আকাশে উড়ছে বেলুন-সাহেব, রাস্তায় নাচছে ঘোড়া

সাবেক কলকাতায় শোরগোল ফেলা দুটি আমোদের কাহানি

“…কলে, কৌশলে, বেণেতী বেসাতে, টাকা খাটিয়ে অতি অল্প দিন মধ্যে কলিকাতা সহরে কতকগুলি ছোট লোক বড়মানুষ হন। রামলীলে, স্নানযাত্রা, চড়ক, বেলুন ওড়া, বাজি ও ঘোড়ার নাচ এঁরাই রেখেছেন…”

হুতোম সাক্ষ্য দিচ্ছেন এক আজব কলকাতার। সেই কলকাতায় নানা কৌশলে হুট করে কাঁচা টাকার মুখ দেখে ফেলেছেন কতগুলো মানুষ। জমিদার হয়ে জাঁকিয়ে বসেছেন শহরে। তাদের ফুর্তির কোনো সীমা নেই। তাদের দৌলতেই কলকাতায় মাঝেমাঝে হইচই হয়। রামলীলেয় ভিড় জমায় মানুষ, স্নানযাত্রা দেখতে রাস্তার দু’পাশে জনপ্লাবন নামে। এহো বাহ্য, এদের করুণাতেই কলকাতার আকাশে বেলুন ওড়ে, রাস্তায় মানুষের সঙ্গে নাচে ঘোড়াও। হুতোম এদের খোঁচা দিতে ছাড়েন না ঠিকই, কিন্তু এদের বড়লোকি অবদান এক্কেবারে অগ্রাহ্যও করেন না।

সে এক দিন ছিল বটে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা’-র প্রকাশকাল ১৮৬২ সাল। তদ্দিনে লালমুখো সাহেবরা এদেশে শাসনের ভিত পাকা করে ফেলেছে। কলকাতা শহর তার বিচিত্র চরিত্র নিয়েই কলেবরে বেড়ে উঠছে ক্রমশ। সেখানে নানাজাতের, নানা ভাষার মানুষের ভিড়। তাদের হাজারো সংস্কৃতি। সেই কলকাতায় কান পাতলেই শোনা যায় বাইজি গান, ইতিউতি শুরু হয় কবিগানের তরজা। আখড়াই ভেঙে হাফ আখড়াইয়ের জন্মও হয়ে গেছে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গান গায় সঙের দল, রামলীলে হয়, জমিদারের ছেলের বিয়ের জমক দেখতে গোটা শহর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এহেন কলকাতাতেও দুটো জিনিস বিশেষ হইচই ফেলেছিল— আকাশে বেলুন ওড়া আর ঘোড়ার নাচ। 

হুতোম ‘বেলুন ওড়া’ বলতে সাদামাটা বেলুন ওড়া বোঝাননি । তখন চারপাশে এত্ত বেলুন কোথায়? তবে, ১৮৩৬ সালে কলকাতার আকাশে একটা ইয়াব্বড় বেলুন উড়েছিল বটে। কলকাতাবাসী অবাক হয়ে দেখেছিল, সেই বেলুনে চেপে বসে আছেন একজন সাহেব। নাম রবার্টসন। তখনো উড়োজাহাজ দেখেনি তামাম বিশ্ব। অতএব, আকাশে একজন গোটা মানুষ উড়ছে, সেটাই বিপুল বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল। সবার চোখ ঊর্ধ্বমুখে। ‘ওই, ওই যে, উড়ছে…’ কেউ বলেন সাহেব তাকে দেখতে পেয়ে হাত নেড়েছেন, কেউ বলেন সাহেব নাকি ভয়ে কাঁদছিল, কেউ কেউ আবার বলছে—ধুস বেলুনে সাহেবই নেই। সব মিলিয়ে সে কী হুলুস্থুলু ব্যাপার।

আদতে ঘটনাটা কী ঘটেছিল? রবার্টসন নামের এক সাহেব ঠিক করলেন, আকাশে বেলুন নিয়ে উড়ে খানিক রোজগার করবেন। কলকাতার ধনী বাবুদের কাছে আর্জি জানাতেই কেল্লা ফতে। তারা বিপুল টাকা চাঁদা দিলেন। তারপর, ঘোর বসন্তে সাহেব বেলুন নিয়ে উড়লেন আকাশে। ১৮২৬ সালের ২৬ মার্চ, ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা জানাচ্ছে, মুচিখোলা থেকে উড়ে অল্প খানিক গিয়েই নাকি বেলুন থেকে নেমে পড়েছিলেন রবার্টসন সাহেব। এতে লোকজন বলাবলি করছিল, সাহেবের বেশি চাঁদা ওঠেনি বলেই নাকি তিনি এমনটা করেছেন। কেউ কেউ আবার এই বেলুন নিয়ে ওড়ার আড়ালে সাহেবের ষড়যন্ত্রও দেখতে পেয়েছিলেন। এ নাকি কলকাতার মানুষের টাকা হস্তগত করার কল। তবে এইসব ‘গুজব’-এর পাশাপাশি ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা আরো একটা তথ্যও জানিয়েছিল, সাহেবের নাকি ইচ্ছে—‘গড়ের মাঠ হইতে পুনরায় বেলুন যন্ত্রে ঊর্দ্ধে গমন করিবেন আমাদিগের প্রার্থনা এবারে সাহেবের কিছু অধিক লভ্য হয়।’

