। ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁর অসহ্য লাগে। এইসব নিয়েই জগন্মোহনের সঙ্গে তাঁর বিবাদ চরমে উঠল। দক্ষিণারঞ্জন ডিরোজিওকে জানালেন, তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে চান। ডিরোজিও তাঁকে বোঝালেন হটকারিতা না করতে। কিন্তু, দক্ষিণারঞ্জন শেষে আর সহ্য করতে না পেরে ডিরোজিওকে কিছু না জানিয়েই উঠে এলেন সার্কুলার রোডের ভাড়াবাড়িতে। পাশেই একটি বাড়িতে বোন এমিলিকে নিয়ে থাকতেন ডিরোজিও।
প্রিয় ছাত্র হওয়ার সুবাদে ডিরোজিওর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল দক্ষিণারঞ্জনের। বিশেষ অন্তরঙ্গতাও গড়ে উঠেছিল দুজনের মধ্যে। ডিরোজিওর বোন এমিলিও শিক্ষিতা, সুন্দরী। তাঁর সঙ্গেও দক্ষিণারঞ্জনের একটা সহজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কে আদতে প্রেমের ছিঁটেফোঁটাও ছিল না। দক্ষিণারঞ্জনের জীবনীকার মন্মথ ঘোষ লিখেছেন—“ডিরোজিও-র সুশিক্ষিতা ও স্নেহময়ী সহোদরা এমিলিয়া দক্ষিণারঞ্জনকে ভ্রাতার ন্যায় স্নেহ করিতেন।
ততে কী! কল্পনা করে নিতে তো দোষ নেই। অতএব, ঘোষালমশাই গল্প বুনে যেতেই লাগলেন। সবাই ভাবল, যা রটে তার কিছু তো বটেই। এই ‘কিছু’ কতখানি নিরীহ, সামান্য আর রটনাটি কতটা মারাত্মক—তার হিসেবনিকেশ করার সময় কোথায় তখন? বামুন-সন্তানের জাত-ধর্ম জলাঞ্জলি যাওয়ার মুখে। এখনো চুপ থাকলে চলে! ফলে, কলকাতায় ছিছিক্কারের বন্যা বয়ে গেল। সব রাগ গিয়ে পড়ল ডিরোজিওর ওপর। রটনার কোনো কোনো ভার্সনে আবার এমিলি হয়ে গেলেন ডিরোজিওর কন্যা। জল এতদূর গড়াল যে হিন্দু কলেজের কর্তৃপক্ষ বাধ্য হল ডিরোজিও-বিতাড়নে। ডিরোজিওর বিচারের জন্য জরুরি সভা বসল ১৮৩১ সালের ২৩ এপ্রিল। সেখানে নানাবিধ অভিযোগের সঙ্গে দক্ষিণারঞ্জন-সংক্রান্ত অভিযোগটিও ছিল।
২৫ এপ্রিল সেইসব অভিযোগের উত্তরও দিয়েছিলেন ডিরোজিও। চিঠির মারফত। সেই চিঠিতে উগড়ে দিয়েছিলেন বৃন্দাবন ঘোষালের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। ডিরোজিও লিখেছিলেন—“গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার কানে এসেছে, একদল লোক আমার সম্বন্ধে নানা কাল্পনিক অপপ্রচার শুরু করেছেন।… তারই মধ্যে একটা কাহিনি হল—আমার বোনের সঙ্গে, কেউ কেউ বলছেন আমার মেয়ে, যদিও আমি কন্যাহীন, নাকি কোনো হিন্দু যুবকের শীঘ্রই বিয়ে হবে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছি বৃন্দাবন ঘোষাল নামে একজন গরীব বামুন এই ব্যাপারটাকে বেশ মুখরোচক করে চারপাশে গেয়ে বেড়াচ্ছেন। আমি জেনেছি, প্রত্যেকদিন সকাল থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুনিয়ার যত অবান্তর খবর যোগাড় করে সেগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রসিয়ে-মজিয়ে লোককে শুনিয়ে বেড়ানোই ঘোষাল মশায়ের একমাত্র কাজ। ঘোষালমশায়ের মতো গুজববাজ লোক চেষ্টা করলে রাতকে দিন, শিবকে বাঁদর করে তুলতে পারেন অনায়াসে, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।”
এই ক্ষোভ খুবই স্বাভাবিক। কারণ, একজনের ডাঁহা মিথ্যে রটনার জন্য তীব্র অপমান, সমাজব্যাপী কুৎসা সহ্য করতে হল ডিরোজিও-এমিলিকে। সেইসঙ্গে হিন্দু কলেজে পড়ানোর চাকরিও গেল। এই ঘটনার পরে আর মাত্র আট মাস বেঁচেছিলেন ডিরোজিও। আর এমিলি? তিনি ইতিহাসে উপেক্ষিতা। শুধুমাত্র একটি রটনার শিকার হওয়া ছাড়া, তাঁর যেন আর কিছুই করার ছিল না।
আর দক্ষিণারঞ্জন? যাঁর ধর্মান্তরিত হওয়া এবং এমিলির সঙ্গে প্রেম নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিল কলকাতার হিন্দুসমাজ, তিনি কিন্তু কখনোই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেননি। ডাক্তার ডফের মতো খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের সান্নিধ্যও তাঁকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেনি। এমিলির সঙ্গেও ভবিষ্যতে তাঁর যোগাযোগের কোনো নথি, তথ্য এমনকি গুজবও আর শোনা যায়নি পরে।
ডিরোজিওর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই গুজবেরও মৃত্যু হয়ে গেছিল। অথবা, হয়তো ডিরোজিওকে শায়েস্তা করতে চেয়েই ফাঁদা হয়েছিল এই গোটা গুজবের চিত্রনাট্য। যে চিত্রনাট্যের অসহায় চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণারঞ্জন আর এমিলি। আর, ‘দরিদ্র’ বামুন বৃন্দাবন ঘোষাল নিয়েছিলেন পরিচালকের ভূমিকা। কে জানে! এর উত্তর দেওয়ার জন্যও তো প্রস্তুত নয় ইতিহাস।
শুধু, এই ঘটনার দিকে তাকালে ‘যা রটে, তার কিছু তো বটে’—এই প্রবাদবাক্যকে ঘোরতর সন্দেহ করতে ইচ্ছে করে। ‘কিছু’কে দিয়ে যে ‘কতকিছু’ বানিয়ে তোলা যায় ঘোষালমশাই তা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন।
তথ্যসূত্রঃ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী; গত শতকের প্রেম, পূর্ণেন্দু পত্রী।