
এনআরসি একেবারেই বিজেপির গোপন অ্যাজেন্ডা নয়
অসমের জনসংখ্যার ৬ শতাংশ মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়েছে। সংখ্যাটা ১৯ লক্ষের বেশি। এরা প্রায় সবাই বাঙালি। বলা হচ্ছে বেআইনি ভাবে যারা অসমে আছেন, তাঁদের খুঁজে বের করতে, ১৯৮৫ সালের অসম চুক্তি মেনে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস তৈরি করা হয়েছে। প্রথম যে তালিকা তৈরি হয়েছিল তাতে বাদ পড়েছিল প্রায় ৪০ লক্ষ। দ্বিতীয় দফায় সেটা কমে হয়েছে ১৯ লক্ষের কিছু বেশি। বিজেপি সারা দেশে এনআরসি করতে চায় বলে বারবার বিবৃতি দিলেও, গত লোকসভা ভোটের আগে অমিত শাহ্ বারবার তাঁর বক্তৃতায় এই রাজ্যে এনআরসি করার কথা বলেছেন। অন্য রাজ্যের বক্তৃতায় বিষয়টা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ দিল্লিতে বলেছেন, এই রাজ্যে এনআরসি হবে এবং তিনি সেখানেই থামেননি, বলেছেন, দু’কোটি অবৈধ বসবাসকারীকে খুঁজে বের করা হবে। ১২ সেপ্টেম্বর তৃণমূল কংগ্রেস এনআরসির প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করে। মিছিলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস মন্তব্য করেছে, এটা বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছে, এই রাজ্যে এনআরসি করতে দেওয়া হবে না বলে।
আরও পড়ুন
হিন্দি কি কেউ সাধে বলে নাকি?
দু’টো জিনিস পরিস্কার, এক, এনআরসি বিজেপির গোপন অ্যাজেন্ডা নয়। দুই প্রকাশ্যে এই কথা বলার পরও বিজেপি এই রাজ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে গত লোকসভা নির্বাচনে। অসমে এনআরসিতে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁরা বাঙালি। তাঁদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলিম, দুই ধর্মের মানুষই আছেন। হিন্দু অন্তত ১০ লক্ষ। আরএসএস, বিজেপি চায় দ্রুত সংসদে সিটিজেন্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল পাস করাতে, যাতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং কয়েকটি ধর্মাবলম্বী মানুষদের শরণার্থী বলে স্বীকার করে, নাগরিকত্ব দেওয়া যায়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায় তা হল, ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে শুধু মুসলিমদের চিহ্নিত করার দেশময় একটা প্রক্রিয়া চালু করতে চায় হিন্দুত্ববাদীরা। ধর্ম বেছে বেছে নাগরিকত্ব দেওয়া বা না-দেওয়া, ভারতের সংবিধান মেনে এমন কাজ করা যায় না, এমন অভিমত ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
…যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গনতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ডক্ষুদ্র করি, রবীন্দ্রনাথের এই যে ক্ষুদ্রতা বিরোধী স্বপ্নের স্বদেশ ভাবনা, তার মূলে আঘাত করছে এই এনআরসি কর্মসূচি, এর ফলে আমরা বোধহয় সরে যাচ্ছি আমাদের সংবিধানের মূল মন্ত্র থেকেও। ভারত জুড়ে একটা মুসলিম বিদ্বেষের রাজনীতি দাপটের সঙ্গে সক্রিয়। শুধু কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এর সমর্থক তা মোটেই নয়। সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা লোকজনের মধ্যে এই মানসিকতার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন অছিলায় গণপিটুনি দিয়ে মুসলিমদের খুন করা হচ্ছে, সেই সব ঘটনায় অভিযুক্তরা জেল থেকে ছাড়া পেলে তারা গণ-সম্বর্ধনা পাচ্ছে। কখনও তাদেরকে কোনও মন্ত্রী বাড়িতে ডেকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। জামিনে থাকা মালেগাঁও বিষ্ফোরণে অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞাকে (মসজিদের পাশে এই বিষ্ফোরণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল) ভোপাল থেকে লোকসভায় প্রার্থী করা হয়, তিনি প্রকাশ্যে বলেন, নাথুরাম গডসে একজন দেশপ্রেমিক এবং তারপরেও মানুষ বিপুল ভোটে তাঁকে জেতান। বোঝা যায় বিদ্বেষের আগুন থেকে এক অন্য ভারত জন্ম নিচ্ছে।
