জলসাঘরের গানের আসরে দুর্গাবাঈ তথা বেগম আখতার ধরলেন পিলু ঠুমরি
জন্মনাম আখতারি বাঈ ফৈজাবাদি। মাত্র তেরো বছর বয়সে মা মুশতারি বাঈয়ের হাত ধরে কলকাতায় এসেছিলেন সেই গান পাগল কিশোরী। সঙ্গে ছিলেন গুরু উস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁ। গুরুর পরামর্শেই কলকাতায় আসা। কথিত ছিল ভারতবর্ষের একমাত্র সংগীতের শহর এই কলকাতা। উস্তাদজির মতো আখতারির মা-ও ভেবেছিলেন এই অনুকূল পরিবেশ মেয়ের সংগীতশিক্ষা ও প্রতিভাবিকাশের জন্য সহায়ক হবে। সেই স্বপ্ন শেষমেশ সার্থক হল। কিশোরীটি পরবর্তীতে হয়ে উঠবেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সম্রাজ্ঞী বেগম আখতার। গায়কির জন্য যিনি পেয়েছিলেন বিশেষ উপাধি – ‘গজলের রানি’।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'জলসাঘর' চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের গজল, দাদরা ও ঠুমরি গোত্রের গান গেয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন বেগম। আজও বাঙালি হৃদয়ে যে গানের সুর আর গায়কি আঁকা আছে, তা হল — ‘জোছনা করেছে আড়ি’। বেগম আখতার যখন গেয়ে ওঠেন, “গলি দিয়ে চলে যায়/ লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি/ চেয়ে চেয়ে পথ তারই,/ হিয়া মোর হয় ভারি/ রূপের মধুর মোহ,/ বলোনা কী করে ছাড়ি”। কোন গভীর থেকে উচ্চারিত হয় এমন কথা, এমন সুর, যা হয়তো ওই একজনের মুখেই শোভা পেয়ে এসেছে যুগের পর যুগ। এই গান এখনও কি গুনগুন করি না আমরা! কিছু কিছু গান থেকে যায়, যা যুগের সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠে কালজয়ী। বাংলা গানের ইতিহাসে তেমনই একটি সৃষ্টি “জোছনা করেছে আড়ি”। গাইছেন বেগম আখতার, কথা ও সুর দিচ্ছেন রবি গুহ মজুমদার।
জলসাঘর ছবিতে বেগম আখতার
কলকাতা তথা বাঙালি পরিবেশের সঙ্গে সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন বেগম আখতার। এই অন্তরঙ্গের কথা জানেন বহু মানুষ। কিন্তু রুপোলি পর্দার সেই মহীয়সীটিকে কি জানি আমরা? জমিদার বিশ্বম্বর রায়ের ছেলের উপনয়নের সেই সন্ধে। জলসাঘরে গানের আসরে দুর্গাবাঈ ধরলেন পিলু ঠুমরি। ‘ভরি ভরি আয়ি মোরি আঁখিয়া’। সুরকার উস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেব। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকে আশ্রয় করে সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের সেই গানের মায়াবি মাদকতায় আজও আচ্ছন্ন সংগীত রসিকেরা। সেই সঙ্গে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে দুর্গাবাঈ-এর চরিত্রে অভিনয় করা বেগম আখতার। সত্যজিতের অনুরোধ ফেলতে পারেননি তিনি।
জলসাঘর চলচ্চিত্রে ছবি বিশ্বাস
এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে আরও একটি ঘটনার কথা। কলকাতার তৎকালীন ডিক্সন লেনে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বাড়ির সেই আড্ডা, কিংবা রাত একটার সময় প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গান শুনতে যাওয়ার ঘটনার কথা আজ হয়তো কারোরই মনে নেই। তবুও বাঙালির হৃদয়ে দাগ কেটে নিয়েছে ‘জোছনা করেছে আড়ি’, ‘পিয়া ভোলো অভিমান’, ‘কোয়েলিয়া গান থামা’। আবার একইসঙ্গে ‘আই মোহাব্বত’, ‘উয়ো যো হাম মে তুম মে’ অথবা মির্জা গালিব রচিত ‘ইয়ে না থি হামারি কিসমৎ’ বাঙালির কাছে কোনোদিনই পুরোনো হবে না। কারণ ওই একটি কণ্ঠ। বেগম আখতার। যিনি গান ধরলেই সপ্তসুর তাঁর পায়ের কাছে এসে ধ্যান করত। চোখ বন্ধ করে এক মনে গান গেয়ে যেতেন সেই সুরসম্রাজ্ঞী। আজ কিংবদন্তি বেগম আখতারের ১০৯তম জন্মদিবস।