সন্তানের জন্মদিনে সংকল্প, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ালেন শিলিগুড়ির বাপন ঘোষ

লকডাউন পর্বে প্রতিদিনই বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বাপন

অল্প রোজগার থেকে আরও রোজগার। দাও, আরও দাও কিংবা চাই, আরও চাইয়ের মানসিকতায় ছুটে চলেছেন অনেকে। টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে রোজগার আর রোজগারের জেরে বহু মানুষ টাকার বিছানাতেও ঘুমোন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, এ জীবন আজ আছে কাল নেই। টাকা সব একদিন পড়ে থাকবে। তাই অর্থের সদ্ব্যবহারের কথা অনেক বিদ্বজন বলে থাকেন। কিন্তু সেসব বিদ্বজনদের কথায় কান নেই তথাকথিত অনেক অর্থবানদের। আবার বহু ব্যতিক্রমও আছে। শিলিগুড়িতে অন্তত করোনা লকডাউন পর্বে এক তরুণ অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে এননই এক নজির তৈরি করলেন। 

বাপন ঘোষ। লকডাউন পর্বে নিজের অর্থ থেকে এককভাবে পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে দুঃস্থদের মধ্যে উপহার ত্রাণ বিলির মাধ্যমে নজির তৈরি করেছেন গোটা উত্তরবঙ্গে। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট থেকে এসিপি রাজেন ছেত্রী-সহ অন্যান্য পুলিশকর্মীরা তাই ব্যতিক্রমী সামাজিক কাজের জন্য বাপনকে সংবর্ধনাও দিয়েছেন। 

এককভাবে পাঁচ লক্ষ দান করেছেন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে

বাপনের বাড়ি শিলিগুড়ির অরবিন্দ পল্লীতে। শিলিগুড়ি পুরসভা এবং এসজেডি-র অনুমোদিত ঠিকাদার। তাছাড়া শিশুদের খেলনা সামগ্রীর পাইকারি ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। নিজের ব্যবসা থেকে সংগৃহীত টাকার একটি দুটি টাকা নয়, পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে বাপন ত্রাণ বিলি করলেন লকডাউন পর্বে। লকডাউন শুরু হতেই বাপন তাঁর শিশু পুত্র রুদ্রায়ণের জন্মদিন অনুষ্ঠান বাতিল করে মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ সাহায্য করেন। এরপর তাঁর বাড়ির সামনে করোনা সচেতনতা মেনে প্রতিদিন তিনি দুঃস্থদের মধ্যে চাল, ডাল, আলু, সয়াবিন প্রভৃতি বিলি করেন। তারপর একদিন শিলিগুড়ি লাগোয়া সরস্বতীপুর চা বাগানে গিয়ে বিলি করেন ত্রাণ। এরমধ্যেই আবার বেশ কিছু দুঃস্থ ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেন চাল, আলু, সয়াবিন প্রভৃতি। লকডাউন পর্বে প্রতিদিনই এ ধরনের সামাজিক ও মানবিক কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যান বাপন।   

শিলিগুড়ি টিকিয়াপাড়ার পরমানন্দ যোগানন্দ অনাথ আশ্রমের অনাথ বালকরাও বাপনের কাছ থেকে লকডাউনের সময় উৎসাহ পেয়ে বেশ খুশি। বাপন সেখানে এক মাসের জন্য চাল ছাড়াও সবজি, চকোলেট, বিস্কুট ও রান্নার মশলা তুলে দেন। আবার এনজেপি স্টেশনের সামনে কনসার্ন পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম শিশুদের হাতেও একদিন বাপন তুলে দেন প্রচুর ত্রাণ উপহার। এর বাইরে শিলিগুড়ি হাকিমপাড়ার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রান্তিকদের স্কুল শিলিগুড়ি উদয়তে বাপন বেশ কিছু ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন। নিজের অর্থ ব্যয় করে বাপন যেভাবে লকডাউন পর্বে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপহার হিসাবে ত্রাণ তুলে দিয়েছেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন সমাজসেবী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। সোমনাথবাবু বলেন, অর্থ থাকলেই হয় না। অর্থের সদ্ব্যবহার করতে হয়। বাপন সেই কাজটি করে বিরল নজির সৃষ্টি করেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কনসার্নের স্থানীয় ইনচার্জ তাপস কর্মকার বলেন, লকডাউনের সময় বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম শিশু খিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বাপন তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। 

শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট থেকে এসিপি রাজেন ছেত্রী-সহ অন্যান্য পুলিশকর্মীরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন

শিলিগুড়ি অরবিন্দ পল্লীতে ধারাবাহিকভাবে লাউন করে কদিন ধরে দুঃস্থদের হাতে ত্রাণ উপহার তুলে দেওয়ার সময় একদিন উপস্থিত হন পদ্মশ্রী করিমুল হক। পদ্মশ্রীর মাধ্যমেও বাপন দুঃস্থদের হাতে তুলে দেন উপহার। এরই পাশাপাশি দুঃস্থ গ্রামবাসীদের চিকিৎসার জন্য ডুয়ার্সের গ্রামে পদ্মশ্রী যে হাসপাতাল নির্মাণ করছেন সেই হাসপাতাল নির্মাণের জন্যও বাপন এগারো হাজার টাকার চেক তুলে দেন পদ্মশ্রীর জন্য। আনলক পর্বেও বাপন তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বাপন বলেন, লকডাউনের সময় কাজ হারিয়ে অনেকে বিপদে পড়েছেন। অনেকের মুখে হাসি নেই। তাঁদের মুখে একটু হাসি ফোটাতেই এইসব প্রয়াস। যে পাঁচ লাখ টাকা তিনি ত্রাণ উপহার বিলিতে খরচ করেছেন সেটাকে তিনি বড়ো করে দেখছেন না।দুঃস্থ মানুষগুলোর মুখে কিছু দিনের জন্য হলেও যে তিনি হাসি ফোটাতে পেরেছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।                                                        

ত্রাণ তুলে দেওয়ার সময় উপস্থিত হন পদ্মশ্রী করিমুল হক

 

ছবি : প্রতিবেদক।

Developed by DXDasia