গগনেন্দ্রনাথের পুত্র কণকেন্দ্রনাথের নাতনি হলেন শর্মিলা, জন্মের তিনবছর আগেই মারা যান রবীন্দ্রনাথ
‘পথের পাঁচালি’ আর ‘অপরাজিত’র পর সত্যজিৎ রায়ের খুব ইচ্ছে ছিল ‘অপু’কে নিয়ে আরও একটা ছবি করার। সেই মতো ভাবা হয় ‘অপুর সংসার’। অপু, অপুর স্ত্রী অপর্ণা, তাদের ছেলে কাজল, অপুর বন্ধু পুলু ইত্যাদি চরিত্রে পেশাদার নয় বরং একদম নতুন মুখ খুঁজেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর এভাবেই সত্যজিৎ রায়ের সহকারী নিমাই দত্ত, অপুকে খুঁজতে গিয়ে এক তরুণকে হাজির করেন তাঁর সামনে। সদ্য কলেজ পাশ করা সেদিনের সেই তরুণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে কে হবে অপর্ণা! এই খোঁজে কাগজে বিজ্ঞাপন দিতেই ১৫-১৭ বছর বয়সী মেয়েদের ফটোগ্রাফ জমা পড়ে হাজার খানেক। কিন্তু কপালে শিঁকে ছিঁড়ল না এদের কারওরই। অবশেষে চিলড্রেন’স লিটল থিয়েটারে নাচ করা এক ছোট্টখাট্টো মেয়েকে পছন্দ হয় সত্যজিৎ জায়া বিজয়া রায়ের। হলুদ রঙের ফ্রক পরা, বব ছাঁট চুলের সে মেয়ে ম্যাজিকের মতো তারপর চরিত্রে ঢুকে পড়ল। বাঙালি ঘরের হেঁশেলে কালো ধোঁয়া ও দমকা আলোর সৌন্দর্য আঁকা হয়ে থাকল সেই মেয়ের গালের টোলে। সিনেমাপ্রেমী ভারতীয় বাঁধা পড়ল অপর্ণারূপী ১৩ বছরের কিশোরী শর্মিলার সহজতায়।
সত্যজিৎ রায়ের নায়ক ছবিতে উত্তমকুমারের সঙ্গে শর্মিলা
সম্পর্কে যিনি রবীন্দ্রনাথের বংশের একজন সদস্য। জোড়সাঁকো ঠাকুরবাড়ির গগনেন্দ্রনাথের পুত্র কণকেন্দ্রনাথের নাতনি হলেন শর্মিলা। তাঁর জন্মের বছর তিনেক আগেই মারা যান রবীন্দ্রনাথ। তাই চোখে না দেখলেও মায়ের মুখে গল্প শুনে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম চেনা শর্মিলার।
শর্মিলা ঠাকুর, এমনই এক দীপ্তির নাম যাকে কেবল রূপগত সৌন্দর্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা চলে না। মনন, বুদ্ধি আর প্রবল ব্যক্তিত্বের মোড়কে জীবনের সৌন্দর্য যিনি বছরের পর বছর বহন করে চলেছেন তাঁরই নাম শর্মিলা ঠাকুর। সম্পর্কে যিনি রবীন্দ্রনাথের বংশের একজন সদস্য। জোড়সাঁকো ঠাকুরবাড়ির গগনেন্দ্রনাথের পুত্র কণকেন্দ্রনাথের নাতনি হলেন শর্মিলা। তাঁর জন্মের বছর তিনেক আগেই মারা যান রবীন্দ্রনাথ। তাই চোখে না দেখলেও মায়ের মুখে গল্প শুনে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম চেনা শর্মিলার। তবে, কলকাতায় নয়, শর্মিলা ঠাকুরের জন্ম হায়দ্রাবাদে। বাবা গীতিন্দ্রনাথ ও মা ইরা বড়ুয়া দুজনেই ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনষ্ক। কাজের সূত্রে এঁরা আসানসোলে এলে সেখানেই ছোটোবেলা কাটে শর্মিলা ও তাঁর দুই বোন ঐন্দ্রিলা ও রমিলার। জন’স্ ডায়াসেশন ও লরেটো কনভেন্টের ছাত্রী ১৩ বছরের শর্মিলার প্রথম সিনেমায় আসা বাবার সহযোগিতা ও উৎসাহেই। সামাজিক নিয়মের রাঙা চোখকে উপেক্ষা করে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় সিনেমাকে ‘শর্মিলা’ নামের এই রত্ন উপহার দিয়েছিল।
