একসময় স্টেশন চত্বরে রোদ পোহাত বাঘ, ডেরা বাঁধত চিতা
কার্শিয়াং, টুং, সোনাদা, ঘুম পেরিয়ে ছোট্ট রেলগাড়িটা ছুটছে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। ওই যে পাহাড়ের গায়ে সারি সারি খেলনাবাড়ি। দার্জিলিং শহর। আর এই রেলগাড়িকে দেখেও তো মনে হয় ঠিক যেন খেলনা। অথচ, পাহাড়ে চড়তে গেলে এমন ছোটোখাটো চেহারাই যে লাগে, তা দিব্বি বুঝেছিল ব্রিটিশরা। শিলিগুড়িতে মাত্র ৪০০ ফুট উচ্চতা থেকে হিমালয়ের শৈলশিরা বেয়ে বেয়ে তাকে চড়তে হবে ঘুমের ৭,৪০৭ ফুট উচ্চতায়। তারপর খানিক নেমে দার্জিলিং। পাহাড়ি পথে বাঁকও নিতে হবে। ভারী চেহারা হলে সে উঠবে কী করে এত্তখানি! অতএব, জন্ম থেকেই সে ছোট্টটি আর হালকা। আর, এই ছোট্ট রেলগাড়ি ঘিরেই কত বিস্ময়, রোমান্সের ইতিকথা। সেখানে পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলে পূর্তবিদ্যা, মুগ্ধতার সঙ্গে আলাপ জমায় ঔপনিবেশিক ইতিহাস। সাধে কি ইউনেসকো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমা লাগিয়েছে এই রেলগাড়ির গায়ে।
১৮৩৫ সালে সিকিম রাজার কাছ থেকে দানপত্র করে দার্জিলিং আদায় করল ব্রিটিশরা। দার্জিলিং তখন বনে ঘেরা লুকোনো স্বর্গ। মাত্র কয়েক ঘর লেপচাদের বাস। গরমে পোড়া দেশে সাহেবদের কাছে একটা স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে হাজির হয়েছিল সুন্দরী দার্জিলিং। অসুস্থ ব্রিটিশ সেনাদের জন্য স্বাস্থ্যনিবাস গড়ার ইচ্ছেটি অচিরেই বদলে গেল শৈলশহর পত্তনের বড়ো পরিকল্পনায়। শুরু হল কাজ। পাহাড়ের নিচের অংশ থেকে কালো-কালো শ্রমিকদের নিয়ে এসে হিল কার্ট রোড তৈরি হল। পথে থাকার জায়গা নেই, ফলে বৃষ্টিতে, ঠান্ডায় দলে দলে মারাও গেল নেটিভ শ্রমিকরা। তাতে কি আর শহর গড়ার রঙে কোনো আঁচড় পড়ে। শহর বাড়তে শুরু করল। চার্চ, স্কুল, গোরস্থান, জেলখানা। ইতিমধ্যে মকাইবাড়িতে চালু হয়ে গেছে চা বাগানও। সাহেব-মেমরা ‘হোম ওয়েদার’-এর খোঁজে প্রায়ই পাড়ি জমাচ্ছে দার্জিলিঙে। আর, যাতায়াত আর মালপত্তর সহজে তোলার জন্যই প্রয়োজন পড়ছে রেলপথের।

কিন্তু, হিমালয়ের এত উঁচুতে রেলপথ কীভাবে হবে? অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক হল পাতা হবে ন্যারোগেজ লাইন। ১৮৭৯-তে দার্জিলিং স্টিম ট্রামওয়ে কোম্পানি হিলকার্ট রোড বরাবর রেললাইন পাতার কাজ শুরু করে দিল। ৮টি বাষ্পচালিত ইঞ্জিন এল ম্যাঞ্চেস্টার থেকে। এরপর, ১৮৮১ সালের ৩ জুলাই পাহাড়ের গা বেয়ে দুলকি চালে ঝমঝম শব্দে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উঠে এল রেলগাড়ি। কোম্পানির নাম ততদিনে বদলে হয়েছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কোম্পানি।
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ৫১ মাইল পথের গোটাটা জুড়েই বিস্ময় ছড়ানো। মোট তেরোটি স্টেশন। পাহাড়ি পথে ঘণ্টায় ১০ মাইলের বেশি গতিবেগ সম্ভব না। ডানদিকে পাহাড়ের গায়ে মস ও ফার্ন চাইলেই যেন ছোঁয়া যায়। গাছ-গাছালির পাতা ঢুকে আসে কামরার ভিতরেও। বাঁদিকে খাদ। জঙ্গলের প্রকৃতি বদলে বদলে যায় দ্রুত। আসলে এই ৫১ কিমি পথে সাত হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় উঠে যায় তো এই খেলনা গাড়ি, ফলে পথের শোভা বদলায় বারবার। শালের জঙ্গল