‘দক্ষিণেশ্বরী’ নিয়ে একটা কাজ শুরু করেছিলেন রামপ্রসাদী ঢঙে
সাল ১৯৩৯। ভারতের আহমেদাবাদ শহরে রবিশংকরের সর্বপ্রথম সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একক সেতার পরিবেশন অনুষ্ঠান। শুরুটা হয়েছিল সেই থেকে। ক্রমশ নিজেকে তুলে ধরেছেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ, সঙ্গীত স্রষ্টা, পারফর্মার এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেধাবী দূত হিসেবে। ১৯৪৫ সালের মধ্যে রবিশংকর সেতার বাদক হিসেবে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বীকৃতি পেয়ে যান। এই সময়ে রবিশঙ্কর তাঁর সাঙ্গীতিক সৃজনশীলতার অন্যান্য শাখায় পদচারণা শুরু করেন। সুর সৃষ্টি, ব্যালের জন্য সঙ্গীত রচনা এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। সেই সময়ের বিখ্যাত ‘ধরত্রী কি লাল’ এবং ‘নীচা নগর’ চলচ্চিত্র দুটির সঙ্গীত রচনা ও সুরারোপ করেন। ১৯৫০ হতে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত রবিশংকর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সঙ্গীত সৃষ্টিতে ব্যাপৃত ছিলেন। এ সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি সত্যজিৎ রায়ের অপু ত্রয়ী অর্থাৎ ‘পথের পাঁচালি’ (১৯৫৫), ‘অপরাজিত’ (১৯৫৭) এবং ‘অপুর সংসার’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা। পরবর্তীতে ‘চাপাকোয়া’ (১৯৬৬), ‘চার্লি’ (১৯৬৮) ও ‘গান্ধী’ (১৯৮২)-সহ আরও বহু চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন যার হদিস পাওয়া দুষ্কর।
১৯৩৮ সালে, আঠারো বছর বয়সে রবিশংকর তাঁর বড়ো ভাই উদয়শংকরের নাচের দল ছেড়ে মাইহারে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অমর শিল্পী আচার্য আলাউদ্দীন খান সাহেবের কাছে সেতারের দীক্ষা নিতে শুরু করেন। দীক্ষা গ্রহণকালে আচার্যের পুত্র সরোদ শিল্পী ওস্তাদ আলি আকবর খানের সংস্পর্শে আসেন। তাঁরা পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে সেতার-সরোদের যুগলবন্দী বাজিয়েছেন। গুরুগৃহে রবিশংকর দীর্ঘ সাত বছর সেতারে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষাকাল পরিব্যাপ্ত ছিল ১৯৩৮ হতে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত।
সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ শঙ্করলাল ভট্টাচার্য এ বিষয়ে আমাদের জানান, “‘ও ভগবান’ বলে একটি গান রবিশঙ্কর গেয়েছিলেন কোনো একটি বাংলা ছবিতে। কিন্তু সেটা কত সাল বা কোন গান- তা বলা মুশকিল। একটা তথ্য এ প্রসঙ্গে বলে নেওয়া জরুরি, ১৯৬৫ সালে পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত প্রথম ছবি ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’-এর সুর করেছিলেন রবিশংকর। সেই ছবি আজ আর কোথাও পাওয়া যায় না। দক্ষিণেশ্বরে আমরা একসঙ্গে একবার পুজো দিতে গিয়েছিলাম। ঠাকুর ঘরে উনি অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন। আমি ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম- কী চাইলেন ঠাকুরের কাছে? উনি তখন বললেন- পরমেশ্বরী, প্রাণেশ্বরী, উত্তমেশ্বরী এরকম ঈশ্বরী কনসেপ্ট নিয়ে সদ্য কাজ করছি। দক্ষিণেশ্বরী নিয়ে একটা কাজ করব রামপ্রসাদী ঢঙে। সেই সুরটাই ভাবছিলাম।”
এরকম কত কত স্মৃতি আজ বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। আজ পণ্ডিত রবিশংকরের জন্মদিন। এইদিন আমাদের প্রাণে বাজুক পণ্ডিত রবিশংকরের সেতারে ভেসে চলা রাগ-অনুরাগ। সঙ্গে থাকুক একটি গান। রবিশঙ্করের নিজের গাওয়া দুষ্প্রাপ্য সেই গান আমাদের সংস্থার নিজস্ব সংগ্রহে রয়েছে। আজ আমাদের পাঠক/শ্রোতাদের সঙ্গে আরেকবার সেই অমূল্য গান ভাগ করে নেওয়ার সময়।