সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অম্বর ব্যানার্জি
অধুনা এ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সংকট বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং (Global Warming)। এমনই সংকট যা দেশের সীমানা মানে না। সারা পৃথিবীর প্রকৃতি, জীবজগৎ, সবকিছুকে যা ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। সভ্যতার উন্নতির দোহাই দিয়ে প্রকৃতিকে শোষণ করতে করতে প্রকৃতির মারণাস্ত্রের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা সকলে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, পাল্টে যাচ্ছে ঋতুচক্র, সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, গলে যাচ্ছে হিমবাহ। তার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রায়। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা, আর ৫০-১০০ বছরের মধ্যে জলের তলায় চলে যাবে অনেকগুলি বড়ো শহর, বহু মানুষের মৃত্যু হবে, গৃহহীন, উদ্বাস্তু হবেন অগণিত মানুষ। পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষকরা নিরন্তর পরিশ্রম করে চলেছেন এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে। যেমন, উত্তর ইতালিতে হিমবাহকে ঢেকে ফেলা হয়েছে, যাতে সূর্যের তাপে হিমবাহ গলে না যায়। অনেক দেশই অপ্রচলিত আর পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে। গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ ও উৎপাদন কম করার চেষ্টা হচ্ছে। সেই সময় দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধে আরও একটু আলো দেখালেন সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির (Uppsala University, Sweden) বাঙালি গবেষক অম্বর ব্যানার্জি (Ambar Banerjee)। বর্তমানে তিনি সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাংস্ট্রম গবেষণাগারে (Angstrom Laboratory) কর্মরত। তিনি ও তাঁর গবেষক টিম খুঁজে পেয়েছেন এমন একটি উপায়, যাতে অতি ক্ষতিকারক গ্রিন হাউস গ্যাসকে বদলে ফেলবে কম ক্ষতিকর বা প্রয়োজনীয় রাসায়নিকে। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স’ পত্রিকায়।
এই বিষয়েই গবেষক অম্বর ব্যানার্জি কথা বললেন বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমরা অতি ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাসকে বদলে ফেলতে সক্ষম হয়েছি এমন কিছু রাসায়নিকে যা দৈনন্দিন কাজে লাগতে পারে। সভ্যতার এই সংকটে আমাদের এই গবেষণা নতুন দিশা দেখাতে পারে।” প্রসঙ্গত, গ্রিন হাউস গ্যাসগুলি পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ শুষে নেয়। ফলে সেই তাপ মহাকাশে ফিরে যেতে পারে না। তাই পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ধরনের গ্যাসের মধ্যে কয়েকটি হল- মিথেন, কার্বন-মনোঅক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি।
কিন্তু কীভাবে ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাস বদলে যাবে দরকারি রাসায়নিকে? কোন ধরনের গ্রিন হাউস গ্যাসকেই বা বদলে ফেলা যাবে তাঁদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে? জিজ্ঞেস করায় অম্বর ব্যানার্জি বলেন, “তেলের খনির বাইরে একটি উঁচু টাওয়ার থাকে। সেই টাওয়ারের মাথার কাছে সবসময় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আসলে তেলের সঙ্গে সঙ্গে খনি থেকে উঠে আসে বিষাক্ত মিথেন গ্যাস। এই মিথেন গ্যাসকেই জ্বালিয়ে ফেলা হয়।” মিথেন অতি বিষাক্ত এবং খুবই শক্তিশালী গ্রিন হাউস গ্যাস। তাকে পুড়িয়ে যে সমস্ত রাসায়নিক তৈরি হয়, সেগুলি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। এছাড়া মিথেন গ্যাসকে তরলীকরণ করতেও প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। মিথেন গ্যাস অত্যন্ত হালকা। তাই খুব বড়ো জায়গায় খুবই অল্প পরিমাণ মিথেন আবদ্ধ করে রাখা যায়, কারণ হালকা বলে অল্প পরিমাণ মিথেন অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে যায়। তাই একে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে বয়ে নিয়ে গিয়ে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করাও দুষ্কর ও খরচসাপেক্ষ। তাই সবথেকে ভালো উপায় একে পুড়িয়ে ফেলা। কিন্তু এই পুড়িয়ে ফেলাও অত্যন্ত খরচাসাপেক্ষ এবং এতে প্রচুর শক্তি নষ্ট হয়। অম্বর জানান, “এইখানেই আমাদের গবেষণা একটি বিকল্প পথের সন্ধান দিয়েছে।”