শুকনা থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়ে যায় ১৪০০ ফুট উচ্চতায় স্টেশন রংটঙের আগেই। চারপাশে তখন টুনের জঙ্গল। এই টুন গাছের নামেই ‘টুং’ স্টেশনের নামটি এসেছে। এরপর মেপল, অল্ডার, পিপলি, বার্চ, চেস্টনাট, ওকে, ম্যাগনোলিয়া গাছের ছায়া। ব্রিটিশরা পরে অবশ্য এই পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপই বদলে দেবে জাপান থেকে আমদানি করা ক্রিপ্টোমেরিয়া পাইন পুঁতে। পথের জঙ্গল সাফ হয়ে ক্রমে গজিয়ে উঠবে মানুষের বস্তি। কার্শিয়াং থেকেই পাহাড়ের গায়ে দেখা মিলবে চা-বাগান। আর, এইসব ছুঁয়ে-ছুঁয়েই হেলেদুলে পাহাড়ে উঠবে টয়ট্রেন।
এই রেললাইনের দু’পাশের জঙ্গলটি কিন্তু নেহাত নিরীহ ছিল না। শুকনা তো তরাইয়ের বন। সেখানে বুনো শুয়োর, ভাল্লুক, হাতি, লেপার্ড, বাঘ ছিল দেদার। ১৯০০ সালে এক শীতের সকালে শুকনা স্টেশনে টিকিটঘরের সামনে নাকি রোদ পোহাচ্ছিল একটি বিরাট রয়াল বেঙ্গল টাইগার। তার বছর পনেরো পরেই ট্রেনের শব্দে ঘুম ভাঙায় কালভার্টের তলা থেকে ট্রেনের দিকে তেড়ে আসে আরো একটি অতিকায় বাঘ। এছাড়া প্রায়ই হাতিরা আটকে দিত ট্রেন। সভ্য সাদা চামড়ার মানুষদের এই অনুপ্রবেশ তারা সহজে মেনে নেয়নি।

আর ছিল লেপার্ড। রংটং থেকে মাইল দুয়েক দূরে রেলপথের দ্বিতীয় লুপ বা গিঁটটির আশেপাশেই ছিল চিতাবাঘের রাজত্ব। চিতাবাঘ ধরার জন্য খাঁচা পেতেছিল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট। সেখানে ধরা পড়েছিল ষাটটিরও বেশি চিতাবাঘ। তারা কেউই আর বনে ফিরতে পারে নি, বলাই বাহুল্য। সভ্য শিকারিদের সহজ টার্গেট হয়ে জায়গা করে নিয়েছিল একাধিক চা-বাংলোর দেয়ালে ও অন্যত্র।
এই রংটঙের পর তৃতীয় লুপ পেরোলেই চুনাভাট্টি। দার্জিলিং-কার্শিয়াঙের বিলিতি স্থাপত্যের বাড়িগুলি তৈরির জন্য চুনের যোগান দিয়েছিল এই অঞ্চলই। এর খানিক পরেই শুরু হচ্ছে বিখ্যাত সব রিভার্স। খানিকটা পিছিয়ে, যেন অনেকটা শ্বাস ভরে নিয়ে ফের প্রবল ধোঁয়া ছেড়ে অনেকটা উঠে যাওয়া। এই রিভার্স তৈরির আড়ালে মজার গল্প আছে একটা। শোনা যায়, স্থপতি সাহেব নাকি কিছুতেই হদিশ পাচ্ছিলেন না কীভাবে ট্রেনকে এতখানি চড়াইতে তুলবেন। গোটা নকশাটাই বাতিলের পরিস্থিতি তখন। এমন সময় তাঁকে উপায় বাতলে দিলেন তাঁর স্ত্রী। বলড্যান্সের সময় যেমন হলঘরের কোণা থেকে এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে ঘুরে যাওয়া হয়, রেলগাড়ির ক্ষেত্রে সেইটা হবে না কেন? ব্যাস, আলো এসে পড়ল স্থপতির মগজেও। চালু হল রিভার্স।

আর এইসব রিভার্স, বাঁক, জঙ্গলের পথ বেয়ে তিনধারিয়া, গয়াবাড়ি, মহানদী পেরিয়ে ট্রেন উঠে এল কার্শিয়াঙে। ব্রিটিশ আমলে এখানেই ব্যবস্থা থাকত ঢালাও ব্রেকফাস্টের। শুরুতে ক্ল্যারেনডন হোটেলের পাশেই ছিল কার্শিয়াং স্টেশন। ১৮৯৬-তে জায়গা বদল হয় তার। আকাশের গায়ে টাঙানো কাঞ্চনজঙ্ঘা আরো স্পষ্ট এইখান থেকে। কার্শিয়াং শহরের ভিতর দিয়ে ছুটছে রেলগাড়ি। দু’পাশে বাজার, মানুষের ভিড়। ট্রেন ছোটো ছোটো বাড়ির এক্কেবারে উঠোন দিয়ে চলে যাচ্ছে যেন। চলন্ত ট্রেন থেকেই দৌড়ে নেমে যাচ্ছে কোনো কোনো সাহসী মানুষ। হাত নাড়ছে কচি-কাঁচারা। খেলনাবাড়ির বারান্দায় প্লাস্টিকের টবে ছোটো-ছোটো গাছ, ফুল। একটা লোমবাহারি কুকুর লোম পোহাচ্ছে। বাঘেদের রোদ পোহানোর দিন তো বিগত। এখন গৃহপালিতরাই…
