“আজকের নারী/ চালায় টোটো গাড়ি” — বার্তা দিচ্ছেন শিলিগুড়ির মুনমুন সরকার

শুধু পেটের দায়ে না, সমাজের কথা ভেবেও টোটো চালান মুনমুন

শিলিগুড়ি কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালে এক বয়স্ক মহিলা করোনা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সেই মহিলা করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর কোভিড হাসপাতাল থেকে কীভাবে শিলিগুড়ির এক হোটেলে পৌঁছাবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। কোভিড নেগেটিভ হওয়ার পরেও তিনি কোভিড হাসপাতাল থেকে কোনও গাড়ি ভাড়া পাচ্ছিলেন না। করোনা হাসপাতালের রোগী সুস্থ হলেও তিনি অচ্ছুৎ, এরকম এক মানসিকতা কাজ করছিল। অথচ খবরটি পেয়েই শিলিগুড়ি শক্তিগড়ের বাসিন্দা মহিলা টোটো চালক মুনমুন সরকার সেই বয়স্ক মহিলাকে পৌঁছে দিলেন তাঁর গন্তব্যে। কোভিড হাসপাতাল থেকে শিলিগুড়ি বিধান রোডের এক হোটেলে কোভিড নেগেটিভকে পৌঁছে দেওয়ার পর কিন্তু মুনমুনদেবী একটি টাকাও ভাড়া নিলেন না। তাঁকে ভাড়া দিতে চাইলে মুনমুনদেবীর জবাব, “আমি শুধু পেটের দায়ে টোটো চালাই না। সমাজের কথাও ভাবি”। 

তাঁর এই মহানুভব কাজে হতবাক বয়স্ক কোভিড নেগেটিভের সাংবাদিক পুত্র চিত্রদীপ চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী পিয়াসি চক্রবর্তী। তাঁদের বক্তব্য, “করোনার নাম শুনলে যখন সেই করোনা আক্রান্তকে সবাই অচ্ছুৎ মনে করেন, সেখানে একজন মহিলা টোটো চালকের এরকম ভিন্ন ধর্মী মানসিকতা সত্যি স্যালুট জানানোর মতোই”। আর সেই টোটো চালক মুনমুনদেবী জানাচ্ছেন, “যে বয়স্ক মহিলাকে কোভিড হাসপাতাল থেকে বিধান রোডের হোটেলে পৌঁছে দিলাম তিনি তো নেগেটিভ ছিলেন, রাত একটাতেও যদি কোনও কোভিড পজিটিভ হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে ফোন করেন, তিনি সঙ্গে আছেন”।

রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর টোটোতে

করোনা দুর্যোগের সময় একটা অংশের মানুষ যখন করোনা আক্রান্তদের অচ্ছুৎ মনে করছেন তখন একজন মহিলা টোটো চালক কেন ওইরকম কুর্নিশ জানানোর মতো কাজ করছেন, প্রশ্ন করলে মুনমুনদেবী বলেন, যেটা চ্যালেঞ্জিং বা ঝুঁকি নেওয়ার কাজ সেটাই আমি ছোটো থেকে করতে ভালোবাসি। 

এই লকডাউন বা আনলক পর্বে তিনি আরও অনেক সামাজিক ও মানবিক কাজ করে চলেছেন। লকডাউনের সময় যখন হাসপাতালে রক্ত সংকট চলছে, তখন পুলিশের উদ্যোগে রক্তদান শিবির অনুষ্ঠিত হলে তিনি স্বেচ্ছায় রক্ত দান করেছেন। একবার নয়, বহু বহুবার। ইউনিক ফাউন্ডেশন টিম নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যা হিসাবেও তিনি রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর টোটোতে। 