সাহেবের এই আকাশ-বিহার নিয়ে কলকাতাবাসী যে দু’ভাগ হয়ে গেছিল, সে স্পষ্ট। আকাশে সাহেবকে দেখে বিস্ময়াবিষ্ট একপক্ষ তাঁর সাফল্যে খুশি। তারা চাইছিলেন সাহেব আরো উড়ুন বেলুনে, তাদের চমকে দিন। খানিক রোজগারও করুন। অন্যপক্ষটি অবশ্য সাহেবের এই কৃতিত্ব নিয়ে সন্দিহান। সব মিলিয়ে, সাহবের পক্ষ-বিপক্ষের তরজায় বেলুন ওড়া নিয়ে একটা উন্মাদনা তৈরি হয়ে গেল কলকাতায়। আর, বেলুন ওড়াকে কেন্দ্র করে বড়লোকি জমক দেখাবার একটা প্রবণতাও শুরু হয়ে গেল তখন থেকেই। তবে, সব ক্ষেত্রে আর মানুষ-সমেত বেলুন উড়ত না। ১৮৫৪ সালের ২৩ নভেম্বর, ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা খবর দিচ্ছে, কান্দীতে মানুষ ছাড়াই বেলুন ওড়ার। উড়িয়েছেন পাইকপাড়ার রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ। সেসব ঢাউস বেলুন। আজকের মতো পলকা বেলুন নয়। ওড়াতেনও রাজা-বাবু-জমিদার মানুষরা। খবর তো হবেই।

আর শোরগোল ফেলেছিল ঘোড়ার নাচ। চারুচন্দ্র দত্তের ‘পুরানো কথা’-য় রয়েছে ঘোড়ার নৃত্যদক্ষতার কথা। বাজনার তালে তালে নাচ শেখালে নাকি তারা দিব্বি নাচে। আর, সেই নাচ দেখতেই ভিড় জমে যায়। তবে ঘোড়াকে নাচ শেখানোর প্রথা হয়তো বাংলার নিজস্ব নয়, আমদানি করা। বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’-এর এক চরিত্র জানাচ্ছে, সে আর তার বন্ধু মিলে মেলা থেকে ঘোড়া কিনে এনে নাচ শেখায় আর তারপর বেচে দেয় বেশি দামে। সে-ই জানিয়েছিল, ‘ঘোড়ার নাচ দু-রকম জমৈতি আর ফনৈতি। জমৈতিতে যে-সব ঘোড়ার তালিম বেশী, তারা বেশী দামে বিক্রি হয়।’ (মূল বানান অপরিবর্তিত) 

‘আরণ্যক’ অনেক পরে লেখা। কিন্তু, এই তথ্যটি থেকে ঘোড়ার নাচ আমদানির দেশীয় ইতিহাসকে হয়তো ব্যাখ্যা করা যায় খানিক হলেও। কলকাতায় উনিশ শতকে ঘোড়ার বিলিতি নাচের দেখাও মিলত অবশ্য। ১৮৫০ সালের অক্টবরে ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে হিলার এবং জর্ডন সাহেবের বিজ্ঞাপন। সেখানে দুই সাহেব জানাচ্ছেন, তারা বারো দফা ঘোড়ার ‘নাট্যক্রিয়া’ দেখাবেন। খুব অল্পদিন এই ‘শো’ চলবে কলকাতায়। তারপর, দলবল নিয়ে সাহেব-জোড় রওনা দেবেন মাদ্রাজ। 

তবে, সমস্ত ঘোড়ার নাচই বিলিতি হত না। দেশীয় ঘোড়ার নাচও ছিল। হুতোমের আমলে তা কলকাতার অন্যতম বিনোদনও বটে। এমনই নাচের আয়োজন হয়তো করেছিলেন হাটখোলা দত্তবাড়ির যতীন্দ্রমোহন দত্ত। সেই নাচ ছিল বাড়ির পর্দানশীন মেয়েদের জন্য। এই দত্তবাড়ির উঠোনেই নাতি সুরথকুমারের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে দু’দিন ধরে ঘোরানাচের আয়োজন করেছিলেন হরিশচন্দ্র দত্ত। 
হুতোমের সেই কলকাতা আর নেই। এখন আর বাজনার তালে তালে ঘোড়ার নাচ দেখতে হামলে পড়ে না ভিড়। কলকাতার আকাশে বেলুন-সাহেবের ওড়ার ঘটনাও ঘটে না। ঘটলেও কি আর বিস্মিত হতাম আমরা? থ্রিডি, ফোর জি-র দুনিয়ায় এইসবে বুঁদ হওয়ার মরো বিস্ময়বোধ কি আদৌ আর আমাদের অবশিষ্ট আছে? কিন্তু, সেই কলকাতার ছিল। বড়োলোকরা টাকা ঢালত আর বাকিরা তা থেকে চুঁইয়ে পড়া আমোদের ছিঁটেফোঁটা চেটেপুটে নিত। ছিল বটে সেইসব দিন, ভালো-মন্দে মিশিয়ে, বিস্ময়ে জড়ানো। কলকাতায়।

তথ্যসূত্র:  সটীক হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা, অরুণ নাগ সম্পাদিত।

Developed by DXDasia