
সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, মাধবী, অপর্ণা, মহুয়া সহ আরও অনেকেই রয়েছেন সেই তালিকায়
“প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে
আমারই এ দুয়ার প্রান্তে
সে তো হায়, মৃদু পায়
এসেছিল পারিনি তো জানতে”
গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে এই গানটি গেয়েই বাংলা গানের জগতে সফর শুরু করছেন লতা মঙ্গেশকর। পঞ্চাশের দশক। ১৯৫৬ সাল। সেই বছরই ভূপেন হাজারিকার সুরে রেকর্ড করলেন “রঙ্গিলা বাঁশিতে”। সাক্ষাৎ সুরের সরস্বতীকে চিনতে বাকি রইল না গানপাগল বাঙালির। পঞ্চাশের দশকেই সলিল চৌধুরীর সুরে গাইলেন ‘যারে উড়ে যারে পাখি’, ‘না যেও না’, ‘ওগো আর কিছু তো নয়’-এর মতো বিখ্যাত সব গান। যেমন সুর তেমন গায়কী, বাংলা গানের সঙ্গে অটুট সম্পর্ক তৈরি হয় ভারতের ‘নাইটিঙ্গল’-এর।
লতাকে বাংলা গানে আনার ক্ষেত্রে হেমন্ত অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ঠিকই তবে সলিল চৌধুরীও তাঁকে দিয়ে বহু কালজয়ী গান রেকর্ড করান। এছাড়া সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সুধীন দাশগুপ্ত, মান্না দে, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, গীতা দত্ত, অনিল বিশ্বাস, অশোক কুমার, কিশোর কুমার, শক্তি সামন্ত, হৃষিকেশ মুখার্জি, বিশ্বজিৎ, বাপী লাহিড়ি এঁদের সঙ্গেও চুটিয়ে কাজ করেছেন। সাত দশকের দীর্ঘ কেরিয়ারে প্রায় ত্রিশ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন তিনি। তার মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রায় ২০০টি গান গেয়েছেন। বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার পেয়েছেন ১৫ বার। শুধু একক অ্যালবামে আধুনিক গান রেকর্ডই নয়, বাংলা ছবিতে নিয়মিত গান গেয়েছেন সুরসম্রাজ্ঞী। তাঁর কণ্ঠে ঠোঁট মিলিয়েছেন বাংলা ছবির কিংবদন্তি নায়িকারা। সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, মহুয়া রায়চৌধুরী, মৌসুমী চ্যাটার্জি, রূপা গাঙ্গুলি, ইন্দ্রানী দত্ত কে নেই সেই তালিকায়!
সুচিত্রা সেনের বিশেষ ভক্ত ছিলেন লতা। সংগ্রহে রেখেছিলেন সুচিত্রা অভিনীত বিখ্যাত সব ছবির ক্যাসেট, সিডি। ১৯৫৯ সালে অসিত সেনের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দীপ জ্বেলে যাই’। তুমুল জনপ্রিয়তা পায় এই ছবিরই ‘আর যেন নেই কোনও ভাবনা’ গানটি। লতার কণ্ঠে প্রথম বাংলা ছবির গান যেটি মহানায়িকাকে নিয়ে চিত্রায়িত হয়। যদিও সুচিত্রার লিপে নয়, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি ও অভিব্যক্তি গানটির দৃশ্যগুলো ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছিল। পরে হিন্দিতে অসংখ্য কালজয়ী গান মিসেস সেনের জন্য রেকর্ড করেন লতা। একবার জনৈক এক বাংলা সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা সেন সম্পর্কে বলেছিলেন, “ম্যায় জানতি থি, কে আগর সুচিত্রা সেন কে লিয়ে কোই গানা গাউ, তো বঙ্গাল মে বড়ি হিট হোনেওয়ালি হ্যায়, অউর কহিপে হো না হো! অ্যায়সা পেয়ার দেখনেকো নেহি মিলতা৷”
আর যেন নেই কোনও ভাবনা, ছবি- দীপ জ্বেলে যাই
১৯৬৫ সাল। মুকুল দত্তের কথায় হেমন্ত মুখার্জির সুরে ‘মনিহার’ ছবির গান গাইলেন লতা। সন্ধ্যা রায়ের লিপে হৈচৈ ফেলে দিল ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’। যদিও রজনী পোহালো (বাঘিনী), তুমি রবে নীরবে (কুহেলি), সখী ভাবনা কাহারে বলে (শ্রীমান পৃথ্বীরাজ), ঘির আয়ি বাদারিয়া (আলোর পিপাসা) – সন্ধ্যা রায় অভিনীত একাধিক ছবিতে প্লেব্যাক করেন লতা।
আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন, ছবি- মনিহার
১৯৬৯-এ মুক্তি পায় উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির ‘মন নিয়ে’। ছবিটির সঙ্গে সাড়া ফেলেছিল সে ছবির গান ‘চলে যেতে যেতে দিন বলে যায় আঁধারের শেষে ভোর হবে’। এ গানেরও সুরকার ছিলেন হেমন্ত, গীতিকার মুকুল দত্ত। সুপ্রিয়া দেবীর লিপে অন্য মাত্রা পেয়েছিল লতার গাওয়া এই গান।
কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম ভালোবেসেছি…নৌকায় উত্তম কুমারের কোলে মাথা রেখে গান গাইছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। শুধু এই গানটিই নয় ‘শঙ্খবেলা’ (১৯৬৬) ছবির ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো’ গানটিও লতারই গাওয়া। সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত। দুটি গানই সুপার-ডুপার হিট। এছাড়াও মাধবী অভিনীত ‘অদ্বিতীয়’ ছবির ‘চঞ্চল ময়ূরী এ রাত বধূ যেতে দিও না’, ‘চঞ্চল মন আনমনা হয়’, ‘বোঝো না কেন যে তুমি বোঝো না’ গানগুলিও জনপ্রিয় হয়।
কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম ভালোবেসেছি, ছবি- শঙ্খবেলা
এক সময় বাংলা ছবির জগত উথাল-পাথাল হত মহুয়া রায়চৌধুরীর নামে। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা মাপা হত তাঁকে সামনে রেখে। অকালেই চলে গিয়েছেন তিনি। তাপস পালের সঙ্গে জুটি বেঁধে জীবিতাবস্থায় যে কটা ছবি করেছিলেন, তার মধ্যে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ ছিল অন্যতম হিট। ‘আমি যে কে তোমার’ মহুয়ার লিপে লতার গাওয়া এই গান ৮০’র দশকে রীতিমতো ‘ভাইরাল’ হয়ে উঠেছিল এবং তার রেশ যে এখনও রয়ে গিয়েছে, তা বঙ্গের বিভিন্ন পুজো-পাব্বনেই টের পাওয়া যায়।
আমি যে কে তোমার, ছবি- অনুরাগের ছোঁয়া
এছাড়াও শর্মিলা ঠাকুরের লিপে ‘না না কাছে এসো না’ (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী), মৌসুমি চ্যাটার্জির লিপে ‘ফেলে আসা স্মৃতি আমার’ (শতরূপা), ইন্দ্রানী দত্তের লিপে ‘যত বার দেখি মা গো তোমায় আমি’ (তুফান), মৌসুমি চ্যাটার্জির লিপে ‘ফেলে আসা স্মৃতি আমার’ (শতরূপা), অপর্না সেনের লিপে ‘কানা মাছি ভোঁ ভোঁ’, ‘যে প্রদীপ জ্বালছো তুমি’ (শ্বেত পাথরের থালা), রূপা গাঙ্গুলির লিপে বৃষ্টি এলো বৃষ্টি (প্রতীক), অনুশ্রী দাসের লিপে খুশির সাগরে আমি (বউরানি)…তালিকা অনেক দীর্ঘ। লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া অসংখ্য গান আজও ্সমান জনপ্রিয়।
মারাঠি পরিবারে জন্ম হওয়ায় বাংলা জানতেন না সেই অর্থে। অথচ বাংলার প্রতি তাঁর ভালোবাসাই বারবার বাংলা গানের মহলে এনে উপস্থিত করেছে। গানের কেরিয়ারের শুরুর দিকে একজন বাঙালি পরিচালক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে। লতার পাতলা গলার স্বর পছন্দ হয়নি পরিচালকের। অথচ কে জানতো সেই সুরই একদিন কোকিলকণ্ঠী হয়ে জায়গা করে নেবে বাঙালির ঘরে ঘরে! লতা অবশ্য পিছিয়ে পড়ার মেয়ে ছিলেন না কোনোদিনই। বাংলাকে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন। গৃহ শিক্ষক রেখে তাই বাংলা ভাষা শিখতেও শুরু করেন তিনি। বোম্বের সঙ্গে বাংলার সেতু তৈরিতেও লতা মঙ্গেশকরের অবদান কিছু কম নয়! কখনও প্রেম, কখনও বিষাদ আবার কখনও দেশপ্রেমের অঙ্গীকার – স্বর্ণযুগে ভরিয়ে রেখেছিলেন বাংলা গানের জগৎ।