কিন্তু কীভাবে ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাস বদলে যাবে দরকারি রাসায়নিকে? কোন ধরনের গ্রিন হাউস গ্যাসকেই বা বদলে ফেলা যাবে তাঁদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে? জিজ্ঞেস করায় অম্বর ব্যানার্জি বলেন, “তেলের খনির বাইরে একটি উঁচু টাওয়ার থাকে। সেই টাওয়ারের মাথার কাছে সবসময় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আসলে তেলের সঙ্গে সঙ্গে খনি থেকে উঠে আসে বিষাক্ত মিথেন গ্যাস। এই মিথেন গ্যাসকেই জ্বালিয়ে ফেলা হয়।”
ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাসের দরকারি রাসায়নিকে বদলে যাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে অম্বর জানালেন, “আমরা যদি মিথেন গ্যাসকে অ্যালকোহলে বদলে দিতে পারি, তাহলে তা সহজে বহন করা যাবে। অ্যালকোহল এখন গাড়ির জ্বালানিতেও মেশানো হয়, আবার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতেও ব্যবহৃত হয়।” তিনি বলেন, মিথেন গ্যাসে কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ড (C-H Bond) থাকে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই বন্ড ভাঙা সহজ নয়। রোডিয়াম নামক একটি ধাতু আছে, যার উপরে সূর্যের আলো পড়লে তা এই কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ডকে ভেঙে দিতে পারে। এটা নিয়ে গত ৪০ বছর ধরেই কাজ হচ্ছে। যেহেতু সূর্যের থেকে শক্তি সরাসরি নেওয়া হচ্ছে, ফলে আলাদা করে শক্তি দিতে হচ্ছে না, ফলে খরচাও অনেক কমে যাচ্ছে। কিন্তু এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন না, কীভাবে রোডিয়াম পদার্থটি এই শক্তিশালী বন্ডকে ভেঙে ফেলছে। এর কার্যকারিতাও ছিল অনেক কম। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যদি যৌগে ১০০টা কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ড থাকে, তাহলে এতোদিন বড়োজোড় ১০-১২ টা বন্ড ভাঙা সম্ভব হচ্ছিল। আমরা গবেষণার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি কীভাবে এই বন্ড ভেঙে যাচ্ছে, রোডিয়ামের প্রভাবে। এর ফলে এমন অনেক রাসায়নিক তৈরি করা সম্ভব হবে, যা ১০০টির মধ্যে ৮০-৯০টি বন্ড ভাঙতে সক্ষম।”
রোডিয়াম আর মিথেন বা অন্যান্য জৈব যৌগের (সাধারণত যেসব পদার্থের মধ্যে কার্বন থাকে তাদের জৈব যৌগ বলা হয়) মধ্যে ইলেকট্রনের আদানপ্রদান হয়। অম্বররা এক্স-রে অ্যাবসর্পশন স্পেকট্রোস্কোপির (X-Ray Absorption Spectroscopy) সাহায্যে চাক্ষুষ করেছেন সেই ঘটনাকে। C-H বন্ড থেকে ইলেকট্রন প্রথমে রোডিয়ামের দিকে যায়। তখন C-H বন্ড আর রোডিয়াম ধাতুটি একসঙ্গে জুড়ে যায়। এরপর রোডিয়াম ধাতুটি C-H বন্ডকে ইলেকট্রন ফিরিয়ে দেয়। তখনই C-H বন্ডটি ভেঙে যায়।
কিন্তু এর উপকারিতা বা কার্যকারিতা কী? অম্বরবাবু বলেন, “এর উপকারিতা একাধিক। মিথেনের একটা বন্ড ভেঙে যদি তার মধ্যে একটি OH গ্রুপ জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা মিথানলে পরিবর্তিত হয়ে যাবে, যা স্পিরিট হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এভাবেই আমরা বহু দরকারি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে পারবো। এছাড়া অতিরিক্ত ক্ষতিকারক গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণও কমাতে পারবো।” তাঁরা যদিও গবেষণাগারে অক্টেন নামক জৈব যৌগটি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মিথেন বা অন্য যৌগকেও এই কাজে ব্যবহার করা চলে।