
এগারো হাজার পালকি বাহক মিলে থমকে দিল কলকাতার রাজপথ…
সালটা ১৮২৭। কলকাতার বুকে হইচই ফেলে দেওয়ার মতো একটা ঘটনা ঘটে গেল। বলা যেতেই পারে, মহানগরীর মেহনতি মানুষদের প্রথম ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। একশো-দেড়শো নয়, প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যাটা ছিল দশ হাজারেরও বেশি। কতই বা লোকসংখ্যা তখন কলকাতার! ফলে, এটা যে মোটেই হেলাফেলার মতো ঘটনা ছিল না, বলাই বাহুল্য।
কার্ল মার্ক্স নামক মানুষটির বয়স তখন দশের কোঠাও পেরোয়নি। মেহনতি মানুষদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের তত্ত্ব দূরে থাক, তেমন কোনও জবরদস্ত লড়াই-আন্দোলনের খবরও কানে আসে না। কানে এনে ফেলার মতো মিডিয়াও অবশ্য নেই। ম্যাঞ্চেস্টারে শ্রমিকরা মিলে-জুলে একটা ইউনিয়ন গোছের তৈরি করেছে বটে বছর দশেক আগে, কিন্তু সেটা খায় না মাথায় দেয়, এদেশের কেউ জানেও না, বোঝেও না। জানার দায়ও নেই। এ দেশে তো শিল্পবিপ্লব হয়নি, বড়ো বড়ো কারখানাও গজায়নি তখনও। শ্রমিক শব্দটাই হয়তো শোনেনি কেউ। মেহনতি কথাটা তো আরোই ভিনগ্রহের।
আরো পড়ুন
চিনা বিশ্বকর্মা এবং আজব বিজ্ঞাপন
অথচ, প্রায় দুশো বছর আগেকার সেই রাজ-রাজরা, লালমুখো সাহেব-মেম, বাবু–জমিদার, টিকিধারী-পৈতেধারী বামুন-অধ্যুষিত কলকাতার বুকেই ঘটে গেছিল নগরকে থমকে দেওয়ার মতো ঘটনা। ইদানীং ‘বনধ’ হলে যেমনটা হয়, প্রায় তেমনটাই। কলকাতা অবশ্য তখন আজকের মতো কল্লোলিনী মেট্রোপলিস নয়। রাস্তায় ঘোড়া আছে বটে, গাড়ি নেই। মোটর আসেনি। থাকার মধ্যে অসংখ্য ‘হুম হু না, হুম হু না’ পালকি। কলকাতার বাহন বলতে মূলত সেটাই। তাতেই চড়েন জমিদার বাবু থেকে সাহেব-মেমরা। আর, সেই পালকি ঘিরেই যত বিভ্রাট, প্রতিবাদ, আন্দোলন।
ঝামেলার শুরু ‘পোলিশ’ (পুলিশ। পোলিশ জাতির সঙ্গে কলকাতার খুব নিবিড় সম্পর্কের কথা ইতিহাসে তেমন পাওয়া যায় না) অফিস থেকে বের হওয়া একটা ফতোয়াকে ঘিরে। সেখানে বলা হয়েছে কলকাতার সমস্ত ঠিকা বেহারাকে লাইসেন্স করাতে হবে। অনেকটা তাবিজের মতো দেখতে সেই লাইসেন্সকে নাকি ঝুলিয়েও রাখতে হবে গলায়। এখন হাওড়া–শিয়ালদা স্টেশনে গেলে কুলিদের হাতে যেমন তাবিজ দেখা যায়, অনেকটা তেমনই ব্যাপার আর কী! আর সেই তাবিজ থুড়ি লাইসেন্স সবাইকে কিনতে হবে নিজের ট্যাঁকের পয়সায়।
এই বেয়ারা ফতোয়া নিয়েই রেগে ফায়ার হয়ে গেলেন কলকাতার এগারো হাজারেরও বেশি ঠিকা বেহারা। এঁরা প্রায় সবাই ওড়িশার মানুষ। রাগের কারণ বুঝতে তখনকার বাংলা-ইংরেজি সংবাদপত্রগুলির নাজেহাল অবস্থা। ‘কেহ তাহাদিগকে কুমন্ত্রণা দিয়া থাকিবেক’—এমন সন্দেহও ঘুরছে হাওয়ায়। কিন্তু, সাদা চোখে দেখলেই রাগের কারণ দিব্বি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। শুধু রেজিস্ট্রেশন করানোর ফতোয়াই নয়, ‘পোলিশ অফিস’ পালকি-বাহকদের গোটা সিস্টেমটাই নষ্ট করে দিতে চেয়েছিল। ভাড়াও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সেই ফতোয়ায়—
