
সংগীত নিয়ে তেমন প্রথাগত শিক্ষা ছিল না সলিল চৌধুরীর
প্রথম দর্শনে বেশ অবাক হয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, একজন সংগীত পরিচালক যে কিনা মিউজিকটাকে প্রায় গুলে খেয়েছেন, সে একদিকে যেমন একজন গীতিকার, কবি, সুরকার আবার গণনাট্য করেন, সাথে বামপন্থী রাজনীতিও করেন। লতাজি সেদিন কুর্নিশ করেছিলেন এই অদ্ভুত প্রতিভার ক্ষণজন্মা মানুষটিকে।
সংগীত নিয়ে প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিলই না, অথচ সেই একদিন গোটা সংগীত জগত রাজ করেছিলেন তাঁর স্বকীয় ঘরানায়। জন্ম ১৯২৩ সালের এমন এক নভেম্বর মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনা সোনারপুর অঞ্চলে, বাবা ছিলেন পেশায় ডাক্তার এবং আসামের চা বাগানে কর্মরত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, আসামের চা বাগানগুলি যেন মিনি ভারতবর্ষ, নানা ভাষা নানা সংস্কৃতি মিলেমিশে সেখানে একাকার, আর সেটাই হয়তো তাঁর শিল্পী জীবনের অনুপ্রেরণা, বাবা নিজেও ছিলেন সংগীত শিল্পানুরাগী আর সেখান থেকেই তাঁর শিল্পের হাতে খড়ি। কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে পড়ার সময় আকৃষ্ট হন ছাত্র রাজনীতির প্রতি এবং যোগদান করেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে। ধীরে ধীরে তাঁর বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ ও শিল্পবোধ তাঁকে মানুষের প্রতি আকৃষ্ট করতে শুরু করে এবং শিল্পকে মানুষের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদেই যোগদান করেন IPTA, গ্রামে গ্রামে চলতে থাকে গণনাট্য আসর, শুরুতে বাঁশি বাজাতেন তিনি, ধীরে ধীরে গণনাট্যের জন্য গান লেখা শুরু করেন। খেটে খাওয়া মানুষের জন্য বাঁশির সাথে কলমও ধরেন।
সিনেমা জগতে প্রবেশ অবশ্য খানিক পরে, ১৯৫৩ সালে বাংলা সিনেমা ‘রিকশাওয়ালা’র হিন্দি রূপান্তর বিমল রায় পরিচালিত ‘দো বিঘা জমিন’ থেকে তাঁর উত্থানের শুরু বলে অনেকে মনে করেন। যদিও তার আগেও কিছু বাংলা সিনেমায় কাজ করেছেন, ‘দো বিঘা জমিন’-এ রিক্সাওয়ালার সেই অদ্ভুত লড়াইয়ের সাথে তাঁর সুর সকলকে ভাবিয়ে তুলেছিল। পঞ্চাশ ষাটের দশক মাতিয়ে রেখেছিলেন এই সুরকার, সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য সমস্ত লেখা ও সুর, যা আজও সমানরকম মননগ্রাহী ও প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের এমন সংমিশ্রণ, সাথে অমন ক্ষুরধার লেখনি, এ যেন শুধুমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব।
শোনা যায়, সারা ভারতের সুরকাররা যখন অপেক্ষায় থাকতেন লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে তাঁদের গান গাওয়ানোর জন্য, লতাজি উৎসুক থাকতেন এই মানুষটির সাথে কাজ করার জন্য । বহু বহু এমন গান তিনি লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন শুধুমাত্র লতাজির কথা ভেবেই।
কিশোর কবি সুকান্ত তাঁর ক্ষুরধার কলমকে অসম্পূর্ণ রেখেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, বোধহয় আমাদের জন্য রানার সুকান্তর সেই কলমের ভার নেওয়ার জন্য জন্মেছিলেন এই মানুষটি…
গল্প আছে তাঁকে ঘিরে অনেক, শোনা যায় একবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কফি হাউসে বসে চিরকুটে একটি গান লিখে ফেলেছিলেন, সেই লেখাই পরবর্তীকালে একটি আধুনিক বাংলা গান হিসেবে মননগ্রাহী হয়ে ওঠে –
“পা মা গা রে সা
তার চোখের জটিল ভাষা
ধা, ধা পা মা গা রে
পড়ে পড়ে বোঝার আশা
সা মা পা ধা নি সা
সা জানি শুধুই দুরাশা”।
হ্যাঁ, তিনি ‘সাত ভাই চম্পা’র সেই রাজকুমার সলিল চৌধুরী, আজ তাঁর জন্মদিন।
