কুসংস্কার দূর করাই তাঁর আসল উদ্দেশ্য, কুসংস্কারের শুরু এই আকাশ থেকেই
মাঝেমধ্যেই টেলিস্কোপ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ডাঃ পার্থ প্রতিম। চলে যান চা বাগানের কোনও প্রত্যন্ত এলাকায় অথবা কোনও গ্রামের ভিতরে। তারপর বস্তির মানুষদের দেখাতে থাকেন আকাশ। আকাশে ভেসে বেড়ানো রহস্য চেনান তাদের। এ এক আলো দেখানোর রহস্য।
কিন্তু কেন হঠাৎ আকাশ দেখানো? ডাঃ পার্থ প্রতিম যুক্তি দিয়ে বলেন, “কুসংস্কার দূর করাই আসল উদ্দেশ্য। কুসংস্কারের শুরু এই আকাশ থেকেই। একসময় আকাশে বজ্রপাত কেন হয়, মেঘ কেন হয় এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানত না। আর সেই অজানা বিষয় থেকে জন্ম নিয়েছিল নানা দেবতা। জন্ম নেওয়া দেবতাদের পুজোপাঠ শুরু হয়। কিন্তু আসলে বিজ্ঞানটি কি, তা জানা প্রয়োজন”।
প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসীদের সুখ-দুঃখের সাথী এই ডাক্তার
ডুয়ার্সের বানারহাটের বাসিন্দা ডাঃ পার্থ প্রতিম এভাবেই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লাগাতার কাজ করে চলেছেন। পেশায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। কিন্তু তাঁর নেশা চা বাগানের আদিবাসী এলাকা, বস্তি বা গ্রামে গিয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার করা। শুধু আকাশ দেখিয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার করা নয়, আরও অনেক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি প্রচার করছেন। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধেও প্রচার করছেন। মুখে মাস্ক পড়ে থাকা, সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা যেমন বলছেন তেমনই রান্নার সঙ্গে কালোজিরে, গোলমরিচ, আদা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। আবার রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধির জন্য ব্যায়াম করা এবং বেশি বেশি করে হলুদ খাওয়ার কথাও বলছেন।
ডাঃ পার্থ প্রতিম তাঁর নামের পিছনে পদবী ব্যবহার করেন না। বলেন, পদবী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাচীন জাতপাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
রহস্য ভেদ করার চোখ সুদূর আকাশের দিকে
এখন তাঁর বয়স ৫৬ বছর অতিক্রম করেছে। ডাক্তারি পেশার সঙ্গে রয়েছেন ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা তথা বিজ্ঞান আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজও করে আসছেন বহু বছর ধরে। ছোটোবেলায় চা বাগান এলাকায় এক বন্ধুকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেন। লক্ষ্য করেন চা বাগান বস্তিতে কুসংস্কার। স্রেফ কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরার জন্য কত মানুষ মারা যাচ্ছেন। আর তখনই স্থির করেন, বড়ো হয়ে চিকিৎসা পেশা গ্রহণ করে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালাবেন। এখন সেই লড়াই-ই তাঁর চলছে।
ডুয়ার্স এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট রিভ্যালি সংস্থার মাধ্যমেও পনেরো-কুড়ি জন সদস্যকে নিয়ে তিনি সপ্তাহে দুদিন করে গ্রাম বস্তিতে গিয়ে বিজ্ঞান আন্দোলনের শিবির করছেন। অনেকেই তাঁকে বায়োস্কোপওয়ালা বলেও ডাকেন। ১৯৮১ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় বিজ্ঞান মেলায় তিনি তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ করে ওয়াটার টেলিস্কোপ প্রদর্শন করেছিলেন। সেই কাজের প্রশংসা করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এস বি চবন, শীলা দীক্ষিত প্রমুখ। ১৯৮৮ সালে তিনি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নিয়ে প্রশিক্ষণও নেন। ১৯৯১-১৯৯২ সালে সর্বভারতীয় বিজ্ঞান ক্লাবের মুখ্য আহ্বায়ক হিসাবে কাজ করেন। বিভিন্ন পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করে আসছেন। ২০০১ সালে কলকাতা বইমেলায় তাঁর লেখা বই প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল। স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে এই চিকিৎসক হাজারখানেক প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন। ডায়াবেটিস নিয়েও তাঁর একটি বই রয়েছে। ডুয়ার্সের চা বাগান আদিবাসী এলাকায় কিছু ট্র্যাডিশনাল ওষুধ রয়েছে। যেমন রক্ত আমাশয় হলে একরকম ঘাস পাতার মধ্যে চুন খয়ের মিশিয়ে খেয়ে থাকেন কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়। ভকৎ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যারা বংশ পরম্পরায় বিভিন্ন গাছের পাতা শিকড় খেয়ে থাকেন বিভিন্ন অসুখে। তাঁরা অবশ্য সেসব গাছের নাম বলতে পারেন না। এর ওপরই এবার কাজ করতে চান ডাঃ পার্থ প্রতিম।
১৯৯১-১৯৯২ সালে সর্বভারতীয় বিজ্ঞান ক্লাবের মুখ্য আহ্বায়ক হিসাবেও কাজ করেন
তবে জানালেন, করোনা নিয়ে এখন কিছু বিধিনিষেধ থাকায় গ্রাম বস্তিতে সেভাবে প্রজেক্টর নিয়ে প্রদর্শনী করা যাচ্ছে না। তবে করোনা বিদায় নিলেই আবার পুরোদমে শুরু হবে মহাকাশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক সব সচেতনতার প্রচার। যদিও এখন রোগী সাধারণের মধ্যে মুখে মুখে চলছে তাঁর কুসংস্কার বিরোধী প্রচার। বহু দুঃস্থ অসহায় রোগীকে তিনি বিনাপয়সাতেও দেখছেন। চেম্বার থেকে শুরু করে এদিকওদিকে রাস্তায় পায়চারির সময়ও এই বায়োস্কোপওয়ালার করোনা বিরোধী সচেতনতার প্রচারও চলছে। চলছে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রচারও।
ছবিঃ প্রতিবেদক।