দেশভাগের কঠিন সময়েও নিখিল ব্যানার্জীকে তালিম দিচ্ছেন আলাউদ্দিন খাঁ

নিখিল ব্যানার্জী শুধু একজন সেতার বাদক নন, নিঃসন্দেহে তিনি নিজেই আস্ত একটি ভাবনা

পণ্ডিত রবিশংকরের সঙ্গে সদ্য বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে অন্নপূর্ণা দেবীর। সংগীতের ধ্যান ও সাধনা থেকে চির বিদায় নিয়েছেন অন্নপূর্ণা। বেশ কয়েকবছর পর মুম্বাইয়ের সমুদ্র সৈকতের কাছে নিজস্ব আয়োজনে একটি সংগীত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করলেন শিষ্যদের তালিম দিতে। রবিশংকর এবং অন্নপূর্ণা দেবীর ছেলে শুভেন্দ্রশংকর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় অকালে মারা গেলেন। আবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন অন্নপূর্ণা দেবী। এরকম অবস্থায় প্রখ্যাত সেতার বাদক উস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ তাঁর ভাগ্নে নিখিল ব্যানার্জীকে সংগীতে তালিম নেওয়ার জন্য অন্নপূর্ণার শিষ্যত্ব গ্রহণে পাঠালেন। সেই শুরু। শুভেন্দ্রর মতো নিখিলও অকালে মারা যাবেন তারপর। অন্নপূর্ণা দেবী আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন। সেসব পরবর্তী ঘটনা। কিন্তু এর মাঝের সময় ভারতীয় রাগ সংগীতে রাজত্ব করে গেছেন পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী। 

আজীবন তিনি গুরু মেনে এসেছেন আলাউদ্দিন খাঁ, আলি আকবর খাঁ, আমির খাঁ-দের। পরবর্তীতে প্রভাবিত হয়েছেন ওংকারনাথ ঠাকুর, ফাইয়াজ খাঁ, কেশরীবাই কেরকার এবং রোশনারা বেগমের সেতার-ধ্বনিতে। একটি সাক্ষাৎকারে নিখিল ব্যানার্জী বলেছিলেন, “তোমাকে সবার প্রথমে মাথায় রাখতে হবে, ভারতীয় সংগীত গড়ে উঠেছে আধ্যাত্মবাদের ওপর ভিত্তি করে। অনেকেই সেটাকে ধর্ম মনে করে – আমার মতে যা একেবারেই ভুল ভাবনা। ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা এক নয়। পরম সত্যকে জানার আগ্রহ থেকেই ভারতীয় সংগীত শেখা হয়, অনুশীলন করা হয়। মীরাবাই, দক্ষিণের ত্যাগরাজ, হরিদাস স্বামী, বৈজু – এই মহান সংগীতশিল্পীরা সবাই ছিলেন রমতা সাধু। তাঁরা কখনো সমাজের ভিতর ঢোকেননি। তাঁদের সাধনা ছিল সমাজ থেকে অনেক দূরে।”

নিখিল ব্যানার্জী শুধুমাত্র একজন সেতার বাদক নন, নিঃসন্দেহে তিনি নিজেই আস্ত একটি ভাবনা। যে ভাবনা থেকে প্রতিদিন আপামর সাধারণ মানুষ বাঁচার রসদ খোঁজেন। খোঁজেন শরীরে প্রতিটি হাড়ের সঙ্গে মিশে চলা সুর-লয়ের ধ্বনি। তাঁর সেতারে চাঁদ ওঠে আকাশে। খানিকক্ষণ নিজের সঙ্গে বুঁদ হয়ে একা একা ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়ানো যায়। স্বচ্ছ করতোয়া সঞ্চারিত হয় অস্থি-মজ্জায়। প্রাচ্যের ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সংগীতকে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন নিজস্ব দেশীয় মেজাজে। আহির ভৈরব, আশাবরী, পুরিয়া কল্যাণ, মিয়াঁ কি মালহার – তাঁর হাতে জাদু পেয়েছে। তখন দেশভাগ। ১৯৪৭-এর সময়। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে কান্নার কলরোল। এই বাধ্য ছেলেটি তখন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের নিয়মানুবর্তিতায় সংগীত সাধনে মত্ত। দেশভাগের যন্ত্রণার মধ্যে মিশে যাচ্ছে রাগ সংগীত। আলাউদ্দিন খাঁ শেখাচ্ছেন সেতার। ছাত্রের আসনে বসে রয়েছেন নিখিল ব্যানার্জী-সহ আলি আকবর খাঁ, আশিস খাঁ, সরোদে বাহাদুর খাঁ ও বসন্ত রাই, সেতারে রবিশংকর, সুরবাহারে অন্নপূর্ণা দেবী, বাঁশিতে পান্নালাল ঘোষ। 
 

Developed by DXDasia