তোমার নাম হওয়া উচিত ছিল ‘বিছুটি’ : বনফুলকে বললেন রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ ও বনফুল, অসমবয়সী এই দুই বন্ধুর চিঠি চালাচালি হয়েছে অসংখ্যবার

বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি নাম বনফুল (Bonoful), বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। ছোটো ছোটো গল্পে তাঁর আবেগ শব্দের ইমারত তৈরি করেছিল। একালের অনুগল্প, মেট্রোগল্পের ভিত কিন্তু তৈরি হয়েছিল বনফুলের ক্ষুদ্রায়তন গল্পগুলির মধ্যেই। সেই বনফুলের গল্প ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore)। গুণীর কদর করতে জানতেন তিনি। বনফুলও রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের অমোঘ টানে বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, রবি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। তখন শব্দের প্রহরা অতিক্রম করে দুটি উজ্জ্বল, অসমবয়সী মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে এক অনিবার্য বন্ধনে আবদ্ধ হন। সময় সেই গল্প মনে রাখে।

বনফুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্র হল ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় প্রকাশিত একটি চিঠি। ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ রামচন্দ্র ঝাঁ কালীঘাটে এসে পাঁঠাবলির বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বাহবা দিয়ে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় একটি কবিতা লিখেছিলেন। বনফুলের মনে নানা কারণে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে ক্ষোভ জমছিল। সেইসব ক্ষোভের কারণ ছিল বনফুলের মনের নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড। রবীন্দ্রনাথ নাকি তোষামোদপটু পারিষদ পরিবৃত হয়ে থাকেন, বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়সে প্রেমের কবিতা লেখেন, অক্ষম লেখকদের লেখার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এই কবিতাটির পরিপ্রেক্ষিতে বনফুল রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে একটি ছন্দে গাঁথা চিঠি লেখেন। যার মূল কথা ছিল অসহায় ছাগশিশুর প্রতি পক্ষপাতের কারণ কী! ফুল, রেশম কীট ইত্যাদির হত্যা নিবারণে তাঁর পরিকল্পনা কী? এই চিঠি সাময়িক উত্তেজনা থেকে লেখা হয়েছিল।

এই কথা শুনে বনফুল বন্ধু মারফত বলে পাঠিয়েছিলেন, “ভাই, অত বড়ো লোকের দরবারে যেতে ভয় করে। তাছাড়া, আমি ডাক্তার এবং ব্রাক্ষ্মণ, ‘কল’ না পেলে কোথাও যাই না। অত বড়ো লোকের কাছে অনিমন্ত্রিত যাওয়ার সাহসও নেই। দারোয়ান হয়তো ঢুকতেই দেবে না।’ এরপর একটা চিঠি এল, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে— “পত্রদ্বারা নিমন্ত্রণ করলাম, ত্রুটি মার্জনা কোরো। —এখানে বসন্তোৎসব হবে। তুমি সপরিবারে এলে খুশি হব। অভ্যর্থনার কোনো ত্রুটি হবে না।” এই চিঠির পর না যাওয়ার কোনো কারণ নেই। সপরিবারে শান্তিনিকেতন গিয়ে পৌঁছলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। সঙ্গে ছিল বাড়ির বানানো সন্দেশ। সেই মিষ্টি খেয়ে রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে তো দুটিমাত্র রসস্রষ্টা আছে। প্রথম দ্বারিক, দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ যে তৃতীয় লোকের আবির্ভাব হল দেখছি।” এবার এলেন বনফুলের লেখার প্রসঙ্গে। বললেন, “তোমার লেখা পড়ে মনে হয় তুমি ঝাল খেতে বড়ো ভালোবাসো।” বলেই বনফুলকে লঙ্কা দেওয়া ঘুগনি খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “তোমার নাম বনফুল কে দিয়েছিল? তোমার নাম হওয়া উচিত ছিল ‘বিছুটি’। যা দু এক ঘা দিয়েছ তার জ্বলুনি এখনও কমেনি।”

