
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে নিজেই ট্যুইটারে পোস্ট করেছিলেন ক্যামেরা হাতে নিজের ছবি
চোখ আটকে বইয়ের পাতায়। এক মনে পড়ে চলেছেন। নিমগ্ন পাঠক। ঠিক সেই সময়ে ক্লিক করে উঠল ক্যামেরা। শাটারে চাপ। দুরন্ত টাইমিং!
ছবির ‘পোজ’ মানে, ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে ছবিতে তিনি নিজেই নিজের ছবির ক্যামেরাম্যান। সবটাই টাইমারের কামাল! সেই ভরসাতেই উঠেছিল নিখুঁত ‘সেলফি’!
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে একবার নিজেই ট্যুইটারে পোস্ট করেছিলেন ছবিখানা। ১৯৫০-এ তোলা। ছবির তলায় দু’তিন কথায় ছবি তোলার গপ্পো।
নমস্কার, শেয়ারিং মাই ‘সেলফ ক্লিকড’ পিকচার…’।
গপ্পো কোথায় সে যে আসলে ক্যামেরার প্রতি টইটুম্বুর ভালবাসা। সেই ক্যামেরাপ্রেমী আর কেউ না, সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর।

‘সেলফি’
ভীষণ শখ ছিল ছবি তোলার। ফটোগ্রাফি প্যাশন। ১৯৪৬ সালে একটা রোলেইফ্লেক্স ক্যামেরাও কিনে ফেলেছিলেন। ২ হাজার টাকা দাম। সেই সময়ে ২ হাজার বেশ দামী অঙ্ক। খুব উত্তেজনা নতুন ক্যামেরা নিয়ে। মনের আনন্দে শাটারে ক্লিক চলত। রেকর্ডিং স্টুডিয়ো থেকে বাড়ি যেখানেই যেতেন সঙ্গী হত সেই ক্যামেরা।
নিজের ফটোগ্রাফি নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসও ছিল। ভেবেছিলেন ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি বেশ ভালোই। তাঁর নিজের কথাতেই, “আমি ভেবেছিলাম আমি ভালো”। তাঁকে দেখলেই আলোকচিত্রীরা ক্যামেরা তাক করত, বারবার অন্য কেউ তাঁর ছবি তুলত, এই ব্যাপারটা খুব একটা ভালো লাগত না। তবে এই ভাবনাটা চলেছিল যতদিন পর্যন্ত না বিখ্যাত ফটোগ্রাফার গৌতম রাজাধ্যক্ষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় ততদিনই।
১৯৪৬ সালে একটা রোলেইফ্লেক্স ক্যামেরাও কিনে ফেলেছিলেন। ২ হাজার টাকা দাম। সেই সময়ে ২ হাজার বেশ দামী অঙ্ক। খুব উত্তেজনা নতুন ক্যামেরা নিয়ে। মনের আনন্দে শাটারে ক্লিক চলত।
একটা সময় গৌতম রাজাধ্যক্ষের কাছ থেকে নিয়মিত ফোন আসতে থাকলো তাঁর কাছে। তিনি লতার ছবি তুলতে চান। যতবারই প্রস্তাব আসে ততবারই এড়িয়ে যান লতা।
একবার আর সেটা পারলেন না। একটা বাংলা ছবির জন্য গান রেকর্ড করছিলেন। সলিল চৌধুরীর সুরে গান। স্টুডিয়োতে কাজ চলছে পুরো দমে। হঠাৎ সেখানে হাজির গৌতম রাজাধ্যক্ষ। এসেই ক্যামেরা অন। তাঁর বিষয় ‘লতা’।
গৌতম রাজাধ্যক্ষের তোলা লতার ছবি আজও মুগ্ধ করে লতাপ্রেমী এবং ছবিপ্রেমী উভয়কেই। কিন্তু সেই ছবি দেখে লতা নিজে মোটেও খুব একটা খুশি হননি। সেই ছবি যে অত্যাধিক ভাল। অসম্ভব মায়া প্রতি ফ্রেমে। সেই ছবি দেখার পর গিয়ে তাঁর নিজের তোলা ছবি আর তাঁর চোখে লাগেনি যেন।
