চিরদিনের জন্য যে রসে ডুবে আছেন রামপ্রসাদ, ধনঞ্জয়, পান্নালাল, রামকুমার
কালীপুজো হচ্ছে অথচ মণ্ডপে এক বার ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে’ অথবা ‘আমার সাধ না মিটিল’ বাজবে না, এটা আজও অকল্পনীয়। পান্নালাল ভট্টাচার্য, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মৃণালকান্তি ঘোষ, ভবানী দাস, হীরালাল সরখেল, নির্মল মুখোপাধ্যায় শ্যামাসংগীত গেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, আবার শ্যামাসঙ্গীতের আর এক স্বাদ পাওয়া যায় কাজি নজরুল ইসলামের বহু গানে৷ ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় ’ বা ‘বল রে জবা বল ’ তো আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। এই ধরনের গানের প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল এবং অজয় চক্রবর্তী। এমনকী এই প্রজন্মের তরুণ কণ্ঠশিল্পীরাও শ্যামাসংগীত গাইছেন। আর একটা বিষয়, কালীপুজোর প্রাক্কালে রামপ্রসাদী, কমলাকান্তর গণ্ডি পেরিয়ে আরও একটি গানের ধারার কথা মনে পড়ে। সেটি হল কালীকীর্তন। যে সব সংগঠন এই ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তার অন্যতম হলো ১৩৯ বছর পুরোনো হাওড়া জেলার আন্দুল কালীকীর্তন সমিতি৷ এই ধরনের আখড়াভিত্তিক, গূঢ় তত্ত্বের গান কতটা গ্রহণযোগ্য নতুন প্রজন্মের কাছে? আন্দুল কালীকীর্তন সমিতির সম্পাদক এবং অন্যতম কণ্ঠশিল্পী এক সংবাদপত্রে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, তাঁদের অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের বেশিরভাগেরই বয়স থাকে ২৫ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। শ্যামাসংগীত বেঁচে আছে বোঝা গেল, সবই হলো কিন্তু…
কালী-কে ঘিরে আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্তের নানা ‘কল্পনা’ একসময় প্রবল হয়ে উঠেছিল, এ নিয়ে আর চর্চা হয় না। এর পিছনে রামকৃষ্ণদেবের বিশেষ ভূমিকা ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। রামপ্রসাদ-কমলাকান্তের ট্র্যাডিশন উনিশ শতকে দক্ষিণেশ্বরে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছিল। ভুলে গেলে চলবে না যে, রামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথকে গভীর সাংসারিক ও আর্থিক সংকটের সময় কালীর কাছে প্রার্থনা করতে পাঠিয়েছিলেন। সেই যে সেই বিখ্যাত ঘটনাটা…
অভাবের তাড়নায় নরেন (বিবেকানন্দ) চাকরির জন্য ঘুরে ঘুরে হতাশ। প্রিয় নরেনের এ অবস্থা আর চোখে দেখতে পারছেন না শ্রীরামকৃষ্ণ। অনেক অনুরোধ করে নরেনকে তিনি পাঠালেন কালী ঘরে, তাঁর বিশ্বাস নরেনকে মা ফেরাবেন না, সে যা চাইবে তাই পাবে। সেইমতো নরেন কালী ঘরে গেলেন, কিন্তু কিছুতেই জানাতে পারলেন না অন্নসংস্থানের কথা, স্বচ্ছলতার কথা; পরিবর্তে কালীমূর্তির দিকে চেয়ে বারবার একই প্রার্থনা করলেন – বিবেক, জ্ঞান, ভক্তি, দিব্য দর্শন। নরেনের এহেন কান্ড বুঝে শুনে রামকৃষ্ণ শেষে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, যা তোর ভাত কাপড়ের অভাব হবে না।’
“চাই না গো মা রাজা হতে/ রাজা হবার সাধ নাই মাগো/ দু’বেলা যেন পাই মা খেতে” রামপ্রসাদ সেনের কথায়, সুশীল ব্যানার্জীর সুরে, পান্নালাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এই গান কি সেই কথাই বলে না?
শুধু এই গানটি কেন, এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় শ্যামাসঙ্গীতে অন্তর্নিহিত রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ দর্শনিক চিন্তন। রামপ্রসাদের ‘আসার আশা, ভবে আসা’, কমলাকান্তের ‘শ্যামা মা কি আমার কালো’, দাশরথি রায়ের ‘দোষ কারও নয় গো মা’, রজনীকান্ত সেনের ‘আমি সকল কাজের পাই হে সময়’-এর মতো গানে নানা ধারা, সংস্কৃতি, লোকাচার, ইতিহাস, দর্শনের সম্মিলনে সঙ্গীতও তৈরি হয়। বাংলার ভক্তিগানে তাই মার্গ সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনই আছে লোকসুরের বহুবর্ণ আস্তর। এমনকী উনিশ শতকে কালী-কে ঘিরে যে দার্শনিক বিতর্ক হয়েছিল, তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ-নিবেদিতা। রক্ত চায়, হিংসা চায়, তাই কালীমূর্তি সমর্থন করতেন না রবীন্দ্রনাথ। অন্যদিকে, বিবেকানন্দ ও নিবেদিতার কাছে কালী ছিল ‘মৃত্যুরূপা মাতা’। জীবনের নশ্বরতাই মূর্ত হয়ে ওঠে কালীমূর্তিতে এমনটাই ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের কালী-ভাবনা সশস্ত্র বিপ্লবীদের আলোড়িত করেছিল। জীবনের নশ্বরতার কথা ভেবে শাসক ব্রিটিশদের হত্যা করতে কালীমায়ের নাম নিয়ে বোমা বাঁধতেন দুঃসাহসীরা। বিল্পবীদের কাছে কালী রিক্ত দেশমাতা নন, জীবন-মৃত্যুকে তুচ্ছ করতে শেখানো দেবী। ক্ষণে ক্ষণে তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর ঢুঁ মারা, মঙ্গল-শনিবারে পুজো দেওয়া আম বাঙালির অবশ্য কোনওকালেই এইসব কালী-দর্শন নিয়ে কোনও মাথা ব্যথা ছিল না, আজ তো নেইই।