ইতিহাস ও প্রকৃতির মিশেল রাজাভাতখাওয়া-য়

বক্সা টাইগার ফরেস্টের প্রবেশপথ এই স্থান

জয়ন্তীর পাশেই রাজাভাতখাওয়া, মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে। বক্সার টাইগার ফরেস্টের প্রবেশপথও বলা যায়। প্রতিবছর ভ্রমণপ্রেমিকদের ভিড় জমে এখানে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন, অর্কিড, বন্যপ্রাণী, পাখি ভরা এই রাজভাতখাওয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্বও কিছু কম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক যুদ্ধজয়ের কাহিনীও।

 

কোনো স্থানের নামকরণ হয় ঐতিহাসিক ঘটনা, আঞ্চলিক পরিবেশ, বৈচিত্র্য, লোকজন, কর্মজীবনের ওপর নির্ভর করে। রাজাভাতখাওয়া নামকরণের সঙ্গে যুক্ত আছে এমনই এক ইতিহাস। রাজাভাতখাওয়া ছিল কোচবিহার রাজ্যপাটের অংশ। ১৭৬৫ সালে কোচবিহারের সিংহাসনে বসেন ধৈর্যেন্দ্রনারায়ণ। তিনি ছিলেন তেরোতম রাজা। ভুটানের রাজা দেবরাজ ছিলেন তাঁর প্রতিপক্ষ। তিনি ঘোষণা করেন, বক্সার অঞ্চল ভুটানের অন্তর্গত। অঞ্চলের অধিকারের জন্য ভুটানের রাজা দেবরাজ তাঁর সেনাপতি পানসু তমা-কে পাঠান। কোচবিহারের রাজা প্রতিরোধ করলে সেনাপতি তাঁকে বন্দি করে প্রথমে বক্সার তারপর ভুটানের রাজধানী পুনাখা-তে নিয়ে যান। এমত অবস্থায় কোচবিহারের রাজপরিবার রাজাকে উদ্ধার ও রাজ্যরক্ষার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির দ্বারস্থ হয়। প্রথমে ব্রিটিশরা এই বিষয়ে গুরত্ব না দিলেও পরবর্তীকালে রাজি হয়। কারণ রেলপথ তৈরি করার জন্য প্রয়োজন কাঠের। আর আলিপুরদুয়ার ও ডুয়ার্সের জঙ্গল কাঠের জন্য উপযুক্ত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজি হল। ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ সেনাকর্তৃক কোচবিহারের রাজাকে উদ্ধার করা হয়। রাজাকে স্বাগত জানাতে রাজপরিবারের তরফ থেকে এই অঞ্চলে এক মহা ভোজসমারোহের আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ বন্দিদশার পর ফিরছেন রাজা। তাই এই ভোজসমারোহে আয়োজন করা হয় বাঙালি ট্রেডিশনাল খাবার ভাতের সঙ্গে নানা উপকরণ। এখানে রাজা ভাত খেয়েছিলেন বলে এই অঞ্চলের নামকরণ হয় রাজাভাতখাওয়া। এই কথাকে স্মরণীয় করার জন্য বনদপ্তর তৈরি করা মিউজিয়ামটির গায়ে রাজামশাইয়ের সপার্ষদ সেই ফিরে আসার দৃশ্য আঁকা রয়েছে বড় বড় করে।

 

 

নৈসর্গিক দৃশ্য ছাড়া এখানে দেখার মতো হল বনদপ্তরের তৈরি মিউজিয়াম ও অর্কিড হাউস। এখানে বন থেক সংগৃহীত নানাধরণের প্রাণীর ফসিল রাখা রয়েছে। এখানে পাওয়া যাওয়া বন্যপ্রাণীর প্রতিকৃতিও রাখা আছে। অর্কিড হাউসে দেখা মেলে নাম না জানা হাজারো অর্কিডের। কিন্তু এই সবকিছুই ছবি তোলা বা স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। মিউজিয়ামের গায়ে নোটিস বোর্ডে লেখা ‘Stay away from animals called humans, rest are predictable’। প্রথমে নোটিসটি অদ্ভুত লাগলেও পরে এর গুরত্ব বুঝতে পারলাম। দেখি, অনেক মানুষ এখানে ঘুরতে এসে চিহ্ন হিসাবে অনেক অর্কিড তুলে নিয়েছে। যা মিউজিয়াম থেকে বের হওয়ার সময় রক্ষী দ্বারা ধরা পড়ছে। এইসব দেখে মনে হয় কেন মানুষ সুন্দরকে চোখের ও মনের ভালোবাসার স্মৃতিপটে রাখতে পারে না। যাইহোক রাজাভাতখাওয়ার এই ইতিহাস ও সৌন্দর্য আমার মনকে চাঙ্গা করে দিয়েছিল। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

Developed by DXDasia