গীতা ঘটক থেকে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ, তাঁর কাছে তালিম নিয়েছেন বহু নক্ষত্র
শেষ হতে চলল ২০২১। এই বছর আমরা হারিয়েছি বাংলার বহু গুণীজনদের। শুনতে খারাপ লাগলেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে তাঁদের অনেকেই জীবিত ছিলেন, একথা বাঙালি ভুলে ছিল। সেরকমই এক ব্যক্তিত্ব চণ্ডীদাস মাল, যাঁর জীবন এবং গান একসূত্রে গাঁথা, যাঁর নামের সঙ্গে পুরাতনী টপ্পা, আগমনী, ভক্তি গান সমার্থক হয়ে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটায় হাওড়ার বালিতে নিজের বাড়িতেই জীবনাবসান হয় বাংলা পুরাতনী গানের পথিকৃৎ-এর। বয়স হয়েছিল প্রায় ৯২ বছর। ওই বাড়িতেই সস্ত্রীক থাকতেন শিল্পী। একমাত্র ছেলে কর্মসূত্রে দিল্লির বাসিন্দা।
সেই তিন বছর বয়স থেকেই তালিম নেওয়া শুরু, প্রতিদিন সকালে উঠে হারমোনিয়াম নিয়ে নিয়মিত রেওয়াজে তাঁর ভুল হয়নি কোনও দিন৷ বালির বাড়িটায় গানের ঘরে তানপুরা, পাখোয়াজের পাশাপাশি রয়েছে দেওয়ালের র্যাক ভর্তি গানের খাতা৷ টপ্পা, ঠুমরি, পুরাতনীর অমূল্য সংগ্রহ৷ রেডিয়োতে গান গাইছেন সেই ১৯৪৪ সাল থেকে৷ পরে দূরদর্শন ও ইদানীং বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে টপ্পা, ঠুমরি, ভক্তিগীতি, পুরাতনী পরিবেশন করেছেন৷ রাজ্য সঙ্গীত অ্যাকাডেমি তাঁর ১০০টি গান তাঁদের আর্কাইভসে সংরক্ষণ করেছে৷ শিক্ষকতা করেছেন রবীন্দ্রভারতী ও বেঙ্গল মিউজিক কলেজে৷ এ ছাড়া কলকাতার কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সঙ্গীতের তালিম দিয়েছেন চণ্ডীদাসবাবু৷ বাড়িতেও ছাত্রছাত্রীদের তালিম দেন শিল্পী৷ তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উত্সাহী গোস্বামী, গৌরী বন্দ্যোপাধ্যায়, তিমির ঘোষ, প্রণতি দাস, চন্দ্রাবলী রুদ্রদত্তরা পুরাতনী ও ভক্তিমূলক গানে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন৷ তাঁর আর এক ছাত্র সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ৷ তিনিও চলে গিয়েছেন এ বছরে। বুদ্ধদেববাবুর প্রথম গানের ক্যাসেটের পরিচালনাও চণ্ডীদাসবাবুর৷ গুরুর সম্পর্কে গুণী শিষ্যের মন্তব্য, ‘বড় নিরভিমানী মানুষ৷ গান ভীষণ ভালোবাসেন৷ নিজেরও শেখার আগ্রহ খুব৷’
গীতা ঘটকও ছিলেন চণ্ডীদাসবাবুর ছাত্রী। গীতার মতোই গানের দুনিয়ায় আরও একাধিক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্ম দিয়েছেন প্রবীণ শিল্পী। তালিকায় রয়েছেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, লোপামুদ্রা মিত্র-র মতো নামীদামি ব্যক্তিত্বেরা। তাঁর আর এক ছাত্র সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ৷ বুদ্ধদেববাবুর প্রথম গানের ক্যাসেটের পরিচালনাও চণ্ডীদাসবাবুর৷ গুরুর সম্পর্কে গুণী শিষ্যের মন্তব্য, ‘বড় নিরভিমানী মানুষ৷ গান ভীষণ ভালোবাসেন৷ নিজেরও শেখার আগ্রহ খুব৷’