শিল্পায়ন এবং উন্নয়নের যে নীতি, তার ফলেই ‘মাইগ্রেশন’ বা এক জায়গার মানুষ দলে দলে অন্য এলাকায় যেতে বাধ্য হয়েছে, অনেক জায়গাতেই তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মিথ্যে লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কোথাও কোথাও জোরও খাটানো হয়েছে। কখনও নিদারুণ দারিদ্র বাধ্য করেছে এই চলাচল। তার থেকেই জন্ম নেয়, ‘চল মিনি আসাম যাব’র মতো গানের কথা, যা একসময় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গলায় নিয়মিত শোনা যেত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। মাইগ্রেশন ছাড়া কল-কারখানা, খনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, চা-বাগান, ইটভাটা কিছুই হত না। ধনতন্ত্রের অমোঘ নিয়মে বয়ে গিয়েছে এই মানুষের স্রোত এক দিক থেকে অন্য দিকে। তার সঙ্গে আছে যুদ্ধ, দেশ জয়, উপনিবেশ তৈরি করা, সাম্রাজ্যবাদী লুঠ। যুগ যুগ ধরে এই সবের প্রভাবে ছিন্ন-ভিন্ন হয়েছে সাজানো বসত। তারপর হঠাৎ এক দিন এক দল শাসকের মনে হয়েছে এখানে এত বাইরের লোক কেন? একটা কথা খুব পরিষ্কার, এই যে মানুষের স্রোতের দেশ থেকে দেশান্তরে চলা-ফেরা, এর জন্য কখনই তাদের দায়ী করা যায় না, তারা প্রায় সবাই এক অমানবিক ইতিহাসের শিকার। হঠাৎ যখন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে চিরকাল দূরে থাকা এক দল প্রবল পরাক্রম মহা-দেশপ্রেমিক বলে ওঠেন, এরা এখানে কেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়বেই।
এই নাগরিকপঞ্জি তৈরি করায় দেশের বেশির ভাগ মানুষের সায় রয়েছে, তা ২০১৯-এর ভোটের ফলই বলে দিচ্ছে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একটা বড়ো অংশই এর পক্ষে। লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে, তাঁরা ক্ষমতায় এলে সারা দেশে নাগরিকপঞ্জি করবে। সব দেখে শুনে আশঙ্কা হতেই পারে, উগ্র জাতীয়তাবাদের উপর নির্ভর করে আমরা কি ক্রমেই ‘মেজরিটারিয়ান ডেমোক্রেসি’ বা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার গণতন্ত্র’-এর পথে এগিয়ে যাচ্ছি? নাগরিকপঞ্জি সম্ভবত তার পক্ষে একটা বড় ধাপ।
‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার গণতন্ত্র’-এর একটা বড় উদাহরণ ইজরায়েল। যেখানে মুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। সেখানেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই এমন বৈষম্য দিব্বি চলছে। জনসমর্থন আছে বলেই তা চলছে।
এই জনসমর্থন বৃদ্ধির পিছনে যে প্রধান দু’টো বিষয় কাজ করেছে, তা হল, প্রথম, দীর্ঘ প্রচারে বড়ো অংশের মানুষের মধ্যে হিন্দুত্ববাদীরা একটা ধারণা অনেকটাই গেঁথে দিতে সফল হয়েছে যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে মুসলিমরা একদিন সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে এই দেশে। বদলে যাবে ভারসাম্য এবং বিন্যাস। যদিও এই প্রচারের পিছনে সেন্সাস রিপোর্টের কোনও সমর্থন নেই। বরং উল্টো। হিন্দু জনসংখ্যার মতোই মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারও কমছে। ২০০১ থেকে ২০১১, এই দুই জনগণনার বিচারে ১০ বছরে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯.৯ থেকে কমে হয়েছে ১৬.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ওই ১০ বছরে ২৯.৫ থেকে কমে হয়েছে ২৪.৬। অর্থাৎ ৫ শতাংশ কমেছে। ভারতের সব ধর্মের মানুষের বিচারেই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন সব থেকে কম। এই হার থেকে বিশেষজ্ঞদের মত, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের মৃত্যুহার এবং জন্মহার সমান হয়ে যাবে। এই তথ্য সরকারি। যে কেউ সেন্সাস রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে দেশটা মুসলিম প্রধান দেশ হয়ে যাবে এই ভ্রান্ত ধারণা বড়ো অংশ হিন্দুর মধ্যে বদ্ধমূল। হিন্দুত্ববাদীরা এই প্রচার প্রতিনিয়ত করেও থাকে সুকৌশলে।