বনফুল স্পষ্টবক্তা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মিষ্টভাষী।দুজনের বয়সের ফারাকও ছিল অনেক। তবু বন্ধুত্ব হল। কথালাপে প্রাণবন্ত হল রবীন্দ্রনাথের জীবনচর্যা। পরে বনফুল তাঁর লেখা ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’-তে ধরে রাখবেন সেইসব মুহূর্তগুলি। একবার শান্তিনিকেতনে নাচের অনুষ্ঠান দেখার পর রবীন্দ্রনাথ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালি মেয়েরা পরে নাচ-গানকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। সেই আমলে শান্তিনিকেতন উত্তরায়ণে একটা বারান্দাতে পর্দা দিয়ে দিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হত। টেবিলগুলো ছিল অদ্ভুত। প্রতি টেবিলে তিনটি চারটি করে থাক। প্রত্যেক থাকেই থাকত খাদ্য-পানীয়। উপরের থাকের খাবার খাওয়া হলে হাত দিয়ে সরিয়ে নিলে সেটা ঠেললে বেরিয়ে পড়বে খাবারসুদ্ধ পরের থালা। বনফুল মুগ্ধ হয়েছিলেন। 

রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে তো দুটিমাত্র রসস্রষ্টা আছে। প্রথম দ্বারিক, দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ যে তৃতীয় লোকের আবির্ভাব হল দেখছি।” এবার এলেন বনফুলের লেখার প্রসঙ্গে। বললেন, “তোমার লেখা পড়ে মনে হয় তুমি ঝাল খেতে বড়ো ভালোবাসো।” বলেই বনফুলকে লঙ্কা দেওয়া ঘুগনি খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন।

একবার সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বনফুল, অযোগ্য লেখককে সার্টিফিকেট কেন দেন রবীন্দ্রনাথ? রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন, “ওরকম দিতে হয়। আমি প্রার্থীকে পারতপক্ষে নিরাশ করি না। সাহিত্যের বিচারক মহাকাল। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশংসা বা নিন্দার কি কোনও মূল্য আছে?” বনফুলকে তিনি বলেছিলেন, “তুমি যখন লিখবে তখন মনে রেখো তুমি যা লিখছ তা জগতের শ্রেষ্ঠ রসিকশ্রেষ্ঠ পণ্ডিতেরা পড়বেন। তাঁদের জন্যই লিখবে। বাজে লোকের সস্তা চাহিদা মেটাবার জন্য যারা লেখে তারা কবি নয়, ব্যবসায়ী।” রোজ একসময়ে লিখতে বসতে বললেন। ওই সময়ই লেখা জোগাবে। ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান বেশি করে পড়তে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জমিতে যেমন সার দিতে হয়, মনেও তেমন সার দেবার জন্য। বনফুলও রবীন্দ্রনাথকে নিকট আত্মীয়ের মতোই মনে করতেন। অসংকোচে মনের কথা বলতেন। বনফুল শান্তিনিকেতনের (Shantiniketan) সহশিক্ষার প্রতিকূলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন শান্তিনিকেতনকে পুরোপুরি মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় করে দেওয়ার জন্য।

এছাড়াও বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা এবং শান্তিনিকেতনে বিদগ্ধ জনসমাবেশ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অন্তরায়। রবীন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিলেন, “তুমি তাহলে পরীক্ষার পড়াটাকেই জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে চাও?” বনফুলও বলেছিলেন যে, বাঙালি মধ্যবিত্ত ছেলেদের বাঁচতে হলে ডিগ্রি জোগাড় করতেই হবে। রবীন্দ্রনাথ মৃদু হেসে বনফুলকে বলেছিলেন, “বেশ তো, তুমি যা বলছ হাতে কলমে করিয়ে দেখিয়ে দাও। বিশ্বভারতী তো ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশন। —তুমি যা বলছ তা যদি করতে পারো তাহলে আমিও এখান থেকে চলে যাব, আমাকে যেখানে যেতে বলবে সেখানেই যাব।” আসলে তরুণ বয়স অনভিজ্ঞ স্পর্ধা নিয়ে আসে। তারপর জীবনের অভিজ্ঞতা পূর্ণকলসের নীরব স্বীকৃতি আনে। স্মৃতিচারণ করতে বসে বনফুল অন্যকথা বলেছিলেন, “সত্যিই Fools rush in where Angels fear tread গোছের ব্যাপার করে ফেলেছিলাম সেইদিন।” শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের সাহিত্যপাঠের আসরেও কঠোর সমালোচনা করেছিলেন বনফুল। রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনা ঘটতে পারে ভেবেই সুধাকান্তকে বলেছিলেন, “ওকে বলে দিও ছেলেমেয়েদের যেন বেশি না বকে।” কিন্তু এই কথা শোনার আগেই বনফুল স্পষ্ট উচ্চারণে ছেলেমেয়েদের বকে দিয়েছেন। 