‘সমস্ত দিন ফি—। চারি আনা।
ইঙ্গরেজি ১৪ ঘড়িতে একদিন গণা যাইবেক
অর্ধদিন— অর্থাৎ ইঙ্গরেজি এক ঘড়ির অধিক পাঁচ ঘড়ির কম— দুই আনা।’
একইসঙ্গে বেহারাদের ভাড়াও গিয়ে দাঁড়াল দিনে চার আনা। চোদ্দ ঘড়ির দিনে অর্ধেক খাটলে মজুরিও অর্ধেক।
এতদিন মজুরি মিলত সময়ের হিসেবে নয়, দূরত্বের হিসেবে। খাটনির নিরিখে দরদামের স্বাধীন অধিকারও ছিল বেহারাদের। এখন সব নিয়মের ফতোয়ায় বাঁধা পড়ল। অন্যথা হলেই শাস্তি। বেহারারা যে একে জুলুম মনে করবেন, আশ্চর্য কী! অতএব, তাঁরা জোট বাঁধলেন।
এই নতুন নিয়ম যে বেহারাদের পক্ষে সুবিধের নয়, তা ক্রমে বুঝতে পারলেন সংবাদপত্রের সম্পাদক-প্রতিবেদকরা। লেখালিখিও শুরু হল। ‘সমাচার দর্পণে’ লেখা হল— ‘কলিকাতা হইতে কালীঘাটে কোনও বাবুকে লইয়া যাইতে হইলে মরে পিটে এক ঘন্টার মধ্যে যাওয়া যায় এবং সে এক ঘন্টার মজুরি তাহারা প্রত্যেকে কেবল এক ২ আনা করিয়া পাইবেক কিন্তু সেই এক ঘন্টায় তাহাদের তাবৎ দিবসের বল যাইবে।’ ইংরেজি পত্রিকাতেও বেহারাদের পক্ষে মতামত আসা শুরু হয়েছিল। ন্যায্য প্রশ্ন তুললেন কেউ কেউ। বেহারাদের কাছে ঘড়ি নেই। বড়োলোক বাবু বা সাহেবরা যদি সময় নিয়ে তাঁদের ঠকায়? সরকারি ব্যয়ে বেহারাদের ঘড়ি কিনে দেওয়ার প্রস্তাবও এল। নানা মুনির নানা মতে কলকাতার পথ-ঘাট চত্বর তখন সরগরম। সরগরম না হয়ে উপায়ও নেই, কারণ পালকি-বাহকেরা ‘স্ট্রাইক’ ডেকেছেন।

বেহারাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত– রাস্তায় কোনো পালকি নামবে না। পালকি ছাড়া সেকেলে কলকাতা অচল। পথ-ঘাট শুনশান। এমনকি, প্রাইভেট পালকির বেহারারাও যোগ দিয়েছেন এই প্রতিবাদে। সব মিলিয়ে পালকি-চাপা কলকাতাবাসীর নাজেহাল অবস্থা। রাজাদেশের বিরুদ্ধে এমন লড়াকু জোট কিন্তু সে’যুগে বেশ ব্যতিক্রমী ব্যাপার। বেহারাদের সর্দাররা ঐক্য বজায় রাখতে হুকুম দিলেন—দল ভাঙলেই একঘরে হতে হবে। দল ভাঙার প্রশ্নও ছিল না অবশ্য। নতুন ফতোয়া সবারই পেটে টান মেরেছে। Calcutta plains-এ (ময়দান) একটা বিরাট সমাবেশ হল বেহারাদের। সেখান থেকে সবাই ছুটলেন কলকাতার পুলিশ অফিসে। এত এত মানুষের উত্তেজিত ভিড় দেখে কর্তারা খানিক নরম হতেও বাধ্য হলেন। রফায় রেজিস্ট্রেশনের তাবিজ কেনার খরচ বাদ দেওয়া হল। আরও খুচরো দু-একটা ছাড় মিলল। বেহারাদের ঢল ফিরে গেল। কর্তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
