November 29, 2017 | 9:21 PM

জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্কর এবং ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’

‘কনসার্টের ফলে পাকিস্তানি হিটলারদের কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে পড়ছিল’

একজন জনপ্রিয় গায়ক এবং গিটারিস্ট মানবতার মূর্ত প্রতীক জর্জ হ্যারিসন। যার প্রতিভা কেবলমাত্র এ দু’য়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বিচরণের ক্ষেত্র ব্যাপ্ত ছিল সঙ্গীত পরিচালনা, রেকর্ড প্রযোজনা এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনা অব্দি। বিখ্যাত ব্যান্ড সঙ্গীত দল দ্য বিটল্‌স এর চার সদস্যের একজন হিসেবেই তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তার আরো একটি পরিচয় তাকে বিশ্বের ইতিহাসে একজন যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাকে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়। না, তিনি অস্ত্র হাতে নন, গিটার আর গান দিয়ে যুদ্ধ করেছেন খুব দূরের অচেনা কিছু মানুষের জন্য। যার প্রাপ্তি স্বরূপ (২০১২ সালের ২৭ মার্চ) বাংলাদেশ সরকার তাকে একজন বিদেশী শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখার জন্য মরণোত্তর স্বাধীনতা সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করেন।

জর্জ হ্যারিসনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে তার প্রিয় বন্ধু প্রয়াত বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক রবিশঙ্কর এবং তাঁর কনসার্ট ফর বাংলাদেশের কথা।

১৯৭১। যুদ্ধের বিভীষিকায় রক্তাক্ত বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার ফলে প্রায় এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নেয়। এতো বিপুলসংখ্যক শরণার্থীদের ভরণ-পোষণ করতে গিয়ে ত্রাণ-সামগ্রীর অপ্রতুলতা দেখা দেয়। শরণার্থী জীবন এমনিতে দুর্বিষহ। চুপ করে বসে থাকতে পারেননি বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। তিনি কথা বললেন জর্জ হ্যারিসনের সাথে।

রবিশঙ্কর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হ্যারিসনকে যুক্তরাষ্ট্রে দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজনের কথা বললেন। হ্যারিসন অকুণ্ঠ চিত্তে বন্ধুর প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাঁর বন্ধুদের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে কনসার্টের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। হ্যারিসন সবার আগে তাঁর আগেকার দল বিটলসের সদস্যদের কনসার্টে যোগ দিতে বলেন। পল ম্যাকার্টনি সরাসরি অস্বীকৃতি জানান, কেননা তখন দলের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। জন লেলন অনুষ্ঠানে আসতে রাজি ছিলেন, কিন্তু সে সময় আদালতে তাঁর সন্তানের ব্যাপারে স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সাথে আইনি লড়াই চলছিল। আর মিক দ্যাগার ছিলেন ফ্রান্সে, ভিসা জটিলতার কারণে তাঁর পক্ষেও কনসার্টে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষতক বিটলসের একমাত্র রিঙ্গোস্টার যোগ দিতে সক্ষম হন। সাথে আরো যোগ দেন – বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি ব্রিস্টন, হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রীরা সহ আরো অনেকে।

বিটলস যখন ভেঙে খান খান হয়ে গেল তখন সবার আবারও এক মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর জর্জ হ্যারিসন প্রথম বারের মতো পারফর্ম করেন কনসার্ট ফর বাংলাদেশে। এরিক ক্ল্যাপটনের অবস্থা ছিল খুব খারাপ, তিনি হেরোইন আসক্ত ছিলেন, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে তিনি সর্বশেষ মঞ্চে পারফর্ম করেন। মাদকাসক্তির জন্য তিনি কনসার্টের কোনো অনুশীলনে অংশ নিতে পারেননি। যখন মনে করা হচ্ছিল তাঁকে বাদ দিয়ে কনসার্ট করতে হবে ঠিক সেই মুহূর্তে শব্দ নিরীক্ষার সময় উদয় হন। আরেক বিশ্বখ্যাত শিল্পী বব ডিলানও প্রায় দু’বছর পর পারফর্ম করতে আসেন। ১৯৭১ সালের আগস্টের প্রথম দিনে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের ৪০ হাজার আসনের মধ্যে একটিও খালি ছিল না। দর্শকদের এই অভূতপূর্ব সাড়ায় শিল্পীরাও উজ্জীবিত।

বিকেল থেকে অনেক রাত অব্দি কনসার্টটি দুভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্বে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও তাঁর দলের পরিবেশনা এবং শেষ পর্বে হ্যারিসন ও অন্যদের প্রথমে মঞ্চে আসেন রবি শঙ্কর ও আলী আকবর খান। তারা মাত্র ৯০ সেকেন্ডের ধুন বাজান। দর্শক শ্রোতারা মনে করেছিল তারা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি ধুন শুনে ফেলেছেন। কিন্তু দর্শকদের ভুল ভেঙে দেন স্বয়ং রবিশঙ্কর। তিনি বললেন, আপনাদের বাদ্য যন্ত্র টিউন করাটা যদি এতো ভালো লাগে, তাহলে আসল ধুনটি আরো ভালো লাগবে। সেতারে রবিশঙ্কর, সরোদে ওস্তাদ আলী আকবর খান যন্ত্রসঙ্গীতের মাধ্যমে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সূচনা ঘটে। তাঁদের তবলায় সঙ্গত করেন ওস্তাদ আল্লা রাখা খান, তানপুরায় ছিলেন কমলা চক্রবর্তী। তাঁরা বাংলা ধুন নামে একটি ধুন পরিবেশন করেন।

