
অমর কথাশিল্পী এখানে বেশ কয়েকটি গল্প-উপন্যাস রচনা করেছিলেন
অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অনেকগুলি কালজয়ী গল্প-উপন্যাস রচনা করেছিলেন শান্ত নিরিবিলি এক গ্রামে। হাওড়া জেলায় রূপনারায়ণ নদীর তীরে ছবির মতো সুন্দর সেই গ্রাম – নাম সামতাবেড়। কলকাতা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে। শহরের ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি থেকে নিষ্কৃতি পেতে একবার ঘুরে আসতে পারেন সেখানে। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, শরৎচন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির জন্যও এই জায়গা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘শ্রীকান্ত’, ‘পরিণীতা’, ‘রামের সুমতি’-র মতো এখানে রচিত শরৎচন্দ্রের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস নিয়ে বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের এই বাড়িটিতে সংস্কার করে একটি ছোট্ট গ্রন্থাগার তৈরি করা হয়েছে। সারা বছর এখানে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
দেউলটি স্টেশন
দেউলটি স্টেশনে নেমে সামতাবেড় গ্রামে পৌঁছলে বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র এবং একের পর এক গোলাবাড়ি আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে। রাস্তায় চড়ে বেড়াচ্ছে হাঁস-মুরগি। শরৎচন্দ্রের আবাসগৃহে প্রবেশ করলেই আপনি দেখতে পাবেন, ফটকে সোনালি অক্ষরে লেখা, “সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছু, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত, মানুষ হয়েও মানুষে যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না, নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন ভেবেই পেলে না সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই,—এদের কাছেও কি ঋণ আমার কম? এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে”। দোতলা বাড়িটি ব্রহ্মদেশীয় স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে বানানো। এখানে শরৎচন্দ্র তাঁর জীবনের ১২টি বছর কাটিয়েছেন। বর্তমানে এখানে গড়ে উঠেছে এক জাদুঘর। মহান কথাশিল্পীর দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা জিনিস এখানে সংগৃহীত রয়েছে।
বছর তিনেক আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বাড়িটির সংস্কার করে দান করেছে অভিনব রূপ। ফটক পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই চোখে পড়বে শরৎচন্দ্রের এক আবক্ষ মর্মর মূর্তি। রয়েছে একটি পুরোনো পেয়ারা গাছ। তাঁর ‘রামের সুমতি’ গল্পে এমনই একটি গাছের কথা পাওয়া যায়। গল্পটি রচিত হয়েছিল এখানেই। গ্রামের আরেক বড়ো আকর্ষণ হল রূপনারায়ণ নদী, বাড়ির ঠিক পাশেই। স্থানীয় মানুষেরা বলেন যে শরৎচন্দ্র তাঁর গল্প-উপন্যাসগুলি লেখার সময়ে পড়ার ঘর থেকে রূপনারায়ণের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বার্মা কাঠের আসবাবপত্রে সাজানো তাঁর বাড়ি। তাঁর লেখার ডেস্ক, জাপানি ঘড়ি, হুঁকো, বইয়ের তাক – সবকিছুই রক্ষিত আছে নিপুণ যত্নে।
রূপনারায়ণ নদী
শরৎচন্দ্রের বাড়ি
বাড়িতে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বার আছে। সেখানে রোগীদের বিনাপয়সায় ওষুধ দিতেন শরৎচন্দ্র। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাড়ির দরজা খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। সেই অর্থে কোনো গাইড এখানে নেই, তবে তত্ত্বাবধায়ক নিজেই আপনাকে সবকিছু ঘুরে দেখাবেন। শীতকালে এলে আপনি রূপনারায়ণের তীরে পিকনিক করতে পারবেন। ওই সময়ে প্রচুর পাখির আনাগোনা হয় নদীতে। যাঁরা পাখি ভালোবাসেন, তাঁরা এখানে শীতকালে খুঁজে পাবেন পরিযায়ী পাখিদের দুর্লভ খাজানা। এখানকার বাড়তি আকর্ষণ শ্রীরাধা এবং মদনগোপালের মন্দির। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ দেখার মতো।
নদীর তীরে অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য
শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী
দেউলটির অবস্থান