বালির আদি বাসিন্দা চণ্ডীদাসবাবুরা৷ বাবা নারায়ণচন্দ্র মাল সরকারি চাকুরে ছিলেন৷ গানের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা৷ নিজে গাইতেনও উচ্চাঙ্গসঙ্গীত৷ গান শিখেছিলেন প্রখ্যাত গায়ক অনাথনাথ বসুর কাছে৷ মা ঊষাঙ্গিনী দেবীও গাইতেন৷ বাবার কাছেই প্রথম তালিম চণ্ডীদাসের৷ এর পর বাবাই নিয়ে যান সনত্ সিংয়ের দাদা কিশোরীমোহন সিংয়ের কাছে৷ কিছু দিন খেয়ালের তালিম দেওয়ার পর তিনিই নিয়ে যান নিজের উস্তাদ উত্তর কলকাতার সিমলে পাড়ার রামচন্দ্র পালের কাছে৷ সেখানেও বছর তিনেক খেয়াল শেখেন শিল্পী৷
এরই মধ্যে চলতে থাকে বালির রিভার টমসন স্কুলে (এখনকার শান্তিরাম বিদ্যালয়ে) পড়াশোনা৷ ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিযোগিতায় জুনিয়র বিভাগে অংশ নেন তিনি৷ এমন সময় হঠাত্ বম্বে টকিজের ডাক পেয়ে গুরু রামচন্দ্র পাল চলে গেলেন বম্বে৷ এ বার বাবা নিয়ে গেলেন হাওড়ার কদমতলায় কিশোরীমোহন সিংয়ের গুরু কালীপদ পাঠকের কাছে৷ চণ্ডীদাস কালীপদ পাঠকের সাক্ষাৎ শিষ্য এবং ওই ঘরানার সম্ভবত শেষ শিল্পী। কিশোর চণ্ডীদাসের সঙ্গীত শিক্ষার ভার নিলেন কালীপদবাবু৷ বাকি জীবন সুযোগ্য ছাত্রটির কাছে উজাড় করে দিয়েছেন নিজের অফুরন্ত গানের ভাণ্ডার৷ দীর্ঘ ৩৫ বছর তাঁর কাছেই শিখেছেন৷ বালির বাড়িতে এসেই গান শেখাতেন পাঠক মশাই৷
সে সময় কালীপদ পাঠকের সঙ্গে কলকাতা ও আশপাশের অনেক ধনী জমিদার বাড়িতে গাইতে যাওয়ার ডাক আসত প্রায়ই৷ পরবর্তী জীবনে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখেন৷ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গান শিখেছেন৷ কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে শিখেছেন ধ্রুপদ ও ধামার৷ জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে ভজন ও সুগম সঙ্গীত ও দুর্গা সেনের কাছে শিখেছেন গীত, গজল, ভজন৷ ‘বেলুড় মঠে চণ্ডীকানন্দ মহারাজের কাছে শেখা শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা ও স্বামীজির গান গাইলে অন্য রকম অনুভূতি হয়৷ বন্ধু ভবতোষ দত্তের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল চণ্ডীকানন্দ মহারাজের সঙ্গে৷ মহারাজ গান শেখাতে লুকিয়ে আমার বাড়ি চলে আসতেন৷’ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন চণ্ডীবাবু।
টপ্পা, ঠুমরি, পুরাতনী গানের স্বকীয়তা ধরে রাখা ও তা জনপ্রিয় করে তোলার নেপথ্যে ছিলেন চণ্ডীদাসবাবু। পুরোটাই তাঁর কৃতিত্ব৷ পুরাতনী সঙ্গীতপ্রেমীদের অনেকেরই তাই মত৷ তাঁরই চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে টপ্পা ও পুরাতনী গানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ দীর্ঘ দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থততায় ভুগছিলেন চণ্ডীবাবু। ছাত্রী চন্দ্রাবলীর আক্ষেপ, যে স্বীকৃতি-সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, তা না পেয়েই চলে গেলেন বাংলা পুরাতনী গানের দুনিয়ার এই মহীরুহ। চণ্ডীদাসবাবুর মৃত্যুতে দাঁড়ি পড়ল গানের জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে।
তথ্যঃ এই সময়, আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবি ঋণঃ দূরদর্শন আর্কাইভ