দেবী চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায়
স্বপ্নের মতো ছিল সেসব দিন। নির্বাচিত হওয়ার পর কিশোরী শর্মিলা সত্যজিৎবাবুকে বললেন, “কীভাবে অভিনয় করতে হয়, সেটা আপনি দেখিয়ে দেবেন?”। উত্তর এসেছিল, “ও নিয়ে তোমায় একটুও ভাবতে হবে না।” সেই অর্থে সত্যজিতের হাতে জন্ম নেওয়া অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠানে আজকের প্রবীণ অভিনেত্রী শর্মিলা বলেছেন সে কথা, “রোমিও জুলিয়েটের পরে কয়েক দশক ধরে অপুর সংসারের অপু-অপর্ণা ছিল সবচেয়ে রোম্যান্টিক জুটি।” তাঁদের জীবনের সারল্য, সহজ জীবনের ছবিই সিনেমায় প্রতিভাত হয়েছিল ১৩ বছরের শর্মিলা ও ২৩ বছরের সৌমিত্রের মধ্যে। ‘অপুর সংসার’ তাই সে অর্থে এঁদের অভিনয় জীবনের ল্যান্ডমার্ক। এরপর সত্যজিতের পরিচালনায় ‘দেবী’-তেও মূল চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর। আর কিছু ভাবার সুযোগ ছিল না। অভিনয়ই যে করবেন শর্মিলা তা স্থির করে ফেলেন একেবারে। ১৯৬৩-তে একই বছরে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত তিনটি অসামান্য ছবি, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘নির্জন সৈকতে’ ও ‘ছায়াসূর্য’। পথ প্রশস্ত হচ্ছিল ধীরে ধীরে, তাই ছায়াসূর্যের ভাগ্য বিড়ম্বিত ঘেঁটু কিছুদিন পরেই পরিচালক শক্তি সামন্তের হাতে ‘কাশ্মীর কি কলি’-তে পরিণত হয়ে সারা ভারতের হৃদয়ে দোলা দিল। তখন থেকেই শর্মিলা রীতিমতো ‘স্টার’। একের পর এক সাড়া ফেলে ‘ওয়াক্ত’, ‘অনুপমা’, ‘শাওয়ান কি ঘটা’, ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’। অন্যদিকে বাংলায় তখন শর্মিলা মহানায়ক উত্তমকুমার-এর বিপরীতে ‘নায়ক’-এর সাংবাদিক অদিতি, যার বুদ্ধিদীপ্ত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় আট থেকে আশি। বানিজ্যিক সাফল্যে দারুণভাবে সফল ‘আরাধনা’ শর্মিলাকে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান এনে দেয়। একটা সময়ে শর্মিলা ঠাকুর মানেই সে ছবি বাণিজ্যিকভাবে সফল এ কথা নিশ্চিত ছিল প্রায়। বলিউডে ‘মেরে হামদাম মেরে দোস্ত’, ‘তালাশ’ কিংবা বাংলায় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘অমানুষ’, অথবা ‘আনন্দ আশ্রম’; শর্মিলা ঠাকুর মোহিত করে রাখেন সর্বত্র। একটা সময়ে বম্বে সিনেমায় শুরু হয় রাজেশ খান্না-শর্মিলা ঠাকুর যুগ। ‘সফর’, ‘অমরপ্রেম’, ‘রাজারানি, ‘দাগ’-এর মতো ছবি সে যুগের প্রমাণ। অমিতাভ বচ্চন, শশী কপুর-সহ সে সময়ের বলিউডের বহু তারকা অভিনেতা শর্মিলার নায়ক হয়েছেন বারবার।