৪৮ বছর বয়সী মুনমুন সরকার বছর ছয়েক আগে শুরু করেন এই টোটো চালানোর কাজ

বছর ছয়েক আগে তাঁর টোটো চালানো শুরু। প্রথম যখন টোটো চালাতে শুরু করেন তখন তাঁর স্বামী আপত্তি তোলেন। বলেন, টোটো চালানো, এ এক ছোটো কাজ, একাজ করা যাবে না। স্বামীর আপত্তি অগ্রাহ্য করেই টোটো চালিয়ে যেতে থাকেন মুনমুনদেবী। এক মাস তাঁর সঙ্গে স্বামী কথাই বলেননি। মুনমুনদেবী স্বামীকে বোঝান, কাজটা ছোটো নয়, মনটাকে বড়ো করে চলতে হয়। তিনি আসলে এই টোটো চালানোর মাধ্যমে তাঁর একটি আলাদা আইডেন্টিটি তৈরি করতে চান। আর সেই ব্যতিক্রমী আইডেন্টিটির জন্য তাঁর পরিশ্রম চলছে ধারাবাহিকভাবে। 

একদিন টোটো না চালালে তাঁর উনুনে হাড়ি চড়বে না তা কিন্তু নয়। কেননা স্বামী বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের কাজে যুক্ত, এক পুত্র স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি করেন তবুও তিনি টোটো নিয়ে আছেন। টোটোতে তিনি নিজের লেখা একটি ছোটো ছড়াও লিখে রেখেছেন, “আজকের নারী/ চালায় টোটো গাড়ি/ শিলিগুড়িতে বাড়ি/ দেখুন আমরাও পারি”।

৪৮ বছর বয়স্ক মুনমুন সরকার বছর ছয়েক আগে শুরু করেন এই টোটো চালানোর কাজ। তাঁকে দেখে পরবর্তীতে আরও কয়েকজন মহিলা টোটো চালানো শুরু করেন। কিন্তু ব্যতিক্রমী মুনমুনদেবী। কারণ, তাঁর কথায়, “টোটো চালিয়ে যা রোজগার হয় তার একটা অংশ দিয়ে সামাজিক কাজ করি। টোটো চালানোর রোজগার থেকে প্রতি বছর পুজো এলেই কাওয়াখালির বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাই। সেখানে বৃদ্ধবৃদ্ধাদের হাতে তুলে দিই নতুন বস্ত্র”। 

লকডাউন পর্বে বিনামূল্যে সবজি বিতরণ করছেন মুনমুন

ভোর পাঁচটা বাজলেই তিনি তাঁর শক্তিগড়ের ভাড়া বাড়ি থেকে টোটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সকাল আটটা পর্যন্ত শহরের এ গলি সে গলিতে টোটো চালিয়ে বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না, পুজোপাঠ। তারপর দুপুর বারোটায় আবার বেরিয়ে পড়া টোটো নিয়ে। বিকেল পাঁচটায় বাড়ি ফিরে আসা। তবে এখন লকডাউন বা আনলক চলতে থাকায় রোজগার একটু কমেছে। প্রতিদিন দুশো তিনশো টাকা। লকডাউনের আগে অবশ্য রোজগার অনেক বেশি ছিল। রোজগার এখন কমে গেলেও লকডাউনে কাজ হারানো অনেক হতদরিদ্র মানুষের হাতে উপহার হিসাবে ত্রান পৌঁছে দিয়ে আর এক নজির তৈরি করেছেন। শিলিগুড়ি পুরসভার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের পুর প্রতিনিধি বা কাউন্সিলর তাপস চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাজে খুশি হয়ে তাঁকে মাস্ক, গ্লাভস, অ্যাপ্রন উপহার হিসাবে তুলে দিয়েছেন। মুনমুনদেবীর ইচ্ছে, শিলিগুড়ি ইউনিক ফাউন্ডেশন টিমের অ্যাম্বুলেন্স চালু হলে সেই অ্যাম্বুলেন্স চালানোর দায়িত্ব গ্রহণ করা।

তবে এখন তাঁর স্বামী আর তাঁর টোটো চালানো নিয়ে আপত্তি তোলেন না। টোটো চালিয়েও যে সমাজে অন্যরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায় তার বিরাট উদাহরণ তিনি। গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন তাই একটি সংস্থা থেকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

ছবি : প্রতিবেদক

Developed by DXDasia