
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি ‘উড়োজাহাজ’ এবং একটি ব্যক্তিগত পাঠ
এই দুনিয়ায় স্বপ্ন দেখলেই বিপদ। কারণ, এখানে স্বপ্নের দাম কেউ দেয় না। সমাজ মনে করে, স্বপ্ন দেখা সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়। তাই, যে স্বপ্ন দেখে, তাকে পাগল ঠাউড়ে বসে চারপাশের লোকজন। আর স্বপ্নের মধ্যে রাষ্ট্র পায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ।
হয়তো বেশিরভাগ মানুষই সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পন করে নেয়। তবু কি স্বপ্ন থেমে থাকে? কিছু মানুষ তো রয়েই যায়, মাথায় যাদের ছিট, যারা উড়তে চায়। যুদ্ধের অস্ত্রকেই তারা পাল্টে নিয়ে রূপকথার জাল বুনে ফেলে। তারা হয়তো বিচ্ছিন্ন, কিন্তু একা নয়। মৃত স্বপ্নেরা তাদের কাছে গিয়ে সুখ-দুঃখের গল্প বলে, তাদের মাধ্যমে নতুন করে বাঁচার আশায় বুক বাঁধে। বেঁচে থাকার মতো আনন্দ কি আর কিছুতে আছে? আমরা সাধারণভাবে বেঁচে থাকা বলতে যা বুঝি, তার বাইরেও একটা বেঁচে থাকা হয়। সেটাই আসল বেঁচে থাকা। সবাই তার স্বাদ পায় না। যারা পায়, তারা ওড়ার জন্য সব কিছুই ছাড়তে পারে।
যুক্তি-তর্কের কাঠামোয় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমাকে ধরা যায় না। যুক্তির বাইরে যে বিশাল জগৎ পড়ে আছে, ছবিতে তার কথাই বলে থাকেন এই কিংবদন্তি পরিচালক। স্বপ্নের উড়োজাহাজ ওড়াতে গেলে সেরকম আকাশের বড়ো প্রয়োজন। প্রয়োজন ম্যাজিকের। আর পর্দায় ম্যাজিক দেখাতে তাঁর মতো ভালো আর কেই বা পারেন। ম্যাজিকের ছোঁয়া লাগে সংলাপে, ক্যামেরায়, আবহে। বাস্তবের মধ্যে ম্যাজিক ঢুকে পড়ে, আর ম্যাজিকের মধ্যে ঢুকে পড়ে বাস্তব। দু'য়ের টানাপোড়েনেই তো স্বপ্নের জন্ম হয়। যারা প্রকৃতির মধ্যে বাঁচে, প্রকৃতির কোলে গান গায়, ছবি আঁকে, তাদের সঙ্গে এই অতিপ্রাকৃতের যোগ নিবিড়। তার খোঁজ পাওয়া বড়ো কঠিন।
‘উড়োজাহাজ’-এর মতো ছবি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাষাও হয়ে পড়ে কাব্যিক। গদ্যের বিজ্ঞান যাকে ছুঁতে পারে না, তা আপনিই এসে ধরা দেয় কবিতার প্রজ্ঞানে। আবার পুরোপুরি কবিতাও ঠিক যথেষ্ঠ নয়। জাদু আর বাস্তবতার মিলনকে অনুভব করতে, তার গন্ধ পেতে, খুঁজে নিতে হয় গদ্য আর কবিতার মাঝামাঝি এক সান্ধ্যভাষা।
অথচ ক্ষমতা কি এসব বোঝে? সে তো সব কিছুরই দখল নিতে চায়। প্রকৃতিকে বন্দি করে, তার অপার অতিপ্রাকৃত রহস্যময়তাকে সন্দেহ করে, ভয় পায়। স্বপ্নের মধ্যে খুঁজে পায় বিদ্রোহের ইঙ্গিত। স্বপ্নকে ছিঁড়েখুঁড়ে নষ্ট করে দিতে চায় রাষ্ট্র। কিন্তু, স্বপ্ন এসবের থোড়াই ধার ধারে! তার নিজস্ব উড়োজাহাজে সে উড়ে যায়, সমাজ ছাড়িয়ে, রাষ্ট্র ছাড়িয়ে, ক্ষমতা ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূরে। রাষ্ট্র বড়ো লোভী, যা কিছু তার আয়ত্বের বাইরে, তাকে সে কারাগারে পুরবেই। বাচ্চু মণ্ডলের ছেলে তাই দরজা এঁটে দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশকে ঢুকতে দেবে না, রাষ্ট্রকে ঢুকতে দেবে না। স্বপ্নের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
ছবি – উড়োজাহাজ
পরিচালক – বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
আবহ – অলকানন্দা দাশগুপ্ত
অভিনয় – চন্দন রায় সান্যাল, পার্নো মিত্র, সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ
