
এক পর্যায়ে এটি অবিভক্ত বাংলার বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়
কপোতাক্ষ নদীতে এখন আর বড় বড় লঞ্চ, স্টীমার, হাজার মণের নৌকা ভেড়ে না। গুড় দিয়ে তৈরি হয় না এখন আর চিনি, দেশ বিদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা ভীড় করে না। তার পরেও কয়েক শত বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য বুকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কোটচাঁদপুর উপজেলা। এক সময়ে মহকুমা এ শহর শিল্পে, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে, ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নত কোটচাঁদপুর এখন বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছে। ভারতের পাশ্ববর্তী ও ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপক প্রসার থাকায় এক সময় ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর-কে ‘ছোট কলকাতা’ বলা হত। তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এগুলো শুধু গল্পের মতোই। সময়ের প্রয়োজনে শত শত বছরের পুরানো ভবনগুলো সংস্কার করে গড়ে উঠেছে বড় বড় দালানে। সরু রাস্তাগুলো প্রসস্ত হয়েছে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
বিভিন্ন ব্যক্তি আর ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সময় কোটচাঁদপুর কেয়া বাগানে ভরা ছিল। পরিবেশ ছিল প্রাকৃতিক মনোরম। মুঘল সম্রাজ্যের সম্রাট আকবরের আমলে পশ্চিমা দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য এ এলাকায় আসেন দরবেশ সরদার চাঁদ খাঁ। কোটচাঁদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি এখানে বসতি স্থাপন করেন। সে সময় দরবেশ সরদার চাঁদ খাঁ’র নামে জনপদের নামকরণ করা হয় চাঁদপুর। এক পর্যায়ে চাঁদপুর এ বঙ্গের বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। যার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ ও বিদেশে। মগ ও পর্তুগিজদের নজরে আসে চাঁদপুরের বাণিজ্যকেন্দ্রটি। বিভিন্ন সময় তারা এখানে আক্রমণ করে লুটপাট করেন। ১৬০৮ সালে বাদশা জাহাঙ্গির মগ-ফিরিঙ্গী জলুদস্যুদের দমন করতে ইসলাম খাঁ চিশতি নামের এক সাহসী সুবেদারকে চাঁদপুরে পাঠান। ১৬১০ সালের দিকে সুবেদার ইসলাম খাঁ চাঁদপুরে প্রাচীর তৈরি করেন। সুবিচার করার জন্য একটি কোর্ট বা আদালত প্রতিষ্ঠা করেন।এই কোর্ট(লোকমুখে ‘কোট’) শব্দ যুক্ত করে পরবর্তীতে চাঁদপুরকে কোটচাঁদপুর করা হয়। ১৬১৩ সালে সুবেদার ইসলাম খাঁ মারা গেলে কাসিম খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন।
১৮৩০-৪৭ সালের কোনও এক সময় কোটচাঁদপুরকে মহাকুমা পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। ১৮৬৩ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত তা টিকে থাকে। ১৮৬৩ সালে সম্পুর্ণরুপে তা বিলুপ্ত করা হয়। সে সময় কোটচাঁদপুরের সেই সংরক্ষিত কোটটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়।
কোটচাঁদপুর-কে সেকালে বাণিজ্য শহর বলা হত। এখানে বাণিজ্য হত মাতগুড়। এই গুড় দিয়েই তৈরি করা হত চিনি। এই চিনির ব্যাপক সুনাম ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপিয়ান নাগরিক মি: বেক নামের এক সাহেব এখানে একটি চিনিকল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৪২ সালে এ চিনিকলটি মি: নিউহাউজ-এর মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়। পরবর্তীতে একাধিক চিনিকল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৯০ সালে এখানে পুরোদমে চিনি কলগুলো ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। কপোতাক্ষ নদ দিয়ে বড়বড় লঞ্চ, স্টীমার, হাজরা মনি নৌকা যাতায়াত করত। তাতে আসতেন দেশ বিদেশের বড় বড় ব্যবসায়ী। সেই চিনিকলগুলোর পুরনো ভবনগুলো বেশ কয়েকটি এখনো রয়েছে কোটচাঁদপুরে।
সে সময় কোটচাঁদপুরকে বলা হত ছোট কলকাতা। কোটচাঁদপুরকে ১৮৮৩ সালে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়। সে সময় দায়িত্বে ছিল মি: ক্যাসেল, ডিস্টিক ম্যাজিষ্ট্রেট। পর্যায়ক্রমে মি: ইজি ম্যাকলিয়ড, এইচসি ম্যাকলিয়ড, নীলরঞ্জন রায়, হেমন্ত চন্দ্র মুখার্জী দায়িত পালন করেছেন। ১৯৪৭ সালে এ পৌরসভায় প্রথম মুসলমান হিসেবে গোলাম হায়দার সরদার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা কোটের বিচার কাজ না থাকলেও কোটচাঁদপুরের কোর্টটি এখানে দাড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হিসেবে। বিলুপ্ত কোর্ট কাছারি ভবনটি ১৮৯৯ সালে এলাকার ছেলে মেয়েদের শিক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এটি প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যা এখন কোটচাঁদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। কয়েকশ বছরের পুরনো ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হলেও এখনও ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও কোটচাঁদপুরে কয়েকশ বছরের পুরানো বাড়িগুলোর কয়েকটি এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
(ঋণ – ওয়াননিউজবিডি.কম)