দ্বিতীয় কারণ, হিন্দুদের বড়ো অংশ বিশ্বাস করে বিজেপি বাদে বাকি সব দল মুসলিম তোষণের রাজনীতি করে। এটাও তথ্য হিসেবে একটা বিরাট ভুল। যদি তোষণ করা হত তাহলে মুসলিমরা সর্বক্ষেত্রে এতটা পিছিয়ে থাকত না। জনসংখ্যার শতাংশের বিচারে মুসলিমদের যতটুকু প্রাপ্য, তা তারা অতীতে কখনও পায়নি। এখনও পায় না। এই না-পাওয়াটা বেড়েই চলেছে। ৫০-এর দশকে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা যেখানে ছিল ১০ শতাংশ, তখন মুসলিম আইপিএসের সংখ্যা ছিল ৫ শতাংশের নিচে। ২০১১-এর সেন্সাস অনুসারে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ। ২০১৬ সালের হিসেব বলছে, দেশে মুসলিম আইপিএস ৩ শতাংশের নিচে। জম্মু-কাশ্মীরকে বাদ দিয়ে ধরলে ২.৫ শতাংশ। রাজ্য সরকারের পুলিশের চাকরিতে পরীক্ষা দিয়ে যে অফিসারেরা পদোন্নতির জেরে আইপিএসের পদমর্যাদা পান, সেখানেও দেখা যাচ্ছে, এমন আইপিএস-দের ৭ শতাংশ মুসলিম ছিল ২০০৬ সালে, ২০১৬ সালে সংখ্যাটা কমে হয়েছে ৩.৮ শতাংশ।
জনসংখ্যার বিচারে মুসলিমরা ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ, কিন্তু কারাগারে মোট বিচারাধীন বন্দিদের ২১ শতাংশ মুসলিম। যদিও সারা দেশে যত অপরাধীকে আদালত শাস্তি দিচ্ছে তার ১৫.৮ শতাংশ মুসলিম। এই সংখ্যাটা মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশের কাছাকাছি। এর থেকে বলাই যায়, ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় মুসলিমরা সুবিচার পাচ্ছে। এটা একটা বিরাট বড়ো আস্থা এবং ভরসার জায়গা।
১৯৫৩ সালে ভারতীয় সেনায় মুসলিম অফিসারের সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের তথ্য, কর্নেল বা তার উপরের পদে মুসলিম অফিসারের সংখ্যা ১ শতাংশ। তবে নিচুতলায় সামরিক বাহিনীতে মুসলিমদের উপস্থিতি তুলনায় ভালো। ২০০০ সালের হিসেব, সংখ্যাটা ২.৫ শতাংশ। নেভিতে ৩.২ এবং এয়ারফোর্সে ২.১ । মুসলিম আইএএস ২০০৬ সালে ছিল ৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৩.৩ শতাংশ। যা জনসংখ্যার বিচারে খুবই নগন্য।
প্রশাসনে যেমন মুসলিমদের উপস্থিতি কমছে, তেমনই কমছে রাজনীতিতেও। ১৯৮০ থেকে ২০১৪, এই সময়ে নির্বাচিত মুসলিম সাংসদের সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। ১৯৮০ সাল। তখন ভারতের জনসংখ্যার ১১.৪ শতাংশ ছিল মুসলিম, মোট সাংসদ ৫৪২, মুসলিম সাংসদ ৪৯, অর্থাৎ ৯ শতাংশ। ২০১৪ সাল। মুসলিম জনসংখ্যা ১৪.২ শতাংশ, মোট সাংসদ ৫৪৩, মুসলিম সাংসদ ২০, অর্থাৎ ৩.৭ শতাংশ। বেসরকারি চাকরি, সরকারি চাকরি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায়ও মুসলিমদের খুঁজতে হয় দূরবিন দিয়ে। তাহলে তোষণটা হল কোথায়! হিন্দুত্ববাদীদের এটাই সাফল্য, যে তারা এই তোষণের ভুল ধারণা বড়ো অংশ হিন্দুর মনের গভীরে গেঁথে দিতে সফল হয়েছে। আর এই যে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি, এর যাত্রা কিন্তু এনআরসিতেই থামবে না। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রে কোথাও ৭০ কোথাও ৭৫ শতাংশ চাকরি স্থানীয়দের জন্য সংরক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র, গুজরাট এই পথে এগোচ্ছে। বরাক ভ্যালিকে আলাদা রাজ্য ঘোষণার দাবি উঠেছে। বাংলা বাঙালির দুর্বল কণ্ঠে হলেও, কানে আসছে এমন চিৎকার। বিজেপির দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্টাকে গত সপ্তাহে এক দল বিক্ষোভকারী রাস্তায় ঘেরাও করেন, সাংসদ ফিরে যেতে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল আলাদা রাজ্যের প্রতিশ্রুতি। দেশপ্রেমের নামে এই উগ্র, সঙ্কীর্ণ রাজনীতি দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য-বিরোধী। পিছু হটছে ধর্মনিরপেক্ষতা, উদারনীতি। স্বার্থপরতার চর্চা আর রাজনীতি একাকার হয়ে যাচ্ছে।
