
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র বিজ্ঞানী মতিয়ার রহমান
“We are destroying mother earth very fast”- Jane Goodall
এই পৃথিবীর সব থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ। তার ছোঁয়ায় সভ্যতার আদিকাল থেকে বদলে গেছে পৃথিবী। শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা- তৈরি করেছে জীবনের সমস্ত প্রেক্ষাপট। পৃথিবীর মাটি ছাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলেছে মহাকাশ। কিন্তু প্রদীপের তলায় বেড়েই চলেছে অন্ধকার। চাহিদার নেশায় মেতে উঠে আমরা খুলে ফেলেছি অভিশাপের থলি। বাতাসে বাড়ছে বিষ। বাড়ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বাড়ছে উষ্ণায়ন। ঋতুচক্র পাল্টে যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত হচ্ছে গ্রীষ্ম। হিমবাহ গলতে শুরু করেছে। ‘পৃথিবীর বুকে শুকিয়ে যাচ্ছে ঘাস।’ ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারি, আর কিছু বছর পর ডুবে যেতে পারে অনেকগুলি বড়ো শহর। শুরু হয়েছে যুদ্ধ। পৃথিবীকে বাঁচানোর যুদ্ধ। আলোর খোঁজে জীবনের পাড়ে এসে দাঁড়াচ্ছেন বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদরা। সেই আলোতে নতুন দীপ্তি জুড়লেন এক বাঙালি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মতিয়ার রহমান (Motiar Rahaman) বানিয়ে ফেললেন কৃত্রিম পাতা (Artificial Leaf)। যা সূর্যালোক, জল আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে তৈরি করবে জ্বালানি আর অক্সিজেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালের (Nature Journal) সাব-জার্নাল নেচার এনার্জি-তে (Nature Energy)।
নিজের কাজ নিয়ে মতিয়ার রহমান বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “কার্বন-ডাই-অক্সাইড কিন্তু পৃথিবীর জন্য খুব জরুরি। গাছের সালোকসংশ্লেষ এই গ্যাস ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই গ্রিন হাউস গ্যাসটি বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের সামনে উষ্ণায়ন একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্ব দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংকটের সামনে। আমরা এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু এই ধরনের জ্বালানির পরিমাণ সীমিত। আমরা চেষ্টা করেছি দুটি সমস্যার উত্তর একসঙ্গে দিতে।”

এখন বাতাসে রোজ বাড়ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ আর কমছে জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel)। সাম্প্রতিক সময়ে বাতাসে গড় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৪২৪ পিপিএম। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিনিয়ত ব্যবহারের ফলে যা বাড়ছে রোজ। মতিয়ার বললেন, “বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড কমানো না গেলে ঠেকানো যাবে না উষ্ণায়ন। তাই আমরা এমন একটা সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্পও পাওয়া যায়, আর তা পরিবেশে নতুন করে কার্বন নির্গমনও না করে।” তা কী করে সম্ভব? মতিয়ারের উত্তর, “আমরা যদি কার্বন-ডাই-অক্সাইডকেই জ্বালানিতে বদলে ফেলতে পারি, তা হলে আমাদের দুটো লক্ষ্যই একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব।” কিন্তু কার্বন-যুক্ত যে কোনও যৌগকে জ্বালালে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে যে জ্বালানি তৈরি করা হল, তাতে নিঃসন্দেহে কার্বন যৌগটি থাকবে। সেই জ্বালানি পোড়ালে তো আবার বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডই ফেরত যাবে। এর কী সমাধান? জিজ্ঞেস করায় মতিয়ার রহমানের উত্তর, “আমাদের যন্ত্রটির মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে তৈরি হয় ইথানল, প্রোপানল প্রভৃতি জ্বালানি আর অক্সিজেন। জ্বালানিগুলি সহজেই বহনযোগ্য। ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন শিল্পে, গাড়ির ইঞ্জিনে। এবার আসি প্রশ্নের উত্তরে। এই জ্বালানিগুলি যেহেতু বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করেই তৈরি হচ্ছে, তাই গোটা প্রক্রিয়ায় বাতাসে মোট কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ হচ্ছে শূন্য (Net Zero)। এই ধরনের পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি (Renewable Fuel) গুলিই অদূর ভবিষ্যতে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।”
