
‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো, পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’
আমাদের বাড়িতে নিয়মিত যেমন পুজোর নতুন গানের বই আসত, তেমন রেকর্ডও কেনা হত। দুপুরে বৈঠকখানা ঘরটিতে (গানবাজনা, আড্ডা এ সবে ড্রয়িং রুম, লিভিং রুম কেমন কেতাবী আর অসহ্য শোনায়) জানলা দরজা বন্ধ করে আমি চেয়ারে গা এলিয়ে আর সামনে রাখা গোল টেবিলে পা এলিয়ে ওই সব গান শুনতাম। সে গানের সম্ভারে এক দম্পতি ছিলেন। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়-উৎপলা সেন। দুজনেই আবার আমার বাবারও খুব প্রিয়। ভালোলাগা ভালোবাসার ক্ষেত্রগুলি যখন একই পরিবারের সদস্যদের কাছে একই রকম হয়, তখন সে শখ পূরণের সুবিধে থাকে অনেকই বেশি।বই বা গানের ক্ষেত্রে তাই আমার কুবেরের ভাণ্ডার ছিল অফুরান। উৎপলা বড় মধুকন্ঠী। অনেক গানই আমাদের খুব প্রিয় ছিল (এবং এখনও আছে), যেমন রামধনু আকাশের গায় ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়, এত মেঘ এত যে আলো, ও পারে তুমি শ্যাম এ পারে আমি (এই গানটিতে আবার সতীনাথ দু-কলি গাইতেন.. ও পারে তুমি রাধে এ পারে আমি ) ইত্যাদি। সতীনাথের মনে হয় কোনো গানই খারাপ লাগার জায়গা ছিল না আমাদের। জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো, পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম, যদি সহেলী আমায় কানে কানে কিছু বলে …আমরা পাগলের মতো ফিরে ফিরে শুনতাম। এক সময়ে সতীনাথের সঙ্গে সম্ভবত কিছু মনোমালিন্যের কারণে হিজ মাস্টার্স ভয়েস -এর 'শারদ অর্ঘ্য' সম্ভারে সতীনাথ-উৎপলাকে আর দেখা গেল না। দুজনের নতুন রেকর্ড বেরোতো মেগাফোন থেকে। সেই সময় থেকে আমাদের বাড়িতে মেগাফোনের পুজোর গানের বই রাখা শুরু হল।
কয়েক বছর পরে একটি বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গেছি। খেতে বসেছি। ও মা, আমার কলাপাতায় (তখন কলাপাতা আর মাটির খুরির আমল এবং কোমরে গামছা বাঁধা পরিবেশনকারী পাড়ার ছেলেরা ..হাতে কাঠের বারকোশে লুচি, আর পিতলের বালতিতে মাংস ইত্যাদি নিয়ে ) জলের খুরি উল্টে গেল প্রবল উত্তেজনায়। ঠিক মুখোমুখি ধুতি আর সিল্কের পাঞ্জাবিতে সোনার বোতামে সতীনাথ আর গাঢ় বেগুনী বেনারসীতে উৎপলা। উৎপলার বেনারসী এখনো চোখ বুজে দেখতে পাই। আর তা কিন্তু আমি মেয়ে বলে শাড়ি -হ্যাংলা ..সে জন্য নয়। মনে আছে ফিসফিস করে মাকে বলেছিলাম, " গলায় জরির নকশা আর শাড়িতেও!
তবে সতীনাথের একটি গান অন্য সব গান ছাপিয়ে আজও আমার ভেতরে ঝুমঝুমিয়ে বেজে যায় … যখন তখন …। এই গানটি ছিল একটি ই পি রেকর্ডের একপিঠে। বাণী : পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর: শিল্পীর নিজের।
আজ সেই অপেক্ষাকৃত অল্পশ্রুত গানটি এখানে রেখে গেলাম…