গৌতম রাজাধ্যক্ষের ছবি দেখার পর নিজের তোলা ছবি আর ভালো লাগেনি তাঁর। লতার নিজের কথায়, “আমার তোলা ছবির থেকে ওই ছবিগুলো অনেক ভালো ছিল।” মজা করে বলেছিলেন কিন্তু তারপর থেকে নাকি তিনি ছবি তোলা বন্ধ করে দেন।
ক্যামেরার প্রতি তাঁর ভালবাসা একেবারে ছোট্টবেলা থেকে। মানুষের মুখ, সেই মুখে আবেগের ছাপ, সহজ অনুভূতির প্রকাশকে ফ্রেমবন্দি করতে খুব ভালো লাগত। আলো-ছায়া খেলা করত ছবিতে। ক্যামেরা, লেন্স, ফিল্ম, আলোর ব্যবহার এই দিকগুলো নিয়ে যথেষ্ট চর্চাও করতেন। প্রতিদিন তাঁর জীবনে ঘিরে থাকা মানুষ আর মুহূর্তদের ক্যামেরায় ধরে রাখতেন। পরিবার-পরিজন-ঘনিষ্ঠ মানুষ, সহকর্মী সকলেই তাঁর ছবির বিষয়।
একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করছিলেন লতা। সঙ্গে ছিলেন আর এক তারকা হরিশ ভিমানী। মানে, মহাভারত ধারাবাহিকের বিখ্যাত সময়। তাঁর কণ্ঠ দিয়েই, শুরু হত মহাভারত… “ম্যায় সময় হুঁ”।
যাইহোক, যতক্ষণ বিমানে ছিলেন বেশিরভাগ সময়টাই তাঁদের কথা হয়েছিল ফটোগ্রাফির নানা খুঁটিনাটি নিয়ে। ছবির ফ্রেম আর টেকনিক নিয়ে যেভাবে বিশদ ব্যাখ্যা করেছিলেন লতা তাতে চমকে গিয়েছিলেন হরিশ!
অটোমেটিক ক্যামেরা কোনওদিন তাঁর প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। অ্যাপারেচার, শাটার, আর লাইটিং যেখানে আলাদা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তেমন ক্যামেরা তাঁর সব সময়ের পছন্দ। একবার লন্ডনে ছুটন্ত গাড়ি থেকে হাই শাটার স্পিডে ক্যামেরাব্নদি করেছিলেন বিগ বেন।
নতুন ধরনের ক্যামেরা দেখলেই সংগ্রহ করতেন। বিদেশে গিয়েও খোঁজ করতেন পছন্দের মডেলের। প্রফেশনাল ক্যামেরার সংগ্রহ ছিল তাঁর। কোনওদিনই নিজেকে শুধুমাত্র অ্যামেচার ফটোগ্রাফার ভাবেননি।
তাঁর নিজের কথায়, “আমি সব জায়গা থেকে শিখতে চেয়েছি। আমার ফটোগ্রাফি ভালো লাগত, তাই এটি বেশি সিরিয়াসভাবে নিয়েছিলাম। একের পর এক ক্লিক করে যাওয়ায় বিশ্বাস করি না। চোখ যা দেখছে তাকে বিশ্বাস যোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে…”।
কোনওদিন ক্যামেরার প্রতি টান এতটুকু কমেনি। ঘনিষ্ঠ মানুষদের কাছে তাঁর সেই শখ খুব অচেনা ছিল না। বাড়িতেও নিজের তোলা ছবির সংগ্রহ দেখার মতো। একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যদি সংগীতশিল্পী না হতেন, তাহলে হয়তো আলোকচিত্রী হতেন।
তথ্যসূত্রঃ National Herald, The Paperclip
ছবিসূত্রঃ Lata Mangeshkar’s twitter, Instagram Profile