এরপরেও বারবার বনফুল শান্তিনিকেতন ছুটে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের আন্তরিকতার টানে। কখনও চা পানের আসরে, কখনও মহড়াকক্ষে অচেনা রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করেছেন। পরস্পরের বই নিয়ে আলোচনা জমেছে। গভীর রাতে শুনেছেন রবীন্দ্রকণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত (Rabindra Sangeet)। বন্দেমাতরম গানটি জাতীয় সংগীত কেন হতে পারে না, এই নিয়েও ব্যক্তিগত মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— “আমাদের দেশে মুসলমানের সংখ্যা তো কম নয়, তারা দেশকে ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী বলে সম্বোধন করবে কী করে?” এই ছিলেন গভীর পরিণত রবীন্দ্রনাথ! আবার ইনিই ছেলেমানুষের মতো ভৃত্য বনমালীর দেওয়া গোলাপি রঙের পাগড়ির মতো রাজকীয় টুপি পরে ভরদুপুর পর্যন্ত লিখে চলেছেন। এই দুটি রূপই অন্তরঙ্গভাবে দেখেছেন বনফুল। বনফুলের লেখা পড়ে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে প্রকাশ করেছিলেন মুগ্ধতা। বনফুলকে বিজ্ঞানী মেজাজের সাহিত্যিক বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সমকালের চেয়ে সত্যিই বেশ আধুনিক ছিলেন বনফুল। রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে বনফুলের একটি মন্তব্য উল্লেখ করার মতো— “আপনার লেখায় অদ্ভুত বা বীভৎস রসের সন্ধান পাইনি। দেখা পেলাম আপনার ছবিগুলোতে। খুব ভালো লাগল।”

রবীন্দ্রনাথের দেওয়া হোমিওপ্যাথি ওষুধের প্রশংসা করেছিলেন বনফুল। পেশায় ডাক্তার হয়েও। আত্মা ও প্ল্যানচেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে দুজনের। বলেছিলেন, “আমার মনে হয় মৃত্যুর পর সব শেষ হয়ে যায় না। আমরা ছেলেবেলায় প্ল্যানচেট করতাম। স্পিরিট এলে প্ল্যানচেটে লেখা হয়ে যেত পেন্সিল দিয়ে।”

রবীন্দ্রনাথ বনফুলকে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন বৈকালিক জ্বর, শরীরের সত্যাগ্রহ আর গল্প লেখার কথা। সজনীকান্ত দাসের কাছে শেষসময়ও বনফুলের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বনফুলের আর যাওয়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে বনফুল লিখেছিলেন, “তাঁর বিরাট প্রতিভা, বিরাট ব্যক্তিত্ব, বিরাট হৃদয় — আমাকে কিছুক্ষণের জন্য স্পর্শ করেছিল। তিনি আমাকে আপনজনের মতো কাছে টেনে বসিয়েছিলেন, হাসিমুখে আমার আবোল তাবোল  প্রগলভতা সহ্য করেছিলেন। এই আনন্দের উজ্জ্বল বর্ণবিচিত্র স্মৃতি আমার মনে অক্ষয় হয়ে আছে কেবল। চিরকাল থাকবে।”

সহায়ক গ্রন্থ ও চিঠি সৌজন্যেঃ
রবীন্দ্রস্মৃতি, বনফুল, বাণীশিল্প প্রকাশন

Developed by DXDasia