আনন্দ আশ্রম ছবিতে উত্তমকুমারের সঙ্গে
নির্বাচিত হওয়ার পর কিশোরী শর্মিলা সত্যজিৎবাবুকে বললেন, “কীভাবে অভিনয় করতে হয়, সেটা আপনি দেখিয়ে দেবেন?”। উত্তর এসেছিল, “ও নিয়ে তোমায় একটুও ভাবতে হবে না।” সেই অর্থে সত্যজিতের হাতে জন্ম নেওয়া অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর।
ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের প্রধান হওয়া, কান চলচিত্র উৎসবের জুরি মেম্বার, ‘পদ্মভূষণ’ প্রাপ্তি এমন বহু সম্মান, পুরস্কার শর্মিলা পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। তবে জীবন তাঁকে অনেক আগেই দিয়েছিল আরও একটি বিশেষ উপহার, আজীবনের এক বন্ধু পতৌদি নবাব মনসুর আলি খানকে। ১৯৬৯-এ বিয়ে হয় মনসুর পতৌদি ও শর্মিলার। মনসুর তখন ভারতীয় ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক। দুটি ভিন্ন জগতের মানুষের এ বিয়ে টিকবে না এমন আশঙ্কা করার লোক এখনকার মতো তখনও কিছু কম ছিল না। কিন্তু শত্রুর মুখে মুঠো মুঠো ছাই দিয়ে ২০১১ সালে পতৌদির মৃত্যু পর্যন্ত তাঁদের অটুট দাম্পত্য জীবন অনেক সেলেব জুটির কাছেই ছিল ঈর্ষনীয়। এই বিয়ের জন্য স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন শর্মিলা। নবাব পতৌদি তাঁর স্ত্রীর নতুন নাম রাখলেন, শর্মিলা হলেন ‘বেগম আয়েশা সুলতানা’। পুরো বিষয়টিই শর্মিলার মননে ও চিন্তনে খুব ইতিবাচক ছায়া ফেলে। কারণ প্রথাগত ধর্মের পরিচিত কিছু নিয়মাচার ও বন্ধনে কোনোদিনই বাঁধা পড়েনি তাঁর মন। তাই খুব সহজেই শর্মিলা বলেন, ‘আগে আমি বেশি কিছু জানতাম না ধর্মের বিষয়ে, বিয়ের পর আমি ইসলাম নিয়েও জেনেছি আর হিন্দুত্ব নিয়েও অনেক বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে’। এই শর্মিলাই তাই বোধহয় সত্তর ঊর্দ্ধ বয়সে ‘এনআরসি’ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান জানালে আমজনতা আজও নড়েচড়ে বসেন। তাঁর গদ্যপাঠ, তাঁর বক্তৃতা এমনকি সাধারণ কথাতেও জীবনের প্রতি তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছলকে ওঠে বারবার।
ঋতুপর্ণ ঘোষের শুভ মহরৎ ছবিতে রাখি গুলজার এবং শর্মিলা ঠাকুর
আসলে, ‘শর্মিলা’ নামের উচ্ছ্বাস ও ম্যাজিকে পৃথিবীর যে কোনো পবিত্র সৌন্দর্য ধরা পড়ে। আজ, ভারতবর্ষের সেই সৌন্দর্যের জন্মদিন যার হাসিতে, স্পষ্ট উচ্চারণে চিরকাল বাঁধা আছে সূক্ষ্ম মনন ও পরিশীলিত চিন্তন। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হয়ে সেই সৌন্দর্য সারা পৃথিবীতে এই বয়সে আজও তাঁর সারল্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
