
ধর্মতলার বিখ্যাত ৯০ বছর প্রাচীন হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম
রাজধানী কলকাতার অন্যতম প্রাচীন জায়গা ধর্মতলা। এখনও প্রচুর মানুষ এখানে আসেন ব্যবসা-বাণিজ্যের টানে। ধর্মতলার অজস্র গলিপথ ধরে হাঁটলে দেখা যাবে সাবেকি সব বিল্ডিং থেকে শতবর্ষ পার করা এক একটি হোটেল। এই অঞ্চলে পাইস হোটেলের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ বাংলা তথা দেশের প্রচুর মানুষ রুটি-রোজগারের কারণে এখানে আসেন। তাই দুপুরে তাঁদের জন্যই নির্মিত হয়েছিল প্রচুর কম পয়সার হোটেল। জানবাজারের পাশেই মির্জা গালিব স্ট্রিট। সেখানেই রয়েছে প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো ‘সিদ্ধেশ্বরী হোটেল’। লোকে সিদ্ধেশ্বরী নামে চিনলেও, এই দোকানের পোশাকি নাম ‘হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’।

যেকোনো শহরকে খুব কাছ থেকে চিনতে হলে যেমন প্রয়োজন সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলা, মেলামেশা। তেমনভাবেই প্রয়োজন পড়ে শহরের রাস্তা, দোকান, সংস্কৃতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হওয়া। কথায় আছে, যেকোনো জায়গার সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে তার নিজস্ব রসনাজগৎ। আর বাঙালির তৃপ্তি ভোজনে। সাত-সতেরো ব্যাঞ্জনায় তিনি ঋদ্ধ হয়ে ওঠেন। সিদ্ধেশ্বরী হোটেল আপনাকে সেই তৃপ্তিই দেবে। হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম তৈরি করেছিলেন বর্ধমাননিবাসী প্রয়াত ক্ষুদিরাম সরকার। আজ যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁদের চার প্রজন্ম আগের মানুষ। ১৯২৮ সাল থেকে চলছে এই হোটেল। তৎকালীন কলকাতায় রানী রাসমণির জায়গা ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই হোটেল। নিউমার্কেটের পিছনে মার্কিউজ স্ট্রিট থেকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রোড যেতে রানী রাসমণি রোড আর এসএন ব্যানার্জি রোডের সংযোগস্থলের একটু আগে ডান দিকে রয়েছে এই হোটেল।
বহুকাল আগে দোকানের একতলায় মেস ছিল। গ্রাম-মফস্সল থেকে কলকাতায় চাকরি বা পড়াশোনা করতে আসা লোকজন এই মেসে থাকতেন বলে শোনা যায়। তারা প্রত্যেকেই এই দোকানে দুইবেলা খেতেন।

এখানে খাবার পরিবেশন করা হয় কলাপাতা ও শালপাতায়। মেনুতে পেয়ে যাবেন শুক্তো, পোস্ত, মোচা চিংড়ি, মোচা ঘণ্ট, ধোকার ডালনা, লাউ চিংড়ি-সহ আরও অনেক পঞ্চব্যাঞ্জন। প্রতিদিন এক ধরনের সবজি পাওয়া যায় না। মেনু বদলাতে থাকে। সেই সঙ্গে বদলাতে থাকে চেখে দেখার স্বাদ। বেশ কয়েকবছর হল দোকানে তৈরি করা হয়েছে এসি কেবিন। স্টিলের থালার উপরে বিছিয়ে দেওয়া হবে কলাপাতা, তার উপরেই নুন, লঙ্কা, লেবু, পেঁয়াজ। মাটির ভাঁড়ে পেয়ে যাবেন জল। সিদ্ধেশ্বরী বিখ্যাত হয়েছে বিভিন্নরকম মাছের পদগুলির জন্য। মাছের দামও নির্দিষ্ট নয়। বাজারে যখন যেমন মাছের দামের ওঠানামা হয়, তখন এখানেও দাম পরিবর্তিত হয়। হোটেল খোলা হয় প্রতিদিন সকাল ৯টায়। কোন টেবিলে খাবারের বিল কত হয়েছে, তা বিশেষ ঢঙে ওয়েটারদের মুখে শোনা যায়। ক্যাশ কাউন্টারে ওয়েটারদের মুখে এটা শুনতে ঠিক পাঁচালি পড়ার মতোই শোনায়। দোকানের নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে ‘আশ্রম’। তাই ব্যবসার থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সেবায়। কম টাকায় ভালো খাবার খেতে হলে আজই আপনাকে যেতে হবে হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমে। চেখে দেখতে হবে এখানকার খাবার, তবেই তো স্বাদবদলের মজা।
এই শহরের গায়ে জুড়ে আছে এমন উজ্জ্বল ইতিহাস, যার সাক্ষী হতে পেরে বাঙালি নিজেকে গর্বিত করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান জনপ্রিয় সিদ্ধেশ্বরী হোটেল। তরুণরাও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করেন এই হোটেলকে। সনাতন খাবার, সাবেকি পরিবেশনের কায়দা সবমিলিয়ে সিদ্ধেশ্বরীতে বসে খাওয়া মানে তিলোত্তমা কলকাতার একচিলতে ইতিহাসের স্বাদ পাওয়া। ছুঁয়ে দেখা নিজের শিকড় এবং ঐতিহ্যকে।
দোকানের ঠিকানা –
হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম, ১৯ মির্জা গালিব স্ট্রিট, ধর্মতলা, কলকাতা – ৭০০০৮৭। দূরভাষ- ০৩৩ ২২৬৫ ২১০৩।

