গুরুসদয় সংগ্রহশালাকে বাঁচানোই হোক আন্তর্জাতিক সংগ্রহালয় দিবসের অঙ্গীকার

আজ আন্তর্জাতিক সংগ্রহালয় দিবস

ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত বাংলার ইতিহাস এবং লোকসংস্কৃতি চর্চাতেও দুর্মূল্য অবদান রেখেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র লেখালিখি আর বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলার চলমান সংস্কৃতিকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। ব্রতচারী আন্দোলন প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নানান লোকশিল্প সামগ্রী সংগ্রহ করা শুরু করেন। এই দুটি কাজের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন স্ত্রী সরোজনলিনী দেবীর কাছ থেকে। ১৯৩২ সালে তাঁর সংগ্রহকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘প্রকৃত জহুরির কাজ’। যুবসমাজকে উৎসাহ দিতে গুরুসদয় দত্ত ১৯২৫ সাল থেকে মাসিক ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ এবং ১৯২৯ সাল থেকে ‘গ্রামের ডাক’ পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ প্রশাসনিক পদে চাকরি করতে করতেই বাংলার ঐতিহ্য-কৃষ্টির সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির জন্য তিনি বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছেন।

১৯৪১ সালে প্রয়াত হন গুরুসদয় দত্ত। ১৯৬৩ সালে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ নিয়ে ঠাকুরপুকুরে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর নানা প্রস্তরমূর্তি, পুতুল, ছবি, টেরাকোটার কাজ, পটচিত্র, কাঁথাশিল্প, কাঠশিল্প, মুখোশ, ডোকরা এবং আরও বহু চমকে দেওয়া সামগ্রী রয়েছে এখানে। সুজানি, দুরজানি, বায়তান, আরশিলতা, রুমাল, লেপ – ছয় ধরনের হারিয়ে যাওয়া কাঁথাশিল্প এই সংগ্রহশালায় আছে। স্থান পেয়েছে প্রাচীন মন্দিরের দরজার ফ্রেম, ষোড়শ শতাব্দীর বেশ কিছু দুর্লভ পুঁথি, দশমহাবিদ্যা ও দশাবতার তাস। এই তাসগুলি খেলার সময়ে যে সব গান গাওয়া হত, রয়েছে সেগুলির তালিকাও। সব মিলিয়ে চার হাজারের বেশি সামগ্রী। ১১০টি কাঁথা সংগ্রহ করা হয়েছে। হাজার দু’য়েক বইও সংরক্ষিত আছে – যার মধ্যে কয়েকটি সংগ্রহ করেছিলেন গুরুসদয় নিজে।

এই জাদুঘর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাজ্যপালের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় বস্ত্রশিল্প মন্ত্রকের সঙ্গে সংগ্রহশালা কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, এখনাকার কর্মীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ দেবে কেন্দ্রীয় বস্ত্রশিল্প মন্ত্রক। সংগ্রহশালার পরিচালন কমিটিতে থাকবেন ভারত সরকারের প্রতিনিধিরা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বলা হয়, এই সংগ্রহশালা এক লাভহীন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সুতরাং এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব কেন সরকার নেবে? আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। 

যাদুঘরের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ডঃ বিজন মণ্ডলের কথায়, “জাদুঘরে বর্তমানে কর্মরত ১৩ জন। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে এখানকার কর্মচারীদের মাসিক বেতন দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি যাদুঘরের নিরাপত্তারক্ষীকেও মাসিক বেতন দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত সংগ্রহশালা বন্ধ করে চলে যেতে আমরা পারছি না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের পক্ষে খুব কঠিন হচ্ছে”।প্রত্যেক বছর সংগ্রহশালা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের থেকে আয় হয় এক থেকে দুই লাখ টাকা। কিন্তু জাদুঘর চালাতে এবং বিভিন্ন দুর্মূল্য সামগ্রী সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন হয় প্রতি বছর ৪৬ লক্ষ টাকা। আগে কেন্দ্রীয় সরকার ৪৫ লক্ষ টাকা পাঠাত। বাকি টাকা সংগ্রহশালার কর্মচারীরা স্ব-উদ্যোগে জোগাড় করতেন। কিন্তু এখন প্রবল আর্থিক সংকটে পড়েছে গুরুসদয় সংগ্রহশালা। 

সারা বাংলার সচেতন মানুষেরা এই জাদুঘর বাঁচিয়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন। সরব হয়েছেন প্রবাসী বাঙালিরাও। এই সংগ্রহশালার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে রাজ্য সরকার। নানা কর্মশালা, আলোচনাসভা, প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে এখানে। আরও নানাভাবে মিউজিয়ামকে অর্থসাহায্যের চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। এই সংগ্রহশালাকে বাঁচানোই হোক এবছরের আন্তর্জাতিক সংগ্রহালয় দিবসের অঙ্গীকার। 

 

Post Tags
Developed by DXDasia