যে যন্ত্রটির দ্বারা এমন জটিল সমস্যার এমন একটি অভিনব সমাধান সম্ভব হল, সেটি কী ও কেমন? তিনি জানালেন, “আমরা এটাকে কৃত্রিম পাতা বলছি। গাছ যেমন সূর্যালোক, জল আর কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সহযোগে তৈরি করে শর্করা এবং অক্সিজেন, এই যন্ত্রটিও তেমনই সূর্যালোক, আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত জল থেকে তৈরি করে জ্বালানি আর অক্সিজেন। যেহেতু আমরা সূর্যালোক ব্যবহার করেছি, তাই জ্বালানি উৎপাদনের প্রক্রিয়ার খরচও অপেক্ষাকৃত কম।” তাঁর কথায় জানা গেলো, এই কৃত্রিম পাতাটির দুটি অংশ। এক প্রান্তে থাকে একটি সৌরকোষ (Solar Cell) ও একটি দ্বিধাতব অনুঘটক। সৌরকোষের মাধ্যমে সৌরশক্তি শোষণ করা হয়। সেই শক্তির সাহায্যে, অনুঘটকটির মাধ্যমে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বিজারণ ঘটিয়ে তৈরি হয় ইথানল, প্রোপানল প্রভৃতি জ্বালানি। যন্ত্রটির অন্য প্রান্তে থাকা একটি ন্যানোমেটেরিয়াল জলের জারণ ঘটিয়ে তৈরি করে অক্সিজেন। এই দুটি প্রক্রিয়া ঘটাতে হয় একসঙ্গে, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি সার্বিক ভাবে ইলেকট্রোনিউট্রাল থাকে। কারণ, জারণ-বিজারণের একটি ক্ষেত্রে আধানের শোষণ ও অন্যক্ষেত্রে আধানের বর্জন ঘটে। যদি জারণ-বিজারণ দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে না ঘটে, তবে আধানের ঘাটতি হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত জলে যন্ত্রটি রেখে সেটিকে সূর্যালোকে রেখে দিলেই যন্ত্রটি কাজ করতে শুরু করে।

সেই আলোতে নতুন দীপ্তি জুড়লেন এক বাঙালি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মতিয়ার রহমান (Motiar Rahaman) বানিয়ে ফেললেন কৃত্রিম পাতা (Artificial Leaf)। যা সূর্যালোক, জল আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে তৈরি করবে জ্বালানি আর অক্সিজেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালের (Nature Journal) সাব-জার্নাল নেচার এনার্জি-তে (Nature Energy)।
মতিয়ার রহমান জানান, “সারা পৃথিবী জুড়েই পরিবেশের অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড কমানোর চেষ্টা চলছে। চেষ্টা চলছে এই গ্রিন হাউস গ্যাসটি থেকে জ্বালানি তৈরি করার। সাফল্যও পাওয়া গেছে অনেকক্ষেত্রে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি তৈরি করার জন্য দরকার হয় প্রচুর পরিমাণ শক্তি, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকেই আসে। কিন্তু আমরা সরাসরি সূর্যালোক ব্যবহার করে, কৃত্রিম পাতার সাহায্যে, মাল্টিকার্বন তরল জ্বালানি তৈরি করতে পেরেছি, সালোকসংশ্লেষের পদ্ধতি অনুকরণ করে। এই ঘটনা বিশ্বে এই প্রথম। তাই আমাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে নেচারের মতো বিখ্যাত জার্নালে।” তিনি এই গবেষণাত্রটির প্রথম প্রণেতা (First Author)। গবেষণাপত্রটির মুখ্য প্রণেতা হলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সেন্ট জনসের ফেলো এরউইন রেইসনার। এই গবেষণাটি করা হয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেইসনার গবেষণাগারে (Reisner Laboratory)।
আইজ্যাক অ্যাসিমভ (Isaac Asimov) পরিবেশ সংক্রান্ত একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন “we need a human solution, a co-operative solution… miracles don’t happen, sweat happens, thought happens”। নিজের বুদ্ধি আর জ্ঞান দিয়ে সেই মানবিক সমাধানের (Human Solution) দিকে বিজ্ঞানকে এবং বিশ্বকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন যাদবপুরের প্রাক্তনী, কালনার কদম্বা গ্রামের বাসিন্দা মতিয়ার রহমান।
________
চিত্রঋণ: মতিয়ার রহমান
