
রহস্যময় চিনেরা বারবার চমকে দিত কলকাতার সাহেবদেরও
এপ্রিল ফুল করছে নাকি!
সকালের কাগজ খুলেই নড়েচড়ে বসেছিলেন সাহেব-মেমদের দল। ১৭৮৪ সালের পয়লা এপ্রিল। আয়তনে ছোটোখাটো কলকাতা শহরে প্রথম গ্রীষ্মের সকালগুলো তখনো ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো নয়। শহর বলতে তো মেরেকেটে শ’দেড়েক বাড়ি। দেদার ফাঁকা জায়গা, জংলা জমি, জলা। তারই মাঝে মাঝে সাহেবদের বাগান-ঘেরা বাংলো। ‘ক্যালকাটা গেজেটে’র ক্যালিগ্রাফিক অক্ষরে ছেপে আসে কলোনিয়াল অঙ্কুরের নানা খবর। যৎসামান্য বিনোদনের উপকরণ খোঁজেন দেশ ছেড়ে আসা হা-পিত্যেশি মানুষগুলো। সেদিন সকালের মনখারাপি স্মৃতিমেদুরতাকে এক ঝটকায় যেন সুদুর লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিল কাগজে ছাপা একটা বিজ্ঞাপন। বলা ভালো চিনা বিজ্ঞাপন। সাহেবরা চমকে উঠে ভাবলেন, এপ্রিল ফুল করছে নাকি!
কলকাতা-কাঁপানো সেই বিজ্ঞাপনটি দিয়েছিলেন জনৈক টম ফ্যাট, ‘নেটিভ অব চায়না’। বিশ্বকর্মা একেবারে। বড় বিনম্র ভঙ্গিতে তৎকালীন কলকাতাবাসীকে তিনি জানাচ্ছেন- “ any person having tanks in their gardens, or elsewhere, end being desirous to have them cleared out, he will contract with them for the same upon very reasonable terms, being certain that he can finish the work quicker than any Bengali people, by means of a China Pump. Any Gentleman willing to contract with the said Mr. Fatt, is requested to enquire as his Rum Works, at Sulkey opposite Calcutta.
N.B. He makes Loaf-Sugar equal in quality to that made in Europe, and excellent Sugar-candy. Also all sorts of cabinet work, the same as in China.”
পয়লা এপ্রিলের সকালের উপযোগী বিজ্ঞাপনই বটে। আজকের যুগে এত্ত বড় বিজ্ঞাপন ছাপাতে গেলে হয়তো দেউলিয়া হয়ে যেতেন ফ্যাট। তখনো বিজ্ঞাপনের বাজার অতটাও খোলতাই হয়নি। ফলে, প্রায় দু প্যারাগ্রাফ বড়ো বিজ্ঞাপনও কুলিয়ে গেছিল ফ্যাটের বাজেটে।
সে যাহোক, ভদ্রলোকের দাবিগুলো খেয়াল করুন শুধু। তিনি পুকুর পরিষ্কার করতে ওস্তাদ। বাঙালিদের তুলনায় অনেক দ্রুত। কারণ, তাঁর একপিস চিনা পাম্প আছে। তিনি নাকি চিনিও তৈরি করতে পারেন। সেই চিনি ইউরোপে তৈরি চিনির সমকক্ষ। চাইলে চিনির ক্যান্ডিও মিলবে তাঁর ভাঁড়ারে। তাছাড়া, চিনা কাঠের কারুকার্য করা আসবাব তৈরিতেও তাঁর সমান দক্ষতা। এবং সর্বোপরি, তিনি মদও তৈয়ার করে থাকেন।
একই অঙ্গে এত রূপ দেখতে তৎকালীন কলকাতাবাসী এবং সাহেব-সুবোরা খুব একটা প্রস্তুত ছিলেন না, বলাই বাহুল্য। এমন অপ্রস্তুত মানুষদের কাছে নিজের বিচিত্র দক্ষতার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফ্যাটের আদৌ কোনো উপকার হয়েছিল কিনা, জানা নেই। যেমন জানা নেই, এই বিজ্ঞাপন দেখে কতজন ঢুঁ মেরেছিল তাঁর ঠেকে। তবে, কলকাতার সাহেব-দেশি-উঠতি বড়োলোক-গরিব লোক সবাই কিন্তু ক্রমে বুঝতে পারছিলেন চিনারা কেমন জিনিস! এমনিতে শান্ত, মুখচোরা এই মানুষগুলো ভারি রহস্যময়। তাঁরা নানা কাজে দড়। সে দক্ষতার তল পাওয়া মুস্কিল। সদ্য হাঁটতে শেখা একটা শহর অবাক বিস্ময়ে দেখে তাঁদের কেরামতি।
