বর্গি আক্রমণের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে গড় পঞ্চকোট

দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজারা এখানে রাজত্ব করতেন

পুরুলিয়া জেলায় পাঞ্চেত পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দুর্গ। দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজারা সেখানে রাজত্ব করতেন। প্রায় ২৬৬ বছর আগে মারাঠা বর্গি ভাস্কর পণ্ডিত বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন এই পথ দিয়ে। পথে তিনি যা কিছু দেখতে পেয়েছিলেন, সবই লুঠ করেন। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক। তখন বাংলার নবার ছিলেন আলিবর্দি খাঁ। ১৭৪০ সালে সরফরাজ খাঁকে হত্যা করে তিনি সিংহাসনে বসেন। আলিবর্দিকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন ওড়িশার নায়েব-নাজিম তথা সরফরাজের শ্যালক রুস্তম জং। আলিবর্দি তাঁকে ওড়িশা থেকে বিতাড়িত করলে তিনি নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজি ভোঁসলের দ্বারস্থ হন। রঘুজির সাহায্যে রুস্তম আবার ওড়িশার অধিকার ফিরে পেয়েছিলেন। কিন্তু আলিবর্দি ফের তাকে উৎখাত করেন। এরই মধ্যে রঘুজি একদল মারাঠা অশ্বারোহীকে বাংলায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারা পাঞ্চেত হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে ভয়ানক লুঠপাঠ এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল ১০ বছর ধরে। বাংলার জনগণের কাছে এই মারাঠা লুটেরা বাহিনী ‘বর্গি’ নামে পরিচিত। ১৭৫১ সালে আলিবর্গি মারাঠাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করার পর বাংলায় বর্গি হানার অবসান ঘটে।

অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য

গোটা অঞ্চলই পাহাড়ে ঘেরা

বাংলায় প্রবেশ করার সময় বর্গিরা গড় পঞ্চকোটে হামলা চালিয়েছিল। রক্ষীদের পরাজিত করার পর তারা প্রাসাদে ব্যাপক লুঠপাট চালায়। স্থানীয় লোকেরা বলে থাকেন, বর্গি আক্রমণের সময়ে তখনকার রাজার ১৭ জন রানি একটি কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেই যুগের স্থাপত্যগুলি ভগ্নপ্রায়, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের কত অজানা গল্প। আপনি যদি সেই দুর্গে গিয়ে দাঁড়ান, ২৫০ বছরের পুরোনো ইতিহাস হাতছানি দেবে আপনাকেও। 

জানা যায়, পুরুলিয়ার ঝালদা অঞ্চলের পাঁচ আদিবাসী সর্দারের সাহায্যে এখানে রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন দামোদর শেখর। তিনিই পঞ্চকোটের প্রথম রাজা। ‘গড়’ শব্দের অর্থ ‘দুর্গ’। ‘পঞ্চ’ মানে ‘পাঁচ’ এবং ‘কোট’-এর অর্থ গোষ্ঠী। 

কেল্লার মন্দির

পুরোনো স্থাপত্যের ধ্বংসস্তূপ

পাহাড়ের একদিক থেকে অন্যদিক পর্যন্ত দুর্গের পরিখা বিস্তৃত। অর্ধবৃত্তাকার এই পরিখার মাঝখান দিয়ে নৌকো চড়ে দুর্গে প্রবেশ করর একমাত্র রাস্তা। বাকি জায়গাগুলো এক বিশেষ ধরনের বাঁশের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঢাকা। আর রয়েছে পাথরের উঁচু পাঁচিল। রক্ষী শিবিরের কৌশলগত অবস্থান লক্ষ করার মতো। পাঁচশো বর্গমিটারের মতো এলাকা জুড়ে পাথুরে পাঁচিল ঘেরা জায়গাটা যেন দুর্গের এক ছোটো সংস্করণ। পিরামিডের মতো আকৃতির প্রবেশদ্বার থেকে গোটা প্রাসাদ এবং তার চারপাশটা দেখা যায়। 

ইতিহাস যেন হাতছানি দেয় এখানে 

মায়াবী অরণ্য 

কেল্লার ভিতরে দু’দিকে লম্বা এবং সরু দু’টি ঘর আছে। ছোটো নির্গমনপথও রয়েছে, যা নিচ থেকে দেখা যায় না। মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাথরে নির্মিত ভগবান রামের মন্দির। পাথরে তৈরি একটি ফাঁপা সিংহের মাথা ‘সিংহ মুখ’ নামে পরিচিত, যা এখনও চোখে পড়বে। তখনকার দিনের আরও কিছু জিনিসপত্র মুগ্ধ করবে আপনাকে। প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ দেখে বোঝা যায়, প্রাসাদের কাঠামো ছিল বিশাল। রানি মহল কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। পাথরের বদলে চুন-সুড়কির গাঁথনি ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে। গড় পঞ্চকোট আপনার সামনে অতীতের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে তুলে ধরবে। নিজের মতো পরিকল্পনা করে এখানে চলে আসুন।

গড় পঞ্চকোটের অবস্থান 
 

অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
পঞ্চকোট পাহাড় ছাড়াও বড়ন্তী হ্রদও আকর্ষণ করে পর্যটকদের। এই হ্রদের সৌন্দর্য অসাধারণ। এখানে শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখির আনাগোনা হয়। পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে দামোদর নদীর ওপর পাঞ্চেত বাঁধ এবং বরাকর নদীর ওপর মাইথন বাঁধও দেখার মতো। ফেরার সময়ে জয়চণ্ডী পাহাড়ের বিখ্যাত কল্যাণেশ্বরী মন্দির দেখে নিতে পারেন। ছোটোনাগপুর মালভূমির অংশ জয়চণ্ডী আসলে একটা পাহাড় শৃঙ্খলা। অনেকগুলো পাহাড় এখানে রয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল এখানে।
কীভাবে যাবেন
সড়কপথে কলকাতা থেকে রওনা দেবেন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে। আসানসোলের আগে জাতীয় রাজপথ ২-তে ঢুকে পড়বেন। আসানসোল থেকে চিত্তরঞ্জন এবং পুরুলিয়া যাওয়ার রাস্তা ধরে গড় পঞ্চকোটে পৌঁছে যাবেন। রাস্তার দু’দিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার স্মৃতিতে রয়ে যাবে চিরকাল।
কোথায় থাকবেন
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দপ্তরের রিসর্ট আছে গড় পঞ্চকোটে। সেখানেই থাকতে পারেন বন্ধুবান্ধব অথবা আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। অথবা ফোন করতে পারেন ৮০১৬৩০৪৭০৯ নম্বরে।
Developed by DXDasia