কিন্তু, ‘স্ট্রাইক’ প্রত্যাহার হল না। কারণ, আসল সুরাহাই নাকি মেলেনি। ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়, মিটিং-এর পরে বেহারারা জড়ো হন সুপ্রিম কোর্টের সামনের জমিতে। সেখানে সরকারি প্রস্তাব নিয়ে বিবেচনা-আলোচনা চলে। এবং, সবাই একমত হয়ে জানান— জাত খুইয়ে হাতে চাকতি বাঁধবেন না তাঁরা।
এতক্ষণ অবধি যা ছিল পেটের ব্যাপার, তার সঙ্গে জুড়ে গেল জাত খোওয়ানোর প্রশ্ন। অবাক লাগলে, একটু ইতিহাসে চোখ রাখুন। দেখতে পাবেন, উনিশ শতকে ধর্ম-জাতকে ঘিরে একাধিক বিক্ষোভ-আন্দোলন-বিদ্রোহ দানা বেঁধেছে বঙ্গদেশ-সহ পরাধীন ভারতবর্ষে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সলতেতেও আগুন দিয়েছিল এই ধর্মভ্রষ্ট হওয়ার প্রশ্নটাই। ১৮২৭-এ কলকাতার বাহকরাও মনে করেছিলেন, লালমুখোদের দেওয়া তাবিজ হাতে বাঁধা মানে জাত নষ্ট হওয়া। আপাতবিচারে অবশ্যই কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অন্ধ বিশ্বাসের থেকে জন্ম নেওয়া ভাবনা। কিন্তু, এর পিছনেই কিন্তু ছিল জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাজাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ইতিহাস সরল নয় কখনওই।
সরকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হতেন কিনা জানা নেই, কিন্তু এই বেনজির আন্দোলনের পেটে লাথি মারলেন ‘স্বদেশি’রাই। ওড়িয়া বাহকরা কাঁধ থেকে পালকি নামিয়ে রেখেছেন শুনে গঙ্গা পেরিয়ে দলে দলে কলকাতায় ঢুকতে লাগলেন হিন্দুস্থানি রাউনি বেহারারা। গরিব-গুর্বো সব মানুষ, কাজ পেলে বর্তে যান। ওড়িয়া বাহকদের জাত নষ্ট হওয়া, অধিকারের দাবি, ন্যায্য পারিশ্রমিকের দাবিগুলো সেই অভাবের জোটের কাছে পাত্তা পেল না। দেখতে দেখতে কলকাতার পথ-ঘাট ছেয়ে গেল হিন্দুস্থানি বেহারায়। ওড়িয়া বেহারাদের বিদ্রোহকে কড়া হাতে দমন করতে হল না সরকারকে। মাথা নুইয়ে তাঁদের দাবি মেনেও নিতে হল না।
কিছুদিনের মধ্যেই চাকা গজাল মহানগরীর। পালকি-গাড়ি থেকে এক্কা ঘাড়ি, তারপর ট্রাম। ওড়িয়া বাহকদের মতো একে একে উবে গেলেন অন্যান্য পালকি-বাহকরাও। বা পেশা বদলে নিলেন। বড় বড়ো শহরে এসবই ছোটো ছোটো ব্যাপার। ওড়িয়া বাহকদের প্রতিবাদটা কিন্তু ‘ছোটো’ ছিল না মোটেই। এগারো হাজারেরও বেশি মানুষের প্রতিবাদ বলে কথা!
কলকাতা মহানগরীর মেহনতি মানুষদের প্রথম ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন!
তথ্যসূত্র: কোলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট-এর ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ডোমেস্টিক স্কেচ’, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সংবাদপত্রের সেকালের কথা’ এবং শ্রীপান্থর ‘কলকাতা’।
