
বিখ্যাত ‘হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেটের’ বয়স হল ১৬৫ বছর
লেবং কার্ট রোড ধরে খানিক এগোলেই একটা সরু পাহাড়ি রাস্তা। টি পি ব্যানার্জি রোড। চকবাজার থেকে লোচনাগর রোডও এসে মিশেছে এখানেই। সেই সাপের মতো রাস্তা বেয়ে খাড়া নামলেই দিগন্ত-বিস্তৃত চা-বাগান। নয় নয় করেও ১৬৫ বছর বয়স হল তার। দার্জিলিঙের দ্বিতীয় প্রাচীনতম চা-বাগান। বুড়ো হলেও নিজের মান আজো টাল খেতে দেয়নি ‘হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট’। এই বাগানের হাতমলাই চা পাড়ি দেয় বিলেতে, ফ্রান্সে ও অন্যত্র। ৬,৯০০ ফুট উঁচুতে পৃথিবীর অন্যতম উঁচু এই ‘সুখী’ টি-ফ্যাক্টরির গপ্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দার্জিলিং শহরের অনেক ইতিহাস। আর, এই বাগানকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে আছে পূর্ব-হিমালয়ের অপার সৌন্দর্য।
১৮৩৫ সালে অসুস্থ ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য স্বাস্থ্যনিবাস গড়বে বলে সিকিমরাজের থেকে দানপত্র করে দার্জিলিং চেয়ে নিল ব্রিটিশরা। ২৪ মাইল লম্বা ও প্রায় ৬ মাইল চওড়া অঞ্চল তখন কুমারী অরণ্যে ভরা। ক্রিপ্টোমারিয়া জাপানিকা নামের ভিনদেশি পাইন (কেউ কেউ বলেন ধুপি) গাছের প্রজাতিতে গোটা পাহাড় ছেয়ে যায়নি। সেখানে তখনো দাঁড়িয়ে ওক, বার্চ, ম্যাগনোলিয়ার সারি। ক্রমে শুরু হল শহর গড়ার কাজ। পাহাড়ের ঢাল, আবহাওয়া আর মাটি সবটাই চা-চাষের জন্য অনুকূল বুঝে টি প্লান্টার্সদের আনাগোনাও শুরু হল। ১৮৫২ সালে দার্জিলিঙের প্রাচীনতম টি-ফ্যাক্টরি স্টেইনথাল টি এস্টেটের প্রতিষ্ঠা। এর ঠিক দু’বছর পরেই উইলসন সাহেব প্রতিষ্ঠা করলেন এই চা-বাগান। তখন অবশ্য নামের দিক থেকে ‘সুখী’ ছিল না এই বাগান। ডেভিড উইলসন নিজের নামেই বাগানের নাম দিলেন উইলসন টি এস্টেট। ১৮৬০ সাল থেকে শুরু হল চা উৎপাদন। ইতিমধ্যে ১৮৫৭ সাল থেকেই কার্শিয়াঙের মকাইবাড়িতেও পোঁতা হয়েছে চা গাছের বীজ। ক্রমে উত্তরবঙ্গের এই গোটা পার্বত্য অঞ্চলের ল্যান্ডস্কেপটাই বদলাতে শুরু করবে। পাহাড়ের ঢালে থইথই করবে কোঁকড়া চুলের চা-গাছ। এই পাহাড়ের নিজস্ব গড়ন, গাছপালা, নিসর্গের ইতিহাস বিগত হয়ে যাবে। সেইসব গপ্পেরা বাগানের নামের মতো আদ্যন্ত সুখী নয় অবশ্য।

বাগানের নাম ‘হ্যাপি ভ্যালি’ হওয়ার মূলে একজন অভিজাত বঙ্গসন্তান। হুগলি জেলার তারাপদ ব্যানার্জি ১৯০৩ সালে মোটা টাকায় কিনে নিলেন এই চা-বাগান। এই ঘটনা পরাধীন ভারতের শিল্পোদ্যোগের ইতিহাসে নেহাত সাদামাটা ব্যাপার নয়। পাহাড় জুড়ে তখন একাধিক চা-বাগানেই মালিকানার হাতবদল হচ্ছে। কালো চামড়ার ধনী বাঙালি-বাবুরাও চা-বাগানের মালিক হচ্ছেন। সেইসব দেশি বাবুদের মধ্যে সবচাইতে উঁচু জায়গাটি দখল করে বসলেন তারাপদ ব্যানার্জি। খোদ শৈলরানির বুকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচ্চতায় চা-বাগানের মালিক হওয়া কী মুখের কথা! বাগান রমরম করেই চলছিল। ১৯২৯ সালে পাশের উইন্ডসর টি এস্টেটও কিনে নিলেন তারাপদ ব্যানার্জি। তারপর বাগানদুটিকে একসঙ্গে জুড়ে দিলেন। ব্যবসার পালে হাওয়া লাগল আরো জোরে। বাগানের চায়ের সুখ্যাতিও তখন দেশজুড়ে। খুশি-মনে বাগানের নামটাই বদলে দিলেন তারাপদ ব্যানার্জি—‘হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট’।
এই তারাপদ ব্যানার্জির নামেই টি পি ব্যানার্জি রোডের নামকরণ হয়েছে পরে। বাগানের মালিকানাও বদলেছে একাধিকবার। পরবর্তী মালিক জিসি ব্যানার্জির স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী ছিলেন খান্ডোয়ার বিখ্যাত গাঙ্গুলি পরিবারের সন্তান। অশোককুমার, কিশোরকুমারের বাবা কুঞ্জলাল বিহারী সম্পর্কে অন্নপূর্ণা দেবীর মামা। তিন মেয়েকে নিয়ে সপরিবারে দীর্ঘদিন দার্জিলিঙেই থাকতেন জিসি ব্যানার্জি এবং অন্নপূর্ণা দেবী। তখনো হ্যাপি ভ্যালি-র চা বিখ্যাত। চায়ের স্বাদের সঙ্গে উপরি পাওনা বাগানের সৌন্দর্য। দার্জিলিঙে এলে পর্যটকরা একবার ঢুঁ মারতেনই এই বাগানে।