পলাশির যুদ্ধের শেষে চিনের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা জমে ওঠার পর থেকেই কলকাতায় চিনাদের ঠেক বেড়েছে এক এক করে। তাঁদের কলকাতার আদি বাসিন্দাই বলা চলে। বেইলির ১৭৯২ সালের মানচিত্রেও চিনারা থিতু। রহস্যময় চিনা মহল্লা। রঙে চোবানো, অদ্ভুত। চিনা ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড, ধুনোর গন্ধ, রঙিন কাগজের লন্ঠন। চিনা বাজার, চিনা খাবার, চিনা লেন। গলির ভিতর গলি। দুই পাশে বাড়ি। বাড়ির ভিতরে লালচে-নিলচে অন্ধকার, চিনা কার্পেট আর অপার রহস্য।
তবে, এর চাইতেও রহস্যময় চিনা বিজ্ঞাপনগুলো। এমনিতে চুপচাপ চিনেরা যেমন খুব বিরল ঝামেলায় জড়াতেন, তেমনই বিরল চিনা বিজ্ঞাপন সকালের কাগজে দেখতেন শহরবাসী। বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনই হত না অবশ্য। একই বিজ্ঞাপন ‘বহু’র কাজ করে দিত। কোনো বিজ্ঞাপনেই তো শুধু একটা বিষয়ের কথা নেই। তবে, রহস্য শুধু বিজ্ঞাপনের দাবিতে নয়, ভাষাতেও। ১৮১৭ সালে প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা গেজেটের’ আরেকটা বিজ্ঞাপন দেখলেই স্পষ্ট হবে— “A Hoy teacher of foreign tongue, too much chin chins every strangers Gentleman, very too much late come from Europe have, and begs leave to acquaint them that he can talkee lesson every day, in the Canton dialect, at his house in Mo. 4 Old China Street have got, from two o’clock ten minutes till four o’clock everyday…”
এমন বিজ্ঞাপন পড়ে ভেবলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। হালে গুগল যেমন অনুবাদ করে, অনেকটা তেমন ভাষায় লেখা। চিনাদের ইংরেজির প্রতি অবজ্ঞা থেকেই কিনা কে জানে, ব্যাকরণগত ভুল শুধরে দেওয়ার চেষ্টামাত্রও করেননি পত্রিকার প্রকাশকরা। কিন্তু, এমন রঙিন ইংরেজিতে বিজ্ঞাপনের রহস্য আরো খোলতাই হয়েছে। এমনিতে বিজ্ঞাপনটি আরো বড়ো। প্রায় মালগাড়ির সমান। অর্থাৎ, ফ্যাটের দেওয়া বিজ্ঞাপনের তিরিশ বছর পেরিয়েও বিজ্ঞাপনের দর বাড়েনি কলোনিয়াল কলকাতার বাজারে। তার ওপর এই ভাষা। এবং চিরাচরিত বিস্ময় উদ্রেককারী চিনা দাবি। এই জনৈক অ্যা হয় দাবি করছেন, তিনি বিলেত ফেরত। ফলে, ইংরেজি ও মাতৃভাষা দুইই তাঁর আয়ত্তে (প্রথমটির প্রমাণ বিজ্ঞাপনেই রয়েছে)। অতএব, তিনি সাহেবদের চিনা ভাষা শেখাতে চান। যদিও, বিজ্ঞাপন এখানেই শেষ নয়। অ্যা আরো জানাচ্ছেন, তাঁর একটি দোকানও আছে চিনেপল্লিতে। সঙ্গে আরো নানা কেরামতির খতিয়ান। কর্মদক্ষতায় ও বৈচিত্রে টিম ফ্যাটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারেন এই অ্যা।
অ্যা-এর বিজ্ঞাপন দেখে কজনের মুখ থেকে ‘অ্যাঁ’ বেরিয়েছিল জানার উপায় নেই। তবে, তদ্দিনে অবশ্য চিনাদের দিব্বি চিনে গেছে কলকাতার মানুষ। তাঁরা কাজে বিশ্বকর্মা, ভাষায় সরস্বতী। তারই প্রমাণ থুড়ি মোহর ছড়ানো আশ্চর্য সব বিজ্ঞাপনে। যেদিন এগুলো বেরোত, কলকাতার সকালটাই খানিক অন্যরকম হয়ে যেত নিশ্চিত।
সেই চিনেপাড়া আজ থেকেও নেই, সেই সর্ব ঘটে চিনে কলারাও নেই। চিনে রেস্তোরাঁগুলোও কতখানি খাঁটি, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সেইসব রহস্যময়ী চিনে বিজ্ঞাপনরাও পালিয়েছে দৈনিকের পাতা থেকে। বিস্ময় শব্দটাই এখন মুছে যেতে বসেছে থ্রিডি, ফোর জি-র দুনিয়ায়। তবু, চিনেদের বিশ্বাস নেই। বলা যায় না, এই লেখা পড়েই হয়তো হারানো বিস্ময় ফিরে পেলেন কেউ কেউ!
তথ্যসূত্রঃ Basanta Kumar Basu, A Bygone Chinese Colony in Bengal, Bengal Past and Present, 47, 1934, শ্রীপান্থ, কলকাতা।