এরপর কুয়াশা, মেঘ, রোদ কাটিয়ে আসবে ঘুম। বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা—পৃথিবীর উচ্চতম স্টেশন। তাকে বের দিয়ে বাঁদিকের রাস্তা চলে যাবে লেপচাজগৎ, সীমানা ছুঁয়ে মিরিকের দিকে, ডানদিকে শৈলশিরা বরাবর এগোলেই দার্জিলিং। মুগ্ধতার শেষ ঠিকানা।

রেলগাড়ি যেখানেই ঢুকেছে বদলে দিয়েছে জনজীবন। আর সেই রেলগাড়ি যদি এমন খেলনাগাড়ির মতো ঝমাঝম হয়, তাহলে তো অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যায় আদুরে আহ্লাদও। আবার, এই রেলপথের স্পর্শ পায়নি বলেই ক্রমে কোণঠাসা হয়ে গেছে কোনো কোনো অঞ্চল। যেমন সোনাদা ছাড়িয়ে কয়েকশো ফুট নিচে মার্গারেট চা-বাগান লাগোয়া ‘হোপটাউন’। কার্শিয়াং নয়, দার্জিলিঙের পথে বড়ো শৈলশহর প্রতিষ্ঠার কথা ছিল এখানেই। ঠিক ছিল জলপাইগুড়ি থেকে ন্যারোগেজের লাইন আদলাপুর, পানিঘাটা হয়ে আসবে এখানেই, তারপর যাবে দার্জিলিং। সেইমতো অনেক সাহেব এখানে ঘর-বাড়ি বানান, গড়ে ওঠে সেন্ট জন্স গির্জা। কিন্তু, ট্রেন আর আসেনি। আশাভঙ্গ হয়ে নামকরণের অবান্তর রসিকতা নিয়ে প্রান্তিক হয়ে থেকেছে এই হোপটাউন।
কালিম্পঙের দিকে টয়ট্রেনের আরেকটি লাইনও চালু হয়েছিল ১৯১৫-তে। শিলিগুড়ি, বৈকুন্ঠপুর পেরিয়ে সেভকের গা ছমছমে বনপথধরে সেই গাড়ি তিস্তা পেরোত। তারপর গিয়ে থামত কালিম্পঙের নিচে গেইলখলা অবধি। রবীন্দ্রনাথ মংপু যাওয়ার পথে এই রেলপথ ব্যবহার করেছেন। এই রেলপথের নাম ছিল ‘তিস্তা ভ্যালি এক্সটেনশন’। রুমের গডেনের ‘রংলি রংলিওট’-এ এই রেলপথের এক অসামান্য বর্ণনা পাওয়া যায়। অ্যামিউজমেন্ট পার্কের ট্রেনগুলোর মতো দেখতে একটা ট্রেন, ইঞ্জিনটা পালংশাকের মতো সবুজ, উঁচু চোং, মাথাটা সমান করে কাটা। একজন কুলি ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে, মাঝে-মাঝে গাড়ি থেকে নেমে সে হাঁটছে। নিচে সবুজ তিস্তার জল। বর্ষায় এই নদী হিংস্র। বন্যায় ভয়ংকর।
১৯৫০-এর বন্যাতেই দাঁড়ি পড়ে কালিম্পংগামী এই রেলযাত্রার। কিন্তু, বারবার কমা-সেমিকোলনের পরেও দার্জিলিং-গামী রেলপথ বন্ধ হয়নি এখনো। কখনো রাস্তায় ধস, কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা রেলযাত্রা স্থগিত করেছে। এত সময়সাপেক্ষ যাত্রায় যাত্রীও কমেছে স্বাভাবিক নিয়মে। অলাভজনক হয়েছে বিস্ময়ের রেলগাড়ি। ক্রমে প্রয়োজন হারিয়ে কেবলি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে সে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের বদলে এসেছে আধুনিক ইঞ্জিন, বাতানুকুল কামরা। এসেছে জয় রাইড। বাতাসিয়া লুপ বের দিয়ে হইহই, ফটোশুট। সেই তরাই নেই, বনপথ নেই, কুমারি ল্যান্ডস্কেপ নেই, সেই সাহেবি কেতার দার্জিলিং-ও নেই। কিছুই স্থায়ী নয় সভ্যতায়। আর স্থায়ী নয় বলেই এত মায়া বিগতর প্রতি। খেলনা রেলগাড়ি যদিও বিগত নয়, তবু…
সে যদি কোনোদিন চিরতরে পাহাড় চড়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে অনেক গল্পদেরও নেমে আসতে হবে পাহাড় থেকে। আমরা তখন মোটেই বলতে পারব না—“যা গেছে, তা যাক।”
তথ্যঋণ: দার্জিলিং, স্মৃতি সমাজ ইতিহাস, পরিমল ভটাচার্য, বনজঙ্গল ও অন্যান্য, সৌমিত্র ঘোষ।
ছবি: উইকিপিডিয়া