সেই টাকা তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন করোনা মোকাবিলায় এবং আমফান দুর্গতের জন্য গঠিত নানা ত্রাণ তহবিলে
খারাপ সময় যখন আসে একা আসে না। প্রথমে এসেছে মারণ ভাইরাস করোনা আর তারপর এল আমফানের ভয়ংকর ধ্বংসলীলা। চারিদিকে শুধুই হাহাকার আর ধ্বংস। দুই চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, পূর্ব মেদিনীপুর থেকে শুরু করে সুন্দরবন বা কলকাতার কলেজ স্ট্রিট — গোটা পশ্চিমবঙ্গ বিপর্যস্ত। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কিছুটা হলেও সেইসব ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেয়েছেন শহরবাসী। চারপাশের এই এত খারাপ খবরের মধ্যেও কিছু খবর থাকে যা একটু হলেও আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে আশার আলোটাকে নিভতে দেয় না। এই লকডাউনের মাঝে সেরকমই এক সুখবর দিচ্ছেন অভীক অর্জুন দত্ত। সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় নিজের বিভিন্ন লেখা ফেসবুকে বিক্রি করে এখনো পর্যন্ত পাঁচ লাখ টাকার বেশি অর্থ তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং তার সমস্তটাই দিয়েছেন বিভিন্ন ত্রাণ তহবিলে। করোনা মোকাবিলায় গঠিত তহবিল থেকে শুরু করে আমফান দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো হোক, কিংবা বইপাড়া বা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাঁদের প্রয়োজন মতো টাকা তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন সেই মানুষগুলোর কাছে।
কিন্তু কীভাবে এই আসাধ্যকে সাধন করলেন অভীক! তাঁর নিজের কথায়, “লকডাউন শুরুর সময় থেকেই ভাবছিলাম কীভাবে আমার সামর্থ্য মতো মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারি। সেইমতোই প্রাথমিকভাবে কিছু লেখা ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রির কথা ভাবি। তবে মানুষের যে এত সাহায্য পারব তা কখনোই ভাবতে পারিনি। অনেকটা টাকা থেকে কিছুটা টাকা দিয়ে ‘চ্যারিটি’ করা আর সর্বস্ব দেওয়ার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকে। যারা এভাবে এগিয়ে এসেছেন আমার ডাকে সাড়া দিয়ে, আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই”। পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অভীক অর্জুন দত্ত কয়েক বছর ধরেই লেখালিখির জগতে এক পরিচিত নাম। তাঁর লেখা এবং সেলফ পাবলিশ করা বইগুলির পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাঁর কাজের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট। ফলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মহৎ উদ্দেশ্যে হাতিয়ার হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছেন পেন থুড়ি, কি-বোর্ডকেই। এই প্রতিবেদন লেখা অবধি বিভিন্ন ত্রাণ তহবিল মিলিয়ে তাঁর মোট দেওয়া অনুদানের অঙ্ক হল প্রায় পাঁচ লাখ ছত্রিশ হাজার টাকা।