এরপর মঞ্চে আসেন জর্জ হ্যারিসন ও অন্যান্যরা। তারা একে একে পরিবেশন করেন-ওয়াহ-ওয়াহ, সামথিং, দ্যাট’স দ্য ওয়ে গড প্লেনেড ইট, ইট ডোন্ট কাম ইজি, বিওয়ার অব দ্য ডার্কনেস, হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস, জাম্পিন জেক ফ্লাশ, ইয়ংব্লাড, হেয়ার কামস দ্য সান, অ্যা হার্ড রেইন’স অ্যা গোন্না ফল, প্লেইন ইন দ্য উইন্ড, ইট টেকস অ্যা লট টু লাভ-ইট টেকস অ্যা ট্রেন টু ক্লাই, জাস্ট লাইক অ্যা উইমেন, মাই সুইট লর্ড, অ্যাওয়েটিং অন ইউ, অল, লাভ মাইনাস জিরো, হেয়ার মি লর্ড, মি. টাম্বোরিন ম্যান, কনসার্টের ইতি টানা হয় জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ’ দিয়ে। কনসার্টের জন্য গানটি বিশেষভাবে রচিত হয়। কনসার্টে পারফর্মকারীদের মধ্যে রয়েছেন – রবিশঙ্কর, আলী আকবর খান, আল্লারাখা খান, কমলা চক্রবর্তী, জর্জ হ্যঅরিসন, রিঙ্গোস্টার, লিয়ন রাসেল, বিলি প্রিস্টন, এরিক ক্ল্যাপটন, বব ডিলান, ক্লস বোরম্যান, জিম কেল্টনার, ব্যাড ফিঙ্গার, পিটি হাম, টম ইভান্স, জোরি মোলাও, মাইক গিবসন, জেসি অ্যাড ডেভিস, ডন প্রিস্টন, ডন নিক্স, জো গ্রিন, মার্লিন গ্রিন, ডলরেস হল, ক্লডিয়া লিনিয়ার প্রমুখ। ১৯৭১ সালের শেষের দিকে কনসার্টটি অডিও আকারে প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ। এটির পরিচালনায় আসল সুইমার, প্রযোজনায় হ্যারিসন ও অ্যালেন ক্লেইন।

হ্যারিসনকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন – দুনিয়াতে এতো সমস্যা থাকতে আপনি কেন এ ব্যাপারে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহায়তা কিছু করার জন্য আগ্রহী হলেন? প্রত্যুত্তরে হ্যারিসন বলেন, আমার এক বন্ধু সহায়তা চেয়েছেন। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করি। জর্জ হ্যারিসন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আইসি মাইন’-এ লিখেছেন… ‘গীতিকার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, মূলত গান লিখেছি মন থেকে কিছু বের করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আমি মনে করি কিছু লেখক আছেন যাদের কাছে তাদের অনুভূতি কিংবা অভিজ্ঞতার বর্ণনাটা যথেষ্ট নয়, তাদের কাছে এটা একটা শৈল্পিক কর্ম। যেসব ভারতীয় সঙ্গীত এখন আমরা শুনছি, তা সরাসরি সঙ্গীতজ্ঞের আবেগ বহন করে। সেজন্য গীত রচনা আমার কাছে সেই আবেগকে ছাপিয়ে ওঠার একটা মাধ্যম, ওই মুহূর্তের, ওই সময়ের।

তেমনি একটি গান ‘বাংলাদেশ’-যা ওই সময়ের। দুঃসময়ের, দুঃখ ভারাক্রান্ত সত্তুরের।… আমরা বাংলাদেশের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা যখন কনসার্টটি করছিলাম, তখন মার্কিন সরকার পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছিল। প্রতিদিন হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছিল কিন্তু সংবাদপত্র সমূহে লেখা হচ্ছিল সামান্যই।…

আমাদের কনসার্টের ফলে বাংলাদেশ অনেক প্রচার পেয়েছিল, পরবর্তীতে ঘটনাপ্রবাহ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। কনসার্টের ফলে পাকিস্তানি হিটলারদের কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে পড়ছিল।’ 

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে ভিন্ন দ্যোতনা যুক্ত করে। বাংলাদেশের বিজয় অর্জন ত্বরান্বিত করতে এই কনসার্ট অনন্য ভূমিকা রাখে।

(ঋণ – ইস্টিশান ব্লগ)

Developed by DXDasia