
বোম্বে ও বাংলার সুরের সেতু নির্মাণে লতা মঙ্গেশকরের অবদান অনস্বীকার্য
“যাবার বেলায় পিছু থেকে ডাক দিয়ে
কেন বলো কাঁদালে আমায়?”
সত্তরের দশকে এই বিখ্যাত গান দিয়েই একদিন চলে যাওয়ার সময়ের অনুভূতিকে তুলে ধরেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। সেদিনই যেন গানে গানে বলেছিলেন যাবার বেলায় আর কোনো পিছু ডাকেই ফিরে তাকানোর অবকাশ পাবেন না তিনি। পেলেনও না তাই!
লতা মঙ্গেশকর, সুরের জগতে এক চলমান অধ্যায়ের নাম। কলমের আঁচড় কিংবা অস্ত্রের ঘা নয়, সুরই ছিল তাঁর একমাত্র সাধনার পথ। আক্ষরিক অর্থেই সুরসম্রাজ্ঞী। বিভিন্ন সময়ে নানা সাক্ষাৎকারে লতা বলেছেন, তাঁর জীবনের সঙ্গে মীরার জীবনের যোগাযোগের কথা। বলেছেন, মীরাকে বুঝতে আর জানতে পারলেই লতাজিকে চিনতে পারা সহজ হবে।
বাঙালি ছিলেন না লতা মঙ্গেশকর। মারাঠি পরিবারে জন্ম হওয়ায় বাংলা জানতেন না সেই অর্থে। অথচ বাংলার প্রতি তাঁর ভালোবাসাই বারবার বাংলা গানের মহলে এনে উপস্থিত করেছে। গানের কেরিয়ারের শুরুর দিকে একজন বাঙালি পরিচালক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে। লতার পাতলা গলার স্বর পছন্দ হয়নি পরিচালকের। অথচ কে জানতো সেই সুরই একদিন কোকিলকণ্ঠী হয়ে জায়গা করে নেবে বাঙালির ঘরে ঘরে! লতা অবশ্য পিছিয়ে পড়ার মেয়ে ছিলেন না কোনোদিনই। বাংলাকে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন। গৃহ শিক্ষক রেখে তাই বাংলা ভাষা শিখতেও শুরু করেন তিনি। বোম্বের সঙ্গে বাংলার সেতু তৈরিতেও লতা মঙ্গেশকরের অবদান কিছু কম নয়!

লতাকে বাংলা গানে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীও তাকে দিয়ে বহু কালজয়ী গান করিয়েছেন। এছাড়া সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরেও লতা বাংলা গান গেয়েছেন। গেয়েছেন সুধীন দাশগুপ্তর সুরেও।
সময়টা পঞ্চাশের দশক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে “প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে”, গান দিয়েই লতার বাংলা গানের জগতে পথ চলা শুরু হয়। সেই বছরই ভূপেন হাজারিকার সুরে গাইলেন “রঙ্গিলা বাঁশিতে”। সে গানের সুরের মায়ায় যেন সহজেই ভেসে গেল বাঙালি। সাক্ষাৎ সুরের সরস্বতীকে চিনতে বাকি রইল না কারোরই। পঞ্চাশের দশকেই সলিল চৌধুরীর সুরে গাইলেন ‘যারে উড়ে যারে পাখি’, ‘না যেও না’, ‘ওগো আর কিছু তো নয়’-এর মতো বিখ্যাত সব গান।

বাংলা গানের জনপ্রিয়তা ক্রমেই তাঁকে এমন জায়গায় নিয়ে গেল যে, একাধিক গানের হিন্দি ভার্সন করার প্রয়োজন বোধ করলেন পরিচালকরা। সেগুলির মধ্যে উল্লেখ্য, ‘যা রে উড় যা রে পঞ্ছি’, ‘ও সজনা’ ও ‘তসবীর তেরে দিল মে’ ইত্যাদি। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’ কিংবা সলিল চৌধুরীর সুরে গাওয়া ‘সাত ভাই চম্পা’-র মতো পরপর সুপারহিট কাজ করে চললেন লতা মঙ্গেশকর। ঠিক যেন, “গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে ধেয়ে”।
শুধু রেকর্ডের গান নয়, পাশাপাশি টলিউডের ছবিতে নিয়মিত গান গেয়েছেন লতা। স্বর্ণযুগ থেকে হাল-আমলের প্রেমের ছন্দে বারবার ফিরে এসেছে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘শঙ্খবেলা’ ছবির কালজয়ী গান “কে প্রথম কাছে এসেছি” কিংবা ‘আমার তুমি’ ছবির “বলছি তোমার কানে আমার তুমি”। কখনও লতার কণ্ঠে “আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো” গানে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করেছে শ্রোতার, আবার কখনও “চঞ্চল মন আনমনা হয়” সেই লতার সুরেই। আবার তিনিই ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবির “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি” গানে বুনেছেন দেশাত্ববোধের স্বপ্ন। স্বর্ণযুগের সময় থেকে আজকের দিনেও লোকের মুখে মুখে ফেরে “নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা”, “আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন” ইত্যাদি একাধিক জনপ্রিয় গানের সুর ও কণ্ঠ।

সাত দশকের দীর্ঘ কেরিয়ারে ত্রিশ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। তার মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রায় ২০০টি গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। ২০০১ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’-এ ভূষিত করা হয়। এর আগে ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ’-এর মতো নাগরিক সম্মানও দেওয়া হয়েছে লতা মঙ্গেশকরকে। চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’ দ্বারাও সম্মানিত হয়েছেন তিনি। এছাড়াও বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার পেয়েছেন ১৫ বার।
স্বর্ণযুগের বাংলা গানে পথিকৃৎ ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। কখনও প্রেমের অনুভুতি, কখনও বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, কখনও দেশপ্রেমের অঙ্গীকার — সবকিছু দিয়েই ভরিয়ে রেখেছিলেন বাংলা গানের দুনিয়া। লতার কণ্ঠ দিয়েই তাঁর চলে যাওয়ার ক্ষতিকে স্মরণ করবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম— “এবারে ভাসাব ভেলা শেষ হয়ে এলো বেলা/ আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি।”
তথ্যসূত্রঃ
চেনা আলো চেনা অন্ধকার/ বিমোচন ভট্টাচার্য
স্বর্ণকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর/ শাহনেওয়াজ