ত্রাণের কাজে বিক্রির জন্যে ৫-৬টি বই তিনি লিখেছেন। ১ জুলাই আসছে আরো একটি নতুন উপন্যাস ‘অতল হ্রদের রহস্য’, যার প্রি-বুকিং চলছে এখন থেকেই। ত্রাণ সংগ্রহের জন্য এটিই হতে চলেছে তাঁর শেষ লেখা। বইগুলির প্রচার এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসাবেও তিনি ব্যবহার করছেন সোশ্যাল মিডিয়াকেই। নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে বইগুলির নাম এবং দাম দেওয়া থাকছে, সেখান থেকেই পাঠক-পাঠিকারা নিজের পছন্দমতো বই কিনে নিতে পারেন অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে। টাকা দেওয়ার পর, সেই পেমেন্টের প্রমাণ একটি নির্দিষ্ট মেল আইডিতে পাঠিয়ে দিলেই হাতেগরম মিলে যাচ্ছে বই। এছাড়া কিছু লেখা বিনামূল্যেও পড়তে পারা যাবে তাঁর প্রোফাইলে, আর তা পড়ে ভালো লাগলে নিজের সামর্থ্যমতো টাকাও পাঠক তুলে দিতে পারেন অভীকের ত্রাণ তহবিলে। ফান্ডে সাহায্য করতে চান অথচ বেশি টাকা দিয়ে অন্য বইগুলি কিনতে অপারগ, এমন অনেকের কথা মাথায় রেখেই এক্ষেত্রে দামের কোনো নিম্নসীমা লেখক রাখেননি। তাঁর দুটি ফেসবুক গ্রুপও আছে লেখালিখি বিষয়ক, যেগুলিতে জয়েনিং ফি স্বরূপ একটি নির্দিষ্ট টাকা দিতে হচ্ছে, সেটিও চলে যাচ্ছে বিভিন্ন ত্রাণকার্যে।
আর এই বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ এক হাতেই সামলাচ্ছেন এই তরুন তুর্কি। গত পাঁচ বছরে লেখা প্রায় সব বইয়ের পিডিএফই ব্যবহার করছেন ফান্ড গঠনের কাজে। সব মিলিয়ে ২৯টি বইয়ের পিডিএফ করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে আর সেটা লেখক নিজেই ছাড়ছেন, যেখানে পিডিএফ বেরনো মানে সে বই আর বিক্রি হবে না। মোবাইলে মোবাইলে এমনিই ঘুরতে পারে। তবুও মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখে সেই সাহসটাই দেখাচ্ছেন অভীক দত্ত। তাঁর কথায়, “আমি এসব ভাবিইনি। পাঠককে ভরসা করেছিলাম। তাঁরাই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। শেষের দিকে একেক দিনেই পঞ্চাশ হাজার টাকার মাইলস্টোন পেরিয়েছি”। তবে এখানেই থামতে চান না তিনি, প্রথম লক্ষ্যপূরণ হলেও মানুষের দুর্দশা তো কমেনি। ফলে তাঁর পরবর্তী টার্গেট এই তহবিলকে দশ লাখ টাকার তহবিলে পরিণত করা, যাতে আরো বেশি করে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যায়। অভীক বলছেন, “আমার পিডিএফ থেকে যা আসবে আমি ত্রাণে পাঠাব। আমার দেশের নাগরিক, আমার সহ-নাগরিকদের জন্য এটা আমি করতেই পারি”। আর এভাবেই নির্ভীকভাবে এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নের জার্নিতে।

অভীক অর্জুন দত্ত থাকেন অশোকনগরে। নিজের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা না থাকলেও, পরিবারের চাপে সেটাই পড়েছেন বাধ্য হয়ে। কলেজ পালিয়ে কলকাতা ঘুরেছেন দেদার। ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় খাতায় বাড়ি, কলা পাতা, নৌকা, পিছনে সূর্য উঁকি দিচ্ছে এসব ছবি এঁকে এসেছিলেন। এভাবেই না পড়তে চাইতে চেয়েও পড়েছেন, তারপর যোগ দিয়েছেন চাকরিতেও। আর চাকরি থেকে ফিরে সারাদিনের ক্লান্তিকে দূরে সরিয়ে রেখে শুরু করেছেন লেখালিখি। সেই ছেলেই আজ শুধুমাত্র লিখে পাঁচ লাখ টাকা তুলে দিলেন। আমাদের অনুপ্রেরণা তো অভীকরাই, তাই চাইলে আপনারাও সাধ্যমতো টাকা তুলে দিতে পারেন ওঁর ফান্ডে, পাশে দাঁড়াতে পারেন এমন কিছু মানুষের, যাঁদের দরকার এখন সর্বোচ্চ। আজ নয়তো কাল এই সংকট নিশ্চয়ই কেটে যাবে, তবে এই উদ্যোগগুলি যে মানবতার ইতিহাসে পাকাপাকিভাবে থেকে যাবে একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। আর একথাও বলা যায়না কি,“আজ ভেঙে যাব, কাল জুড়ে যাব/ তবু ভাঙতে-জুড়তে চলেছি”!
ঋণ – সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গণসংগীত
ছবি সৌজন্যে – অভীক অর্জুন দত্ত