সত্যিই দার্জিলিঙের অন্যতম সেরা ভিউ পয়েন্ট বলা চলে ৪৪০ একর জুড়ে বিছোনো এই চা-বাগানকে। হ্যাপি ভ্যালি চা-বাগানের পশ্চিমে পাহাড়ের সারি, ডানদিকে সিকিম ও নেপাল, দূর থেকে উঁকি মারে কালচে-সবুজ সান্দাকফুর পাহাড়। মাঝে মাঝে মেঘ আর কুয়াশা এসে জিরোয় বাগানের মাঝে, ঝকঝকে রোদে চিকচিক করে চা-পাত্র কুঁড়ি। সেইসব দৃশ্যের মোহর রোজ সযত্নে কুড়িয়ে রাখে এই বাগান।
আরো পড়ুন
চা-বাগানে কয়েকদিন
পাহাড়ে মেঘ আসে, মেঘ কেটে যায়। বর্ষার পরে আকাশ জুড়ে শুয়ে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর মানুষদের হাতে সময়টা অন্য নিয়মে ভাঙে-গড়ে, অস্থির হয়। গোর্খাল্যান্ডের দাবি, বিক্ষোভ, ধর্মঘট। চা-ব্যবসাতেও সেই আগুনের আঁচ লাগে। দোকানের মালিকানা ফের বদলায়। ২০০৭ সালে অম্বুটিয়া টি গ্রুপের মালিক এস কে বনসল কিনে নেন এই ঐতিহাসিক চা-বাগান। তারপর শুরু হয় ফ্যাক্টরির আধুনিকীকরণের কাজ। পুরোনো ফ্যাক্টরি, তার সেই আদ্যিকালের পরিকাঠামো বিগত হয়ে যায়। সাহেবদের মতোই বিগত, দার্জিলিঙের পাহাড়ের আদি গড়নের মতোই অতীত। তবে, নতুন মালিক নির্দয় নন। সেই পুরোনো ফ্যাক্টরিকে পরিণত করা হল মিউজিয়ামে। সেখানে সাজিয়ে রাখা এক পিস্টনের কম গতির লজঝড়ে যন্ত্র-সহ সাবেককালের অনেককিছুই। পর্যটকরা এখন ভিড় জমান বাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি চা-উৎপাদনের প্রক্রিয়া দেখতেও। গাইড ঝরঝরে ইংরেজি-হিন্দিতে বুঝিয়ে দিতে থাকেন আগের যন্ত্র কতখানি কমজোরি, নতুন প্রযুক্তি কত্ত ভালো ইত্যাদি। কাঁচের আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখা যায় চা-পাতার লেবেলিং-এর কাজ। অরগ্যানিক চা-চাষ শুরু হয়েছে নতুন মালিকানার আমলে। তার বাজার বেশ চড়া। হোয়াইট টি, গ্রিন টি, ব্ল্যাক টি। সেইসব চেখে দেখে কেনার বন্দোবস্তও আছে। ‘স্পেশাল ডিসকাউন্টে’ অবশ্যই। যে চা বিলেত যায়, তা কেনার সুযোগ সহজে হারাতে চান না পর্যটকদের অনেকেই। মার্চ থেকে মে অবধি চা-বাণিজ্যের মূল মরশুম। যাবতীয় রপ্তানিও সারা হয় এই সময়েই।

আর পর্যটকদের ঢল, মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির বাইরে বিছিয়ে থাকে প্রাচীন এই বাগান। যার কোনো কোনো চা-গাছের বয়স দেড়শো বছরেরও বেশি। বিগত আশি বছরে খুব সামান্যই নতুন অতিথি-চারা দেখেছে এই বাগান। বয়স বাড়লেও এইসব গাছের পাতায় এখনো জড়ো হয় হিমালয়ের নিজস্ব উর্বরতার স্বাদ। নতুন গাছেরা পাছে সেই মানের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, বাড়তি সাহস দেখাতে চাননি কোনো মালিকই। পুরোনো গাছে আজো নতুন কুঁড়ি আসে, তার নিচে দু’হাত মেলা দুটি ছোটো পাতা। তাদের আজো স্বাদে কোনো খাদ মেশেনি। সবটাই হু-হা বদলাচ্ছে, দার্জিলিঙে থিকথিকে ভিড়, পাহাড় জুড়ে হোটেল আর বাড়ি। কিন্তু এই বাগানের নিজের গপ্পগুলো আজো একই তারে বাজছে। শুনতে যাবেন নাকি?
ছবি: উইকিপিডিয়া, অনিতেশ চক্রবর